ইয়েমেন আরব অঞ্চলের সব থেকে গরিব দেশ। ২০১৫ সাল থেকে সেখানে গৃহ যুদ্ধ চলছে। ইয়েমেনের সরকার আর সেখানকার হাউতী গোষ্ঠীর সশস্ত্র বাহিনীর মধ্যে এই যুদ্ধ চলছে। এই সশস্ত্র বিদ্রোহী বাহিনী তৈরির ইতিহাসটা একটু আলাদা। ২০১১ সালে যখন আরব বসন্ত হয়, সেই সময় ইয়েমেনের একনায়ক আলি আব্দুল্লাহ সালেহকে ক্ষমতাচ্যুত করে প্রধানমন্ত্রী হন আব্রাবু মনসুর হাদী। এই ক্ষমতা হস্তান্তরের পদ্ধতিতে খামতি থাকার কারণে মনসুর হাদী ক্ষমতায় আসার পরেও মিলিটারির একাংশ তাকে সমর্থন করেনি, ব্যাপক দুর্নীতি দেখা দেয়, দেশের গোটা খাদ্য ব্যবস্থার কাঠামো ভেঙে পড়ে। এই পরিস্থিতিতে মিলিটারির একাংশ পূর্বতন একনায়ক আব্দুল্লাহ সালেহের পক্ষ নেয়। ঠিক এই পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে আব্রাবু মনসুর হাদীর বিরুদ্ধে হাউতী গোষ্ঠীর শিয়া মুসলিমরা বিদ্রোহ করে এবং সাদা অঞ্চল ও ইয়েমেনের রাজধানী সানহা শহর দখল করে। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মনসুর হাদীকে সেখান থেকে বিতাড়িত করা হয়। এই পরিস্থিতিতে যুদ্ধ শুরু হয়েছে। একদিকে রয়েছে সুপ্রিম পলিটিক্যাল কাউন্সিল যার মধ্যে আছে হাউতী ও তার কিছু মিত্র গোষ্ঠী এবং অন্যদিকে রয়েছে ইয়েমেনের সরকার অর্থাৎ মনসুর হাদীর পক্ষে থাকা সেনাবাহিনীর একটা অংশ। এরা পরস্পরের মধ্যে গৃহযুদ্ধে লিপ্ত। বাইরে থেকে মনসুর হাদীর সরকারকে সমর্থন দিচ্ছে সৌদি আরব, সেনেগাল, সুদান, কাতার, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ফ্রান্স। হাউতী গোষ্ঠীকে বাইরে থেকে সমর্থন দিচ্ছে উত্তর কোরিয়া এবং একদা সালেহের পক্ষে থাকা সেনাবাহিনীর একটি অংশ এবং কিছু প্রভাবশালী ব্যবসায়ী সংস্থা। এই যুদ্ধের একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা এই যে ২০১৭ সালে হাউতী গোষ্ঠীরা সালেহেপন্থীদের সাথে সমস্ত রকম সম্পর্ক থেকে সরে আসে এবং সালেহকে হত্যা করে। ইয়েমেনের সরকার এবং হাউতী গোষ্ঠী ছাড়াও একটি তৃতীয় শক্তি ইয়েমেনের একটা বড় অংশ দখল করে আছে এবং সরকারের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে। এদের মধ্যে আছে আল কায়েদা, আনসার আল শরিয়া ও ইসলামিক স্টেট। এই তৃতীয় শক্তিকে পরোক্ষভাবে সৌদি আরব সমর্থন দিচ্ছে। হাদীর সরকারের সাথে হাউতী গোষ্ঠীর এই গৃহযুদ্ধের মধ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স, সৌদি আরব ঢুকে পড়েছে নিজেদের মধ্যে তৃতীয় স্থানে সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার জন্য। এই যুদ্ধের সাহায্যে তারা তাদের অস্ত্রের ব্যবসাকে আরও বৃহৎ আকার দিতে পারবে। উত্তর কোরিয়া ধীরে ধীরে এই সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধে প্রবেশ করছে। সৌদি আরব ইয়েমেনের সরকার এবং আল-কায়েদা গোষ্ঠীকে সমর্থন করছে এই কারণে যে শিয়া মুসলিম প্রধান হাউতী গোষ্ঠী যদি ক্ষমতায় চলে আসে তবে সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে ইরান ইয়েমেনের উপরে দখলদারি চালাতে পারে। তাই আরব সুন্নি মুসলিমদের ভাবাবেগকে কাজে লাগিয়ে এই যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে তারা, যার ফলে ইয়েমেনে ব্যাপক পরিমাণে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা দেখা গেছে। তারা এলোপাথাড়ি গুলি চালিয়েছে এবং নির্বিকারে বোমাবাজি চালিয়েছে যার ফলে প্রায় ৯০,০০০ সাধারণ নিরীহ মানুষ এই যুদ্ধে প্রাণ হারিয়েছে এবং প্রায় ৫০,০০০ মানুষ আহত অবস্থায় রয়েছে। এই যুদ্ধের ফলে প্রায় ২ কোটি মানুষ, যা দেশটির মোট জনসংখ্যা ৭৫%, দুর্ভিক্ষ এবং কলেরা মহামারীর কবলে পড়েছে। ২০১৭ সাল থেকে এখনও পর্যন্ত এই যুদ্ধ চলছে যার ফলে মৃত্যু মিছিল অব্যাহত।

Similar Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *