সম্প্রতি পৃথিবীর দীর্ঘতম চিরহরিৎ অরণ্য আমাজন সংলগ্ন ইকুয়াডোর নামের একটি ছোট দেশে, ফুটবল মানচিত্র ঘাঁটলে তাকে যতই উজ্জ্বল মনে হোক না কেন, উপজাতিদের মধ্যেকার সংঘর্ষ দেশটিকে নতুন মাত্রা এনে দিয়েছে। দেশটিতে এতদিন ধরে চলতে থাকা বিভিন্ন শোষণ নিপীড়নমূলক আইনের মধ্যে একটি ছিল সেখানকার সরকার ভূগর্ভস্থ খনিতে খনন কার্যের প্রয়োজনে যেকোনো জমি অধিগ্রহণ করতে পারবে। সরকার আন্তর্জাতিক তেল কোম্পানিগুলির সুবিদার্থে এই আইনের অপব্যবহার মাত্রাতিরিক্ত হারে শুরু করলে, নিজেদের মধ্যেকার সংঘর্ষ এড়িয়ে, এর বিরুদ্ধে সরব হন সেখানকার আদিম ‘বাওরানী’ উপজাতি। তাঁদের দাবি ছিল জঙ্গলের উপজাতিরাই জঙ্গলের শ্রেষ্ঠ রক্ষক এবং পৃষ্ঠপোষক। তাই তাঁরা এক দীর্ঘমেয়াদি আন্দোলনের এবং আইনি পদক্ষেপ নিয়ে আদালতের দ্বারস্থ হন এবং চলতি বছরের এপ্রিল মাসে আদালতের রায়ে তাঁদের জল-জমি-জঙ্গলের অধিকার ফিরে পান। এরই সাথে তিলে তিলে শেষ হতে থাকা আমাজোনের সৌন্দর্য বৃদ্ধির নামে প্রাকৃতিক ও খনিজ সম্পদ লুঠ রোধ করতে সংরক্ষণের দায়িত্ব নেন তাঁরা।

একুয়াডোরের উপজাতিদের লড়াইয়ের ঠিক উল্টোদিকে অবস্থান করছে পাপুয়া নিউ গিনি… ওশেনিয়া মহাদেশের উত্তর পূর্ব দিকে অবস্থিত একটি ছোট্ট দ্বীপ। বহু পুরোনো বিভিন্ন উপজাতিদের বসবাস সেখানে। সরকারি রিপোর্ট অনুযায়ী বিভিন্ন বন্যপ্রাণীসহ প্রায় লক্ষাধিক মানুষের উপজাতিগত সনাক্তকরণ করে ওঠা সম্ভব হয়নি এখনো। ব্রিটেন এবং জার্মানির দীর্ঘদিনের উপনিবেশ ছিল এই দ্বীপটি। ১৯৭৫ সালে দ্বীপটি স্বাধীনতা পেলেও সেখানকার খনিজ সম্পদ সাম্রাজ্যবাদের পরোক্ষ থাবা থেকে মুক্ত নয়। বর্তমানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং অস্ট্রেলিয়া দ্বীপটিতে সামরিক ঘাঁটি তৈরী করতে চাইছে। এখানকার একাধিক উপজাতির মধ্যেও ছোট বড়ো সংঘর্ষ দেখা যায় যার পিছনে মূলত প্রত্যক্ষ মদত থাকে সেখানকার রাজনৈতিক শাসক, সংখ্যাগরিষ্ঠ উপজাতি হুলি-দের, পিপল’স ন্যাশনাল কংগ্রেস (পি.এন.সি) পার্টির তরফ থেকে। আদতে সেটা যে একটা বৃহৎ অংশের জনগণকে শ্রেণী সংগ্রাম বিমুখ করে তোলার ধূর্ত প্রচেষ্টা তা বলাই বাহুল্য। দ্বীপটির সোনা ও অন্যান্য খনিজ পদার্থের ভান্ডার এক্সনমোবিলের মতো মার্কিন সংস্থার দ্বারা লুঠ ও আঞ্চলিক উপজাতিদের উপর বঞ্চনার বিরুদ্ধে বেড়ে চলা গণঅসন্তোষ বিপথে পরিচালিত করতেই উপজাতিদের মধ্যে দাঙ্গা লাগানোর পন্থা অবলম্বন করছে সাম্রাজ্যবাদী হাঙ্গররা। সম্প্রতি এর সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ঘটনাটি হল ওই কিরু এবং লিবে উপজাতিদের মধ্যেকার প্রতিহিংসা চালিত মারণ সংঘর্ষ যার শিকার হতে হয় হেলা পার্বত্য অঞ্চলের করিদা গ্রামের ২৩জন মহিলা এবং দুজন শিশু সহ মোট ৩০জনকে। এর জবাবে সেখানকার প্রধানমন্ত্রী পি.এন.সি পার্টির জেমস ম্যারাপে এই ঘটনাটিকে যুদ্ধবাজদের সংঘর্ষ হিসেবে ব্যাখ্যা দিয়ে দায় সেরেছেন!

এখন প্রশ্ন হলো, গোটা পৃথিবী জুড়ে পাপুয়া নিউ গিনি, একুয়াডোর, ব্রাজিল এবং আফ্রিকার বিভিন্ন দেশগুলিতে যেখানে প্রায় অধিকাংশ উপজাতির মানুষগুলো সমাজের মূল ধারা থেকে বিচ্ছিন্ন, সেখানে নিজেদের হক ছিনিয়ে নেওয়ার লড়াইকে গোষ্ঠী দ্বন্দ্বের রূপ দিয়ে আসলে কি যুগ যুগ ধরে চলে আসা খেটে খাওয়া মানুষগুলোর উপরেই পুঁজিপতিদের ক্ষমতা কায়েমের রাস্তা তৈরী করা হচ্ছে?



