সবেমাত্র পশ্চিমবাংলার নির্বাচনে “কার্যত অপরাজেয়” বলে ধরে নেওয়া তৃণমূল কংগ্রেস “কার্যত দুরমুশ” হয়ে গিয়েছে; রাজ্যের সরকারে এসেছে বিজেপি, যাদের সরকার রয়েছে কেন্দ্রে এবং ১৮টি রাজ্যে, এবং সেজন্যই যারা নিজেদেরকে আজ “কার্যত অপ্রতিরোধ্য” বলে ধরে নিতেই পারে। এই নির্বাচনে পরাজিত হয়েছেন “একখলনায়কতন্ত্র”-এর প্রধান মমতা ব্যানার্জি নিজে, এবং তিনি “চেয়ার আমি ছাড়বো না” বলে যে গোঁ ধরেছিলেন, তাতে অনেকেরই ওটিটি-খ্যাত “পঞ্চায়েত”-এর শেষ অংশে “প্রধানপতি”-র চিৎকার-চেঁচামিচি কান্নাকাটির কথা মনে পড়ে যাওয়াই স্বাভাবিক। তবে অনেকের কাছেই অস্বাভাবিক ঠেকেছে বিজপির ২/৩ ভাগ সিটে জয়, যারা গত বিধানসভা ও লোকসভা নির্বাচনে ১/৩ ভাগ সিটও পায়নি। ফলে বিজেপিই কেবল নয়, অন্যান্য দলের বেশ কিছু নেতৃত্ব, মেইনস্ট্রীম মিডিয়া এবং স্বঘোষিত ‘পলিটিকাল অ্যানালিস্ট’-রাও ঘোষণা করেছেন, পশ্চিমবাংলায় এই নির্বাচনে এক অভূতপূর্ব “হিন্দু কনসোলিডেশন” হয়েছে। বিজেপি প্রায় ৪৫% ভোট পেয়েছে, এবং মুসলিম জনগণ তাদের কার্যত ভোট দেয়নি বলে ধরে নিলে (প্রায়) ৭০% হিন্দু জনগণের প্রায় ৬৫% মানুষ বিজেপিকে ভোট দিলে তবেই তারা ঐ ভোট পেয়ে থাকতে পারে। সুতরাং “তথ্য” বলছে “হিন্দু কনসোলিডেশন” ! “ধর্মীয় মেরুকরণ” !
নির্বাচনে বিজেপি-তৃণমূলের এই প্রকাণ্ড বাইনারির ফলে অন্যান্য দলগুলি যে দু-একটি সিট পেয়েছে, তাকে “স্ট্যাটিস্টিক্যাল এরর” বলে ধরাই যেতে পারে। কিন্তু মজার কথা হল, “তথ্য”-এর ঐ “এরর”-এর মধ্যেই কিন্তু লুকিয়ে থাকে বিশালাকার বৈজ্ঞানিক “সত্য”, এবং সেই ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র “এরর”-গুলোই কি ব্যাপক আকার ধারণ করতে পারে, তা অনেককাল আগে ব্যাখ্যা করেছেন সিগমুন্ড ফ্রয়েড। এহেন তথ্যের দিকে তাকালে আমরা কী দেখতে পাই?
প্রথমত, যে কয়টি সিটে এই অন্যান্য দল, তথা কংগ্রেস, এইউজেপি, আইএসএফ ও সিপিআই(এম) জিতেছে (মোট ৬টিতে) বা দ্বিতীয় স্থানে থেকেছে (মোট ১৩টিতে), তার সবকটি মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষ অধ্যুষিত অঞ্চল। উদাহরণস্বরূপ, কংগ্রেস মুর্শিদাবাদ জেলায় ২টি সিটে জিতেছে, আর এই জেলাতেই ৪টিতে, মালদায় ২টি ও বীরভূমে ১টিতে দ্বিতীয় স্থানে থেকেছে; এইউজেপি ২টি সিটই জিতেছে মুর্শিদাবাদে; আইএসএফ দক্ষিণ ২৪ পরগণায় ১টি জিতেছে, আর এই জেলায় ১টিতে ও উত্তর ২৪ পরগণায় ৩টিতে দ্বিতীয় থেকেছে; আর সিপিআই(এম) মুর্শিদাবাদেই ১টি জিতেছে ও ২টিতে দ্বিতীয় স্থানে থেকেছে। মুসলিম জনগণ অধ্যুষিত এই সিটগুলিতে তৃণমূল কংগ্রেস পেয়েছে প্রায় ১৪ লক্ষ ভোট আর তৃণমূলের বিরুদ্ধে ভোট পড়েছে ১১ লক্ষেরও বেশী। অর্থাৎ, মুসলিম জনগণের বিশাল অংশ এখানে তৃণমূল কংগ্রেসের বিরুদ্ধে ভোট দিয়েছেন। মুসলিম জনগণও হিন্দু জনগণের মতই তৃণমূল কংগ্রেসের বিরুদ্ধে ভোট দেওয়ায় এরই সাথে মুর্শিদাবাদের অন্য ৮টি ও মালদার ৬টি মুসলিম জনগণ অধ্যুষিত সিটে বিজেপি জিতেছে। “ধর্মীয় মেরুকরণ”-ই প্রধান ঘটনা হলে সমস্ত মুসলিম জনগণেরই বিজেপিকে রুখতে তৃণমূলকে ভোট দেওয়ার কথা ছিল, কিন্তু তা তো হোল না ! অন্যদিকে তৃণমূল কংগ্রেসের ৮০ জন বিধায়কের মধ্যে ৪৬ জন হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ, যাঁরা হিন্দু জনগণ অধ্যুষিত অঞ্চলে বিজেপি প্রার্থীদের থেকে মোটের ওপর প্রায় সাড়ে ১০ লক্ষেরও বেশী ভোট পেয়েছেন। এ কীরকম “হিন্দু কনসোলিডেশন” !
স্পষ্টতই “মানুষের মতকে” “হিন্দুর মত” বা “মুসলমানের মত” হিসাবে দেখলে এই নির্বাচনের ফলাফলের কারণ খুঁজে পাওয়া যাবে না, “মানুষের মতকে” “মানুষের মত” হিসাবেই দেখতে হবে।
অপরদিকে “হিন্দু কনসোলিডেশন”-এর বিপরীতে তৃণমূলপন্থীদের তরফ থেকে উঠে এসেছে আর একটি তত্ত্ব : নির্বাচনে তৃণমূলের এই পরাজয় SIR-এর মাধ্যমে বহু মানুষের নাম বাদ যাওয়ার ফল। কিন্তু তথ্য বলছে যে, যে সিটগুলিতে সবচাইতে বেশী মানুষের নাম বাদ গিয়েছে, তেমন প্রথম ২০টি সিটের ১৩ টিতে তৃণমূল কংগ্রেস জিতেছে, বিজেপি ৬টিতে ও কংগ্রেস ১টিতে জিতেছে। উপরন্তু তৃণমূল কংগ্রেসের জেতা এই ১৩টি সিটের ৭টিতে তাদের জয়ের ব্যবধান বেড়ে গিয়েছে ৮হাজার থেকে ৫০হাজার পর্যন্ত। সুতরাং SIR বরং তৃণমূল কংগ্রেসকে বেশী রাজনৈতিক ফায়দাই দিয়েছে। SIR-এর বিরুদ্ধে গণ-অভ্যুত্থানের বিপরীতে SIR-এর ভয় দেখিয়ে যে ‘পলিটিকাল ডিভিডেন্ড’ তুলতে পারবে তারা, একথা তৃণমূল কংগ্রেসের কাছে আগে থেকেই স্পষ্ট ছিল, যা প্রমাণ হয়ে গিয়েছিল যখন পিপ্ল্’স্ ব্রিগেডের নেতৃত্বকে SIR-বিরোধী আন্দোলনের প্রচার চালানর সময় গুন্ডা দিয়ে আক্রমণ, কিডন্যাপ, পুলিশকে দিয়ে অ্যারেস্ট করানো, কোনওকিছুই তারা বাদ দেয়নি। মোথাবাড়িতে এক সাধারণ (কিন্তু একটু নাটুকে বক্তা) মুসলমান আইনজীবীকে ফাঁসিয়ে দিয়ে ১০ হাজারের বেশী ভোটে সিট জিতে নিয়েছে তারা।
প্রশ্ন হল, তা হলে কী সেই “মুখ্য কারণ” যা তৃণমূল কংগ্রেসকে কার্যত চূর্ণ-বিচূর্ণ করে বিজেপিকে এত সিটে জিততে মূল ভূমিকা পালন করল?
মনে রাখা দরকার, একদিকে তৃণমূল কংগ্রেসের দুর্নীতির পাহাড় (যা তাদের সকলকে “চোর” আখ্যায় ভূষিত করেছে), পরিবারতান্ত্রিক সমাজবিরোধী-নেতৃত্ব, সরকারী মদতে পুলিশ-প্রশাসনের মাফিয়াচক্র ও সাধারণ গরীব মানুষের ওপর অকথ্য জুলুম, প্রত্যক্ষ সাম্প্রদায়িক রাজনীতি, এবং বিশেষত “রেপ প্রমোটিং” মানুষের মধ্যে ব্যাপক রোষ তৈরি করেছে। তার সাথে যুক্ত হয়েছে বেরোজগারি, মূল্যবৃদ্ধি, আয়হীনতা, এবং শিক্ষা- ও স্বাস্থ্য- ব্যবস্থা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ার ক্ষোভ। অন্যদিকে বিজেপির হিন্দুত্ব, মুসলিমবিদ্বেষ ও উগ্র-জাতীয়তাবাদের প্রচার এবং ‘সোশ্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং’ সমান্তরাল ভাবে চলেছে। কিন্তু এসব সত্বেও ২০২১ বা ২০২৪-এ এমন ফল তো হয়নি ! তবে কী তা যা এর মাঝে ঘটে গেলো, যা বদলে দিলো সব কিছু !
২০২৪-এর নির্বাচনের পরে পশ্চিমবাংলা দেখেছিল এক অভূতপূর্ব দৃশ্য… আর.জি. কর হাসপাতালে খুন ও ধর্ষণের প্রতিবাদে লাখো-মানুষ দিনরাত বৃষ্টিবাদলা উপেক্ষা করে নেমেছিলেন পথে, দু’মাস ধরে রোজ ঘণ্টায় ঘণ্টায় রাজ্যের যেখানে সেখানে কারুর পরোয়া না করে। যাঁরা রাতে পথে হাঁটবার ডাক দিয়েছিলেন, ভেবেছিলেন কোলকাতার ‘এলিট’-দের মধ্যেই এই আন্দোলন সীমাবদ্ধ থাকবে, কিন্তু “তিলোত্তমা” যে সে সীমা ভেঙে “বঙ্গবালা” হয়ে উঠবে, তা ঠাওর করতে পারেননি তাঁরা নিজেরাই। তাই বেগতিক দেখেই মুখ্যমন্ত্রীর সাথে আপসের রাস্তায় হাঁটা শুরু করেন তাঁরা। জুনিওর ডাক্তারদের নেতৃত্বও নিজেদের আখের গোছাতে গিয়ে পৌঁছন মমতা ব্যানার্জির নিজের ঘরে। সিপিআই(এম) নেতৃত্ব স্বভাবসিদ্ধ ভাবেই “ফুটেজ খেতে”-ই ব্যস্ত থাকেন। কেবল পিপ্ল্’স্ ব্রিগেডের নেতৃত্বই সেদিন সর্বপ্রথম ডাক দিয়েছিলেন “দফা ১, দাবী ১, মমতার পদত্যাগ”; সরকারের আক্রোশের প্রথম বলিও তাঁরাই, প্রথম গ্রেপ্তার ও পুলিশি নির্যাতন তাঁদেরই ওপর। কিন্তু এই স্লোগান ছড়িয়ে পড়েছিল গোটা রাজ্যে, আওয়াজ হিসাবে তুলে আনতে পেরেছিল সবচাইতে বেশী মানুষের মনের চাহিদা। “বিজেপি চলে আসতে পারে” এই অজুহাতে সেদিন আমাদের গলা টিপে ধরেছিলেন সমস্ত বামনামধারীরা, সিপিআই(এম) থেকে নকশাল, রাতদখলের নেত্রী থেকে জুনিয়র ডাক্তারদের নেতা, সব্বাই। আমরা স্পষ্ট করেছিলাম, আমরা বামেরা এই লড়াইয়ের দায়ভার না নিলে বিজেপিই এর ফল ভোগ করবে। এই বামনামধারীদের বেইমানির ফল আজ চাক্ষুষ করছেন সকলে। মনে রাখবেন, নিপীড়িতার মায়ের বিজেপিতে যোগদান তাঁর বেইমানি নয়, আপনাদের বেইমানি থেকে জন্ম নেওয়া হতাশামাত্র।
তবে কি এই খুন-ধর্ষণের ঘটনাই নির্বাচনের এই ফলের কারণ?
না। এই ঘটনা নয়। এই ঘটনায় মানুষের ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ, সে ক্ষোভ উপরোক্ত সবকিছু মিলেমিশে তৈরি হওয়া, এরাজ্যের মানুষের গত পনেরো বছরের তৃণমূল কংগ্রেস সরকার ও প্রশাসনের ভয়াবহ সন্ত্রাসের শেকল ভাঙবার কাজ করেছিল। এই সরকার সেদিনই চলে গেছিল, বাকিটা কেবল তার আনুষ্ঠানিক পালাবদলের ঘটনাক্রম। এ সুযোগ পশ্চিমবাংলার মানুষ কিছুতেই ছাড়তে রাজী ছিলেন না। এই নির্বাচন তাই কেবলই জলে ডুবে যাওয়া দমবন্ধ মানুষের শ্বাস নেওয়ার নির্বাচন, যেকোনো ডালপালা ধরে, হতে পারে সে ডালে হনুমানেরই বাস, সেকথা জেনেই।
না হিন্দু কনসোলিডেশন, না SIR, না কেবল সাধারণ প্রতিষ্ঠানবিরোধী হাওয়া, এ হল চরম রাষ্ট্রীয়-সন্ত্রাসের শ্বাসরোধী অবস্থার বিরুদ্ধে মানুষের পদক্ষেপ। তাই আইপ্যাকের অর্থ-ও-অঙ্ক, বাঙালি-সাম্প্রদায়িকতা, ভাতার-ভিক্ষা, বা কোনও নতুন “ভোটশ্রী প্রকল্প”, তৃণমূল কংগ্রেসের কোনও “খেলা”-ই কাজ করেনি এই নির্বাচনে। বামনামধারীদের বেইমানির প্রেক্ষাপটে “বিজেপি” নামক অস্ত্র দিয়েই এই সময়ে এই কাজ হতে পারতো, মানুষ তাই এই অস্ত্রই তুলে নিয়েছেন। বুমেরাং হওয়ার ভয়কে জেনেশুনে উপেক্ষা করেই, আপনার পছন্দ হোক বা নাই হোক। ভাবটা ছিল এরকম : বড়ি তেতো হলেও গিলতে হবে।
কিন্তু এবার শুরু হবে “ড্রাগ ওভারডোজ”-এর পালা। শুরু হবে প্রকৃত “হিন্দু কনসোলিডেশন”-এর মরিয়া চেষ্টা। একদিনে সব গেলার খেলা নয়, তা আসবে এক গ্র্যান্ডপ্ল্যান হিসাবে। ২০১৪ থেকে এ কাজই তারা করে চলেছে। গোটা দেশের মতো এরাজ্যেও তারা একটাই আজেন্ডা সামনে আনবে, এবং তা আনবে এই তৃণমূল-কংগ্রেস-আইএসএফ-সিপিআই(এম)-নকশালদের মতো বেইমান বিরোধীদের সহায়তাতেই : উগ্র-হিন্দুত্ব বনাম মেকি-সেকুলারিজ্ম্। হিন্দুত্ব আর সেকুলারিজ্ম্-এর লোকদেখানো লড়াইয়ে গরীব-বড়োলোক, শ্রমিক-মালিক, অবদমিত-দমনকারী, খেটেখাওয়া-লুটেখাওয়াদের প্রকৃত সংগ্রাম, এককথায় বাম-ডান ভেদাভেদ সহজেই ঘুঁচিয়ে দেওয়া যায়, ঘুঁচিয়ে দেওয়া হয়েছে, হচ্ছে, ঘুঁচিয়ে দেওয়াই লক্ষ্য। একই সাথে ভারতের বড় কর্পোরেটদের সাথে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের দোস্তি-ও-কুস্তির খেলায় বাংলাদেশের ওপর আবার নিয়ন্ত্রণ হাতে পেতে পশ্চিমবাংলার অনুপ্রবেশ ইস্যুই তাদের অন্যতম হাতিয়ার। তৃণমূল-কংগ্রেস-আইএসএফ-সিপিআই(এম)-এর অবস্থান কী অনুপ্রবেশ প্রশ্নে? ট্রাম্প বা মোদীর থেকে একচুলও আলাদা?
নতুন লড়াইয়ের দিন শুরু। এ লড়াই ওদের সবার সাথে আমাদের সবার, আমরা যারা চেঁচিয়ে বলি : “মোদের কোনও ভাষা নাই, মোদের কোনও দ্যাশ নাই”।




