মুনাফার তাগিদে কারখানার সুরক্ষা শিকেয় তুলে মানুষের প্রাণ ছিনিমিনি খেলা প্রায় দস্তুর হয়ে দাঁড়িয়েছে এদেশে। কিছুদিন আগে তামিলনাড়ুর থার্মাল ষ্টেশনের বয়লারে বিষ্ফোরণ আর এবার বিশাখাপত্তনমে স্টাইরিন গ্যাস লিক। করোনার মহামারিতে লকডাউনের মাঝেই এই রাসায়নিক বিপর্যয় অন্ধ্রপ্রদেশের বিশাখাপত্তনমে। গত বুধবার রাত আড়াইটে নাগাদ গোপালপত্তনম এলাকার আর.আর. বেঙ্কটপুরমে এলজি পলিমারস রাসায়নিক কারখানা থেকে স্টাইরিন নামক এক বিষাক্ত গ্যাস লিক করে ছড়িয়ে পরতে থাকে প্রায় ৫ কিলোমিটার এলাকায়। প্রাথমিকভাবে এই দুর্ঘটনায় ১১ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং ১০০০ জনেরও বেশি লোক গুরুতর অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি।

 বুধবার রাত সাড়ে ৩ টে নাগাদ বিশাখাপত্তনমের পুলিশ কন্ট্রোল রুমে ফোন আসে যে, বাতাসে এক দুর্গন্ধ যুক্ত গ্যাস ছড়িয়ে পরেছে যার জন্য শ্বাস নিতে অসুবিধা হচ্ছে। এরপরে রাত ৪ টে নাগাদ প্রথম পুলিশ বাহিনী সেখানে যায়। কিন্তু দুর্গন্ধের কারনে প্রাথমিকভাবে পীড়িত এলাকায় ঢুকতে পারে নি তারা।  অপেক্ষা না করে অনেকেই রাত সাড়ে চারটে নাগাদ রাস্তায় বেরিয়ে পরেন। গ্যাসের বিষক্রিয়ায় অনেকেই রাস্তায় অজ্ঞান হয়ে যান। ভোর পাঁচটা নাগাদ পুলিশ  এবং এনডিআরএফ বাহিনী সেখানে পৌছয় এবং তারও আধঘণ্টা পরে গ্যাস লিক আটকানোর প্রক্রিয়া শুরু হয়।

ঘটনার সূত্রপাত গোপালপত্তমের যে কারখানা ঘিরে তার মালিক দক্ষিণ কোরিয়ার বহুজাতিক এল.জি. কোম্পানি। হিন্দুস্থান পলিমার নামে ১৯৬১ সালে তৈরি হয় এই কারখানাটি। মূলত পলিস্টাইরিন আর কো-পলিমার উৎপাদনের জন্য। এরপর ১৯৭৮ সালে ইউবি গোষ্ঠীর ম্যাকডয়েল অ্যান্ড কোম্পানির সাথে সংযুক্ত হয়। ১৯৯৭ সালে এলজি কেমিক্যালস মালিক হয় এই কারখানাটির এবং এলজি পলিমার নাম হয় কোম্পানিটির। বুধবার রাতে ওই কারখানার দুটি ট্যাঙ্ক থেকে গ্যাস নির্গত হতে থাকে। কারখানা সূত্রে জানা গেছে ওই সময়ে মোট ১৮০০ টন স্টাইরিন গ্যাস মজুত ছিল কারখানায়। এই ঘটনাটি সামনে আসার পরে এলজি পলিমার থেকে বিবৃতি দেওয়া হয়, স্টোরেজ ট্যাংকের ভিতরে অচকিতে করেই অস্বাভাবিক রকমের তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণেই গ্যাস লিক করেছে। তাদের এও দাবি বর্তমানে গ্যাস লিক আটকানো গেছে।

বেঙ্কটপুরম এলাকা ছেড়ে পালাচ্ছেন আতঙ্কিত মানুষ

অবশ্য স্থানীয় পুলিশ ও বিপর্যয় মোকাবিলা বিভাগ থেকে জানানো হয়েছে যে, লকডাউনের জেরে দীর্ঘদিন কোন রকম দেখভাল হয়নি সেই কারনেই এই বিপত্তি।প্রায় এক দিন পরে এলজি পলিমারের বিরুদ্ধে এফআইআর দায়ের করা হয়েছে কিন্তু এখনো গ্রেফতার হননি কেউই। পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য স্টাইরিনের প্রভাব নিষ্ক্রিয় করতে বৃহস্পতিবার গুজরাট থেকে প্লেনে করে ৫০০ কেজি 4-Teritiary Butylcatchol (PTBC) নামক এক রাসায়নিক বিশাখাপত্তনমে পৌঁছেছে।

স্টাইরিন একটি বর্ণহীন দুর্গন্ধ বিশিষ্ট তরল, উচ্চ চাপে এটিকে তরলীকৃত করে ব্যবহার করা হয়ে থাকে। তরলট মূলত পলিস্টাইরিন প্লাস্টিক, ফাইবার গ্লাস, রাবার ও ল্যাটেক্স তৈরির কাজে ব্যাবহার হয়। চাপের হেরফেরে এই গ্যাস সামান্য পরিমানে শরীরে প্রবেশ করলে শ্বাসকষ্ট, চোখ জ্বালা, খাদ্যযন্ত্রে সমস্যা দেখা দেয়। আর যদি মানবদেহে এই গ্যাস অধিক পরিমাণে পৌঁছয়, তাহলে নার্ভের সমস্যা থেকে ক্যান্সার পর্যন্ত হতে পারে। সে ক্ষেত্রে অনেক সময়েই রোগীর মৃত্যু অবধিও হতে পারে।

বিশাখাপত্তনমের এই ঘটনা  আরও একবার ১৯৮৪ এর ভোপাল গ্যাস দুর্ঘটনার স্মৃতি টাটকা করে দিল ভারতীয়দের মনে। দাও কেমিক্যালস –এর ইউনিয়ন কার্বাইডের ঘটনা কেড়ে নিয়েছিল তিন হাজার প্রাণ(বেসরকারী মতে প্রায় ১০ হাজার)। যার জেরে আজও সেখানের গ্যাস-পীড়িত মানুষ অসুস্থতার শিকার হন অনেক দ্রুত। এমনকি ভারতে করোনা সংক্রমণের প্রাথমিক পর্বে ভোপালের গ্যাস-পীড়িত এলাকায় সংক্রমণের হার ছিল অতি-উচ্চ, যে জন্য বিশেষজ্ঞ্রা দায়ী করেছিলেন ইউনিয়ন কার্বাইডের ঘটনাকে। মধ্যপ্রদেশের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী অর্জুন সিং তাঁর আত্মজীবনীতে ইউনিয়ন কার্বাইড-কর্তা ওয়ারেন এন্ডারসনকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পালানোয় সহযোগিতা করার জন্য ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধীকে দায়ী করেছেন, কিন্তু একইসাথে একথাও জানা যায় যে এন্ডারসন অর্জুন সিং-এরই ব্যক্তিগত বিমানে দিল্লী যান এবং তারপর আরকটি বিমানে সোজা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে। উপকূল শহরে বিপর্যয়েও এল জি কেলিক্যালসের কোনো শীর্ষকর্তা আটক হন নি এখনি। প্রশ্ন উঠে যাচ্ছে যে, মার্কিন মুলুকের বদলে বিশেষ বিমান কি দক্ষিণ কোরিয়ায় উড়ে যাবে?

 বিশাখাপত্তনমের ঘটনা সামনে আসার পরে বৃহস্পতিবার ছত্রিশগঢ়ের রায়গড়ে পেপার মিলে ট্যাঙ্ক পরিষ্কার করতে গিয়ে গ্যাস লিক করে ৭ জন কর্মী অসুস্থ হয়ে পরে। বিশেষজ্ঞদের মতে, লক ডাউনের আবহে  দেশের প্রায় এক তৃতীয়াংশ শ্রমিক কাজ হারাতে চলেছেন। প্রশ্ন উঠে যাচ্ছে কোম্পানির মালিকরা শ্রমিকদের ন্যুনতম মজুরি এবং কর্মের স্থায়িত্বের পাশাপাশি সুরক্ষা দিতেও অক্ষম।

Similar Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *