বর্ডার সংলগ্ন ছোট টাউনের একটা ভরাট কলোনি। ট্রেন লাইন দিয়ে রক্তের সম্পর্ক স্থাপন করেছে বড়ো শহরের সাথে। কিছু গরীব-গুরবো পরিবার সাপ খোপের মতো কালো ঘর গুলো আগলে দিন যাপন করে আর জীবনের সাপ লুডো খেলায় সাপের মুখে পড়ার অপেক্ষা করে। ছোট ছোট টাউনে সেরকম বড়ো বড়ো কাজ থাকেনা। তাই এদের অনেকেই পরিযায়ী পাখির মতো বাঁচতে যায়। কিন্তু কারো কারো ডানা কাটা পড়ে বা ভেঙে যায়। সেই ভাঙা ডানা কম্বলের মতো জড়িয়েই ওরা শীতের পর শীত পার করে। সেই রকমই একটা ডানা ভাঙা পরিবারের ভাঙা ডানা হলো ভুবন। বছর কুড়ি বয়েস ভুবনের। সে যখন ঘরের সামনের জমিতে ইতস্তত পায়চারি করে তখন তাকে দেখলে মনে হয় একই ছাঁচে গড়া এই টাউনের স্থানু, অবিচল মানুষগুলোর স্বভাবের বিরোধিতা করেই যেন তার দুটো হাত সারাক্ষণ এদিক-ওদিক ধাবমান। এই ভুবনের বাইরের কোনো মহাজাগতিক নিয়ম মেনেই যেন তার মাথাটা সামনে পিছনে দুলছে। চোখ-মুখের অভিব্যক্তির হঠাৎ পরিবর্তন কোনো ঋতু পরিবর্তনের নিয়ম মানে না। কথা বলার সময় কথার উৎসের দিকেও কখনো তাকায়না সে। না তাকিয়েই উত্তর দেয় এটা-সেটা। ওর বয়েস যখন ৩, তখন থেকেই ওর মা দীপ্তি বুঝেছিলো তার ছেলের হাব-ভাব ভিড়ে মিশে যাওয়ার মতো নয়। অবশ্য শরীরের পড়ন্ত হিমোগ্লোবিন-বেলায়, অপুষ্টির অন্ধকারে সে কোনো তুরূপের তাস কুড়িয়ে পাবে এমন কল্পনাও তার হয়তো ছিলো না।
ভুবনের বাবা অনাদি কাছেই এক ব্যবসায়ীর তিন-চার একর জমির উপর বানানো একটা ফার্মহাউস-এ মালীর কাজ করতো। সে রোগে পড়েছে কয়েক বছর হলো। এখন তাকে দেখলে একটা জল না পাওয়া শীর্ণ গাছের ডালের কথা মনে পড়ে। দীপ্তিকে এখন ছায়ার মতো স্বামীর সাথেই থাকতে হয়। সবসময় একটা ছাই রঙা শাড়ি পরে থাকে সে। ওর চোখে মুখের উজ্জ্বল আলোর কণাগুলো ভাঙিয়েই আসে অনাদির ওষুধ, ভুবনের সোয়েটার আর মাঝে মাঝে লাল টুপি।
একসময় পাকা মালী ছিল অনাদি। ফার্মহাউসের গেট দিয়ে উঁকি মারলেই মনে হতো যেন চোখে ধাইমার দৃষ্টি নিয়ে ছোট বড়ো বিভিন্ন গাছের পরিচর্যা করছে আরেকটা শিকড় কাটা গাছ। এই টাউনের আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে আছে এরকম কত শিকড় কাটা গাছের পরিবার। চোখে জোড় কলমের স্বপ্ন নিয়ে যারা ভালো ফলনের কথা ভেবে একদিন এসেছিলো এই টাউনে।
ভুবনকেও অনাদি হাতে ধরে একটু একটু করে শিখিয়েছে বাগান সামলানোর কাজ। দশ বছর বয়েসে প্রাইমারি স্কুলের দরজা বন্ধ হবার পরে ভুবন রোজ যেতো বাবার সাথে বাগানে। মানুষের সাথে তাল মিলিয়ে চলার সুযোগ তো ওর হলো না এই জন্মে, গাছপালার সাথেই মিশুক না হয়! চা-দোকানের বিপিন আর প্রতিবেশী সাবির-ভাইকে দুঃখ করে বলতো অনাদি।
কলোনির বাকি লোকজনও সায় দিয়েছিলো অনাদির এই সিদ্ধান্তে। অনাদির সহকারী হিসেবেই এতদিন ভুবন লড়ে আসছিলো ওর সাথে। বাগান বাড়ির কেয়ারটেকার বিনয়বাবু ভুবনের জন্য কোনো বাড়তি টাকা অবশ্য দেয়নি অনাদিকে। প্রথম প্রথম ভুবনকে উপদ্রবই মনে করেছিলো বিনয়বাবু। আশপাশের সবাই ভুবনকে ভালোবাসে বলে অনাদির মুখের ওপরে বলতেও পারেনি। অবশ্য তার ভয় ছিল মালিকের লোকজন ওর মত একটা বেঢপ ছেলের বাগানে ঘোরাঘুরি করাটা ভালো চোখে নেবে কিনা। ওনার চাকরি নিয়েও টানাটানি হতে পারতো। কিন্তু কোনো ব্যবসায়ী তার ফার্মহাউস-কে যতটা না ভালোবাসতে পারে তার অনেকগুণ বেশি ভুবন ভালোবেসেছে, পরিচর্যা করেছে বাবার সাথে এই বাগানের ছোট, বড়ো, মাঝারি গাছের দলকে। একবার বাগানে একটা বেদি বানানোর জন্য ছোট-বড়ো কয়েকটা গাছ ফাঁকা করার নির্দেশ এসেছিলো। সেই মতো অনাদিকেও কাজ করতে হতো। কিন্তু ভুবন কিছুতেই গাছগুলোর গোড়া কাটতে দিতে চায়না। সে যেন ওপরমহলের নির্দেশের কোনো পরোয়াই করে না। তার খোনা গলার চেঁচামেচিতে সেইদিনের মতো কাজ থামাতে হয়েছিল অনাদিকে। অনেক ধস্তাধস্তির পরে যখন বিনয়বাবু অনাদিকে ডেকে ওর পাগল ছেলেকে এখানে নিয়ে আসার জন্য শাসায় এবং চাকরি খাওয়ার ভয় দেখায় তখন রাগে, হতাশায় অনাদি ভুবনকে অনেক দিন নিয়ে আসেনি বাগানে। কিন্তু ভুবন আসতো একা একাই, উঁকি মারতো বাইরে থেকে। শ্বেতপাথরের বসার জায়গাটার দিকে তাকিয়ে থাকতো করুণ চোখে। শিকড় কাটা গাছেরাই হয়তো শিকড়ের টান বোঝে সব থেকে বেশি।
অনাদিকে যখন বিছানা টানলো তখন বাগানবাড়ির বিনয়বাবু ভুবনকে বাপের জায়গা দিতে চায়নি প্রথমে। কিন্তু সস্তায় ভালো কাজ জানা লোক পাওয়া এই ছোট টাউনে দুষ্কর। তাই মাস-দুয়েক ভুবনকে কাজে রাখাটাই স্থির করেছিলেন। অবশ্য অর্ধেক টাকায়। এটা এমন একটা পদক্ষেপ ছিল যাতে মরো-মরো সাপও কিছুদিন জিইয়ে থাকে আবার লাঠিও দু টুকরো না হয়। পরিবারটার আয়ু বাড়লো আর বাগানটাও যেন ভুবনকে পেয়ে সংগীতে মগ্ন নর্তকীর নাচের মুদ্রায় সেজে উঠলো। না, আর কোনো বেগড়বাই করেনি ভুবন। তাই তার চাকরিও বেঁচে গেছিলো। তার কাঁপা-কাঁপা হাতে খুরপি, কোদাল, নিড়ানি আর ঘামের কেরামতিতে অল্প দিনেই বিনয়বাবুর টনক নড়েছিল। গেলো বারে শীতকালে মালিক তাঁর পরিবার নিয়ে বেড়াতে এসে বাগানে হাঁটতে হাঁটতে শেয়ারের ভ্যালু নিয়ে চিন্তা করতে করতে এই ঝলমলে সিম্ফনির মধ্যে পড়ে নস্টালজিক সুড়সুড়ি অনুভব করেছিলেন। ভুবনকে ডেকে কিছু টাকা বকশিশ দেওয়া ছাড়াও ফুল গাছের পেছনে খরচ বাড়িয়ে দিয়েছিলেন। সেই টাকা দিয়ে ভুবনের ইচ্ছা হয়েছিল অনাদির জন্য একটা শিকড় কিনতে। বোকা, জড়ভরত ভুবন জানতো না তখন শিকড়ের মূল্য কত বেশি এই দুনিয়ায়। জানলো যখন খবরে হৈ চৈ শুরু হলো। কলোনিতে এক দল মানুষ আসলো কাগজ দেখতে।
কাগজ! গরীব মানুষ সব থেকে ভয় করে যে জিনিসটাকে সেই কাগজের জন্যই এসেছিলো ওরা। খাঁচার গায়ে চাপড় মারলে ভিতরের পাখিরা যেমন অস্থির হয়ে ওঠে তেমনি হয়ে উঠলো কলোনির মানুষগুলো। এই দেশের জল-হাওয়ার দাম বেড়েছে। বি.এস.এফ. অফিসারকে ঘুষ দিয়ে, দালাল ধরে যারা চুপিচুপি এসে এই দেশের মাটিতে শিকড় গজিয়েছিল, তাদের দিন শেষ! এই বলে সংসদে ডেস্ক চাপড়েছে সবাই।
তাই হয় কাগজ, নয় মৃত্যু ! ভোটার-তালিকায় নাম না উঠলে কী হবে কেউ বলতে পারে না। ভুবন আঁচ করতে চায় সেই অন্ধকারের দিনগুলো কিন্তু পারে না। প্রতিবেশীরা এসে মায়ের সাথে এই নিয়ে উত্তেজিত হয়ে কীসব আলোচনা করে। মাঝে মাঝেই সবাই কাজ কর্ম ফেলে কোথায় যেন যায়। বোধ হয় কোনো পার্টির মিটিং-মিছিলে। বিনয়বাবু বলে, জোঁকের মুখে নুন পড়েছে এবার। ফাঁকফোঁকর দিয়ে এসে এতদিন চাকরি-বাকরি, জমি-জমা সব চুষে নিচ্ছিলো! এবার খেলা হবে!
ভুবন খেলার অর্থ বোঝে না। তার কাছে খেলা মানে মৌমাছির সাথে ফুলের, গলির কুকুরটার সাথে উড়ন্ত ঠোঙার। মানুষের ঘুম কেড়ে নেবার খেলা তার অজানা। অনাদিও সারাদিন ভীতু চোখে টিভিতে খবর দেখে আর ভয় পায়, ভয় পায় আর খবর দেখে। যেন একই ভূতের সিনেমা বারবার চালিয়ে দেখছে। একই খবর, একই ভূত, কিন্তু তার চোখ-মুখ দেখে মনে হয় প্রতিবার নতুন করে ভয় পাচ্ছে যেন।
ভুবন ধরতে পারে না তার করণীয় কী। নতুন তালিকায় নাম না উঠলে পুলিশ আসবে একদিন, ওদের নিয়ে যাবে এখান থেকে অনেক দূরে। যেখানে হয়তো বাগান নেই। তার প্রিয় যন্ত্রপাতিগুলো, বিনয়বাবু, সাবিরচাচা, মধুপিসি, চাঁপাঠাকমা কেউ নেই। কারোর সাথে কারোর দেখা হবে না।
কোদাল দিয়ে বাগানের আগাছা তুলতে তুলতে ভুবনের মুখ ভয়ে ফ্যাকাসে হয়ে যায়। পায়ের কাছে কত ঘরবাড়ি, কলোনি, বাজার, কলতলা, মানুষ, সবাই যেন আগাছা! এক-একটা কোপে সাফ হয়ে যাচ্ছে। কেন? গাছপালাদের তো কাগজ দেখিয়ে নিজের শিকড় চেনাতে হয় না !
হিয়ারিং-এর ডেট এগিয়ে আসে। নিভু-নিভু হ্যারিকেনের মতো মানুষগুলোর চোখের তলায় কালি বাড়ে একটু একটু করে। টাউনে ধরপাকড় চলছে। কয়েকটা জাল পরিচয়পত্র বানানোর অপরাধচক্র ভেঙেছে। আর ভাঙছে একটু ভালো থাকার লোভে বুক বাঁধা মানুষের আশা। হিয়ারিং ফেরত হতাশ, ক্লান্ত নিষ্প্রভ দীপ্তির চোখের দিকে তাকিয়ে অনাদির চোখ মাঝে মাঝে জ্বলে ওঠে রাগে: ভাত দেবার মুরোদ নেই, কিল মারার গোসাঁই! হারামজাদার দল। মানুষের সময়ের দাম নেই কোনো! আর যেতে হবে না তোমাকে। আরেকবার নোটিস দিতে আসলে দেখে নেবো!
রোগা শীর্ণ ডাল দধীচির অস্থি হতে চায়।
একদিন ভুবন একটা দুঃস্বপ্ন দেখলো রাতে ঘুমিয়ে। সে দাঁড়িয়ে আছে ফার্মহাউসের বাগানে। আকাশ থেকে ছাই এর বৃষ্টি হচ্ছে। লাল, কমলা, সাদা সব ফুলগুলোর ওপরে ছাই এর আস্তরণ পড়ছে। ফুলের টবগুলোর মাঝখানে একটা টেলিভিশন উঁকি মারছে। তাতে একটা ঝাঁ-চকচকে শহরের দৃশ্য চলছে। কোথাও একটুও ধুলোবালি নেই। যেন কাঁচের তৈরি। পাশেই বিনয়বাবু হাতে একটা কোদাল নিয়ে ঝোপঝাড়গুলোতে উন্মাদের মতন কোপ মেরে চলেছে। মরা গাছের টুকরোগুলো পাশাপাশি লাইন দিয়ে পড়ে আছে। একটা কলোনির মতন। ভিতরে যাবার নুড়ি-পাথরের রাস্তাটার ওপরে দাঁড়িয়ে আছে একটা পুলিশ ভ্যান। রাস্তার এক পাশে হাতে কাগজের গুচ্ছ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে মা, সাবিরচাচা, মধুপিসি, আরো অনেকে। হঠাৎ কী নিয়ে ঝগড়া শুরু হলো! মা ছাড়া আরো অনেকে ঝগড়া করছে পুলিশগুলোর সাথে। পুলিশ ভ্যান থেকে কিছু পুলিশ নেমে এসে ওদের জোর করে গাড়িতে তুলছে। মায়ের মুখ আগের মতোই নিষ্প্রভ। কিন্তু চোখে একটা মরিয়া ভাব। ওরা মাকে গাড়িতে তুলেই হাতের কাগজগুলো কেড়ে নিয়ে ছুঁড়ে দিলো রাস্তায়। দরজা বন্ধ হয়ে যায়। তারপরেই ঘুম ভেঙে যায় ওর। হাঁউমাউ করে কেঁদে উঠেছিল সেদিন ভুবন মাকে জড়িয়ে। এতো কান্না সে কখনো কাঁদেনি। তারপর থেকে রাস্তা দিয়ে পুলিশের গাড়ি যেতে দেখলেই ভুবনের মনে কু ডাকে। “আপনি একবার ওপরওলার সাথে কথা বলে দেখুননা বিনয়বাবু। ওনার তো অনেক জায়গায় হাত আছে। যদি কিছু লিখে দেয় উপকার হয়। ভুবনকে তো উনি নিজের হাতে বখশিস দিয়ে গেছেন সেবার। এখন বিপদের মুখে কার কাছে গিয়ে দাঁড়াবো বলেন?” এইটুকু বলে চোখ মোছে দীপ্তি। বিনয়বাবু বলেন: “অতো ভেবো না বৌমা। ওনারা কত বড়ো মানুষ। কত কাজে ব্যস্ত। ওনাদের কি এতো তুচ্ছ কারণ বলা যায়? তোমরা তো আমাদের জাতের লোক। আগে তালিকাটা আসতে দাও। দেখো। একজন বৈধ নাগরিকের নামও বাদ পড়তে দেবো না। সবাই তো আছি!”
দীপ্তি এতদিনে বোঝে প্রতিশ্রুতি আর ছেলে ভোলানো ছড়া। তবু একটা ক্ষীণ আলো যেন মনের মধ্যে নিভতে নিভতেও নেভে না।
এক মাঘের দুপুরে বাগানে রোদ পিঠ করে উবু হয়ে বসে কাজ করছিলো ভুবন। কী যেন একটা গাছ পোঁতার জন্য বাগানে এক ফুটের একটা গর্ত করার প্রয়োজন হয়েছিল সেদিন। হঠাৎ মনে হলো বড়ো রাস্তার দিকে একটা শোরগোল শুরু হয়েছে। যেন অনেক অনেক লোকে একসাথে একই সাথে কেউ রাগে কেউ যন্ত্রনায় চিৎকার করছে।
সামনের চা-দোকানে বিপিনকাকাও নেই। বিনয়বাবুকেও আসেপাশে দেখা যাচ্ছে না। ভুবন কাজ ফেলে উঠে দাঁড়ালো। ভীতু পায়ে রাস্তার পাশে এসে দাঁড়ালো। পরিস্থিতি সত্যিই অগ্নিগর্ভ। বড়ো রাস্তা অবরোধ করেছে একদল শিকড় কাটা গাছ। তুমুল লাঠি আর টিয়ার সেল চার্জ করছে ৱ্যাফ। যাকে পারছে তাকে গাড়িতে তুলছে। একটু দূরেই দাঁড়িয়ে আছে লাইন দিয়ে পুলিশ ভ্যানগুলো। তার একটার গায়ে আগুন জ্বলছে। সেদিনের সেই স্বপ্নে দেখা গাড়িটা না! শুধু আকাশ থেকে ছাই পড়ছে না এখন আর। আতঙ্কে কাঠ হয়ে গেলো ভুবন। পুলিশ এসেছে তাদের ধরে নিয়ে যেতে! মাকে, বাবাকে, তাকেও! আর নিস্তার নেই। সে কী করবে এখন! পাশেই একটা টিভি চ্যানেলের গাড়ি। ক্যামেরার সামনে একজন কী যেন বলে চলেছে। কিন্তু কোনো কথাই এখন কানে ঢুকছে না আর ভুবনের। সামনে কয়েকজন খালি হাতে আঘাত বাঁচিয়ে প্রতিরোধের চেষ্টা করছিলো। হঠাৎ একটা ভারী বুটের লাথি, অজস্র লাঠির বাড়ি, রাস্তার ওপরে রক্ত, আরো রক্ত। নিজের অজান্তেই একটা আর্তনাদ বেরিয়ে আসলো ভুবনের মুখ দিয়ে। মুহূর্তের মধ্যে হাতের খুরপিটা শুন্যে কয়েকবার চালিয়ে ছুঁড়ে ফেলে ছুট দিল ভুবন।
“ঐ যে, ধর মালটাকে ! শুয়োরের বাচ্চা। পালাচ্ছে !”
ভুবন পিছন ফিরে ছুটতে শুরু করলো। টিভি চ্যানেলের লোকগুলোরও দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে ঘটনাটা। তারাও পিছন পিছন এগোলো। পুলিশ ভ্যান, খুরপি, ফার্ম হাউস, টিভি চ্যানেল, চিৎকার সব কিছুর থেকে ছুটে পালাচ্ছে একটা নধর দেহের উন্মাদ-কাটিং ছেলে। পুলিশগুলো এখনো তাকে নাগালের মধ্যে পায়নি। ওদের মুখের ভঙ্গি আরো হিংস্র হয়ে উঠছে। সামনেই একটা ফার্মহাউস মনে হচ্ছে। ছেলেটা ছুটছে প্রাণপণে।
খানিক পরে ছেলেটাকে ফলো করতে করতে দুজন বাউন্সার বাগান বাড়িতে ঢুকলো। তার পিছনে দুজন সাংবাদিক। ঢুকেই তারা দেখলো একটা অদ্ভুত দৃশ্য। ফুলের বেডের মাঝখানে একটা গর্তে পায়ের অনেকটা ঢুকিয়ে, তার ওপর মাটি ভরাট করে সটান দাঁড়িয়ে একটা কুড়ি বছরের অপরিণত মস্তিষ্কের ছেলে আতঙ্কে কাঁপছে। যেন একটা শিকড় সমেত গাছ! টিয়ার গ্যাসে আক্রান্ত চোখ দুটো অল্প খুলে হাতের ফাঁক দিয়ে চিনতে চেষ্টা করছে নতুন নিয়মের পৃথিবীকে।



