বিজেপি-র বিরুদ্ধে লড়তে কারা ‘কংগ্রেসপন্থী বাম’, কারা ‘তৃণমূলপন্থী  বাম’? 

আসন্ন লোকসভা নির্বাচনের প্রেক্ষাপটে রাজ্য রাজনীতির ময়দান কার্যত ‘গোমূত্র’ বনাম ‘শান্তি জল’-এর নারদ-নারদে ব্যস্ত। পশ্চিমবঙ্গে নিজেদের খুঁটি শক্ত করতে একদিকে যখন গেরুয়া শিবির শীততাপ নিয়ন্ত্রিত চলমান ‘ফাইভ স্টার’ হোটেলকে রথ সাজিয়ে বানরসেনার বাহিনী প্রস্তুত করছে, উল্টোদিকে ‘সর্বধর্মে কাঁঠালি কলা’ রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী তখন সেই পথেই ‘পবিত্র যাত্রা’-র নির্দেশ দিয়েছেন তাঁর দলের কর্মীদেরকিন্তু এরই মধ্যে হাই কোর্টের সিঙ্গেল বেঞ্চকে দুগোল দিয়ে ডিভিশন বেঞ্চের কাপ জিতে একরাতে সিবিআই-নোটিশের জুজু দেখিয়ে সারদ-নারদ-গারদ খ্যাত তৃণমূলকে কিছুটা ব্যাকফুটে ঠেলে দিয়েছে বিজেপি

এমন এক পরিস্থিতিতে বিজেপি-কে রুখতে তৃণমূলের চরণে মাথা ঠুকতে উদ্যত যে মহাবিপ্লবী বামেরা, তাঁরা কি জেনেও না জানার ভান করছেন যে ২০১০-এর দেগঙ্গা, ২০১৩-এর ক্যানিং, ২০১৬-এর কালিয়াচক, খয়রাশোল, ধুলাগড়, ২০১৭-এর বাদুরিয়ার সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা-র প্রত্যেকটিতে বিজেপি-র সাথে সাথে একাধিক প্রভাবশালী তৃণমূল নেতার অবদান মানুষের স্মৃতিতে এখনো দগদগে ! আবার অন্যপাশে ‘ধর্মনিরপেক্ষ জোট’-এর নামে ‘এই সরকারে এলাম বলে’ হাবভাব করা যে বামেরা হাতুড়ি ফেলে দিয়ে কংগ্রেসের ‘হাত’-এ হাত রাখতে সংকল্পবদ্ধ, তাঁরাও কি শত চেষ্টা করেও মানুষের মন থেকে মুছে দিতে পারবেন ১৯৮৪-এর শিখ দাঙ্গা, ১৯৬৯-এর গুজরাট, ১৯৮৯-এর ভাগলপুর, ১৯৯০-এর কাশ্মীর, ২০১২-এর অসম দাঙ্গায় কংগ্রেসের প্রত্যক্ষ ভূমিকার কথা !

একদিকে যখন এরাজ্যে দুর্গাপূজায় পুজোকমিটি-কে সরকারী টাকা বিলনো থেকে শুরু করে আজ ‘পবিত্র যাত্রা’-র নামে ‘হিন্দু ঈশ্বর’-এর মূর্তি হাতে নিয়ে হাঁটবার কর্মসূচী নিচ্ছে তৃণমূল, তখন ওদিকে মধ্যপ্রদেশ বিধানসভা নির্বাচনের স্বার্থে পুরাণ কল্পিত ‘রাম গমন পথ’, ২৩,৬০০ পঞ্চায়েতে গৌশালা, এমনকি বিরাটকায় হনুমান মূর্তি প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ভোট প্রচারে ব্যস্ত থেকেছে কংগ্রেস।

আসলে বিজেপি-র ‘হিন্দুত্বের রাজনীতি’-র নোংরা-পচা-ঘৃণ্য লাইনকে খারিজ করার বিপরীতে কংগ্রেস আর তৃণমূল উভয়েই নিজেকে ‘আরও বড় হিন্দু’ প্রমাণে মরিয়া।

আর ‘লুটে খাওয়া’ নেতাদের এই দলগুলোর এই ‘আরও বড় হিন্দু’ হবার লড়াইয়ে ‘খেটে-খাওয়া’ মানুষের বাঁচা-মরা পর্যন্ত আজ সম্পূর্ণ উপেক্ষিত। শ্রমিক ধর্মঘট কি গণ আন্দোলন আটকাতে সরকার-প্রশাসন যেভাবে নেকড়ের মতো ঝাঁপিয়ে পড়ে, ‘রথযাত্রা’-র নামে দাঙ্গার চক্রান্তকে রুখতে ঠিক ততোটাই হাত গুটিয়ে বসে থাকে। কংগ্রেস-তৃণমূল উভয়ের সাম্প্রদায়িকতার অতীত-বর্তমান সবই সাধারণ মানুষের কাছে জলের মতো স্বচ্ছ হলেও বামপন্থীরা এই দুইের মধ্যে যেকোনো একটিকে, বা বলা যেতে পারে উভয় দলকেই, বিজেপিকে রোখবার নামে নিজেদের জোটসঙ্গী হিসেবে তুলে ধরতে ব্যস্ত। আপনারা কি তবে ‘আরও আরও বড় হিন্দু’ হতে উদ্যত, কমরেড? আপনারা আদতেও ‘বামপন্থী’ না ‘রামপন্থী’, ঝেড়ে কাসুন তো !

মেহনতী জনতার ওপর বিজেপি-র হিন্দুত্ব ও নয়াউদারবাদ-এর সাঁড়াশি আক্রমণের এই ভয়ঙ্কর আগ্রাসনের বিরুদ্ধে কংগ্রেস-তৃণমূলের থেকে সমদূরত্ব রেখে প্রত্যক্ষ সংগ্রামের পথে যাঁরা চলতে চান, তাঁরাও এবার সামনে আসুন, মুখ খুলুন, পথে নামুন।

Similar Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *