আমি জানতাম একদিন ওরা আসবে। মাঝরাতে, খুব ধুমধাম করে, marching এর বাজনা বাজাতে বাজাতে। সেই চির শান্তির দেশের দূতেরা। আমার মতন একজন নগন্য যোদ্ধাকে বরণ করে নিয়ে যেতে আসবে যোদ্ধার বেশেই। আমার দেশের শিশুরা কেউ কেউ তখন ঘুমের মধ্যে অলীক স্কুলবাড়িতে লুকোচুরি খেলছে। শ্রমিকদের গায়ে তখন পণ্যের গন্ধ নেই। পর্তুগীজ আখ চাষীদের ঘর গুলোতে ফসল কাটা ক্ষেতের শান্তি। 

আমার দরজায় এসে শব্দ করবে ওরা। দরজা খুলতেই বলবে কমরেড, আপনাকে যেতে হবে, পোশাক বদলে নিন। এক মুহূর্তর জন্য ওদের চোখে কি আমার জন্য শ্রদ্ধা আর ভালোবাসার একটা ঝিলিক দেখবো? আমার সারা জীবনের সমস্ত লড়াকু দিন আর রাত মিলিয়ে, সাম্রাজ্যবাদী শত্রুদের রাতের ঘুম কেড়ে নেবার বিনিময়ে প্রাপ্তি এই চির শান্তির দেশের দূতের চোখে ফুটে ওঠা এক মুহূর্ত শ্রদ্ধা আর ভালোবাসার ছাপ! 

ওরা তাড়া দেবে। বলবে ওদের জাহাজ অপেক্ষা করছে বন্দরে। সেই জাহাজ যা প্রত্যেক লড়াকু, পার্টিজান নেতার জন্যই অপেক্ষা করে একদিন। আরো কিছু মানুষের অধিকার আদায়ের যুদ্ধে অংশ নেবার, আরো একটা ক্ষমতার হস্তান্তর বা বিপ্লব দেখার পিপাসা বুকে চেপেই উঠতে হয় সেই কালের জাহাজে। যে জাহাজ  চালায় ভবিষ্যতের নাবিকেরা। 

বহুদিন পরে রাজপথ দিয়ে হেঁটে চলেছি কোনো দেহরক্ষী ছাড়াই। রাস্তার দুধারে সাজানো নববর্ষ উদযাপনের ঝলমলে আলো গুলো আমাকে তৃপ্তি দিচ্ছে। যারা মিশাইল, বোম্বার দিয়ে এই পৃথিবীতে চির অন্ধকার নামাতে চায় তারা এখনো এই ভূ খন্ডের দখল নিতে ব্যর্থ এটা ভেবে! কাল তারা আসবে, কিন্তু আমি জানি এই আলোর ঔজ্বল্য কেড়ে নেবার ক্ষমতা কোনো কৃত্রিম অন্ধকারের নেই, থাকতে পারেনা। 

আর কয়েক ঘন্টা পরেই ভোরের মোরগ ডাকবে গ্রামে গ্রামে। খনিতে, কারখানায়, ক্ষেত খামারে শুরু হবে সমবেত উৎপাদনের উৎসব। দূরের জাহাজে বসে আমি তার শব্দ শুনতে পারবোনা। আমার সামনে সামনে এখন একটা পুরোনো ধাঁচের রহস্যময় যুদ্ধ জাহাজ। অনেকটা শৈশবে দেখা Battleship Potemkin ছবির জাহাজটার মতো। 

আমি উপরে উঠতেই একটা কমান্ডো গোছের লোক এগিয়ে এসে salute জানালো। ওর নির্দেশেই আমার চোখ বেঁধে দেওয়া হলো।

আমি কারণ জানতে চাইলে বললো 

-আজ থেকে আপনি মনের চোখ দিয়ে দেখবেন। আপনার দেখার চোখ এখন অন্য কেউ পাবে। আর কিছু জানতে চান?

-আমরা কোথায় যাচ্ছি?-এই বুর্জোয়া সমাজের মানুষের দৃষ্টি যেখানে পৌঁছয়না সেখানে। 

-কিন্তু আমার পার্টির কী হবে? আর আমাদের লক্ষ্যের! -পৃথিবীতে কোনো প্রয়োজনীয় স্থানই শূন্য থাকতে পারেনা কমরেড! আপনার উত্তরসূরীরা সেই জায়গা নেবে, যেমন একদিন আপনি আপনার নেতার জায়গা নিয়েছিলেন।

-আমার শকুনের মতো শত্রুরা যদি এই সুযোগে দখল করতে আসে! প্রকৃতিকে ব্যাংক একাউন্ট আর মানুষকে আবার ক্রীতদাস ভাবতে চায়! তাহলে, তাহলে কী হবে!

-ওদের দখল করা জমিতেই একদিন ওদের কবর দেবে মানুষ। তারপরে বহু বছর পরে একদিন সেই কবরের উর্বর মাটিতে এক অদ্ভুত ফুলের চাষ হবে। যে ফুলের থেকে তৈরি হওয়া perfume মানুষের ঘামের গন্ধ ঢেকে দেবেনা, মনের সুবাস বাড়াবে। জাহাজ ছেড়ে দিলো। আমি শেষবার আমার মাতৃভূমির বাতাসের গন্ধ নিলাম। 

মনে মনে আমার কমরেডদের উদ্দেশ্যে বললাম বিদায়! বিদায় আমার দেশের মেহনতি নাগরিকেরা আর শিশুরা যারা আমাকে ঘিরে স্বপ্ন দেখেছিলেন। আমরা কাছেই ভেসে চললাম। খুব তাড়াতাড়ি আবার আমাদের মোলাকাত হবে, সংগ্রামের সমুদ্র পেরিয়ে শান্তি আর প্রাচুর্যর মোহনায়। হবেই, হতেই হবে!

Similar Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *