বাঙালির চা বিস্কুট থেকে মশারির দড়ি অবধি কালচারাল অবসেশন বড়ই মধুর এক প্রেমের গদ্য, যা দিয়ে বছরের পর বছর ভোট-বাক্স থেকে শুরু করে ধার্মিকদের পূণ্যের ঘড়া সবই ভরানো গেছে। সাম্প্রতিককালে রাজনৈতিক লড়াইয়ের ময়দানে বাঙালি জাতীয়তাবাদকে সুপ্রতিষ্ঠিত করতে উদ্যোগী কিছু গোষ্ঠী মাথা নেড়ে তৃণমূলের মতামতকে মানুষের মাঝে পৌঁছে দিতে উদ্যত হয়েছে। তাদের চেষ্টায় খামতি না থাকায় এবং কালচারাল সুরসুরি অতি-মাত্রায় হওয়ায়, অনেক মানুষই এগিয়ে এসে তাদের সমর্থন জানিয়েছেন। তারা উগ্রপ্রাদেশিক বাঙালি বিদ্বেষের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের নামে উগ্র বাঙালি জাতীয়তাবাদ প্রতিষ্ঠায় নিমজ্জিত হয়েছে, তবে তাদের তীর কিন্তু বার বার গিয়ে বিঁধছে ভিন রাজ্য থেকে আসা শ্রমিক, খেটে খাওয়া মেহনতি মানুষের উপর, যাদের রাস্তায় দেখতে পেলে ঘৃণ্য আচরণে বুঝিয়ে দেওয়া হচ্ছে বারংবার যে এই রাজ্যে, তারা খানিকটা ওই ইংরেজদের “ঠূম ইন্ডিয়ান লোগ হামেশা হামারি জুঠী কে নিচে রাহেগা”-র মতন বাঙালির পায়ের তলায় কীটের সমান সম্মানে বেঁচে থাকবে। তাদের এহেন প্রচারের অংশবিশেষ কোনও অবাঙালি বড় পুঁজির মালিক হন না। বরং যাদের উদ্বৃত্ত শ্রমের ভোগী তারা, সেই অবাঙালি মেহনতি মানুষকেই পদপিষ্ট করে ও মালিক শ্রেণীর পদলেহনে বাঙালি জাতীয়তাবাদের ধ্বজাধারীরা বিশেষ নজর দিয়েছে। গরিব-খেটে-খাওয়া শ্রমিক শ্রেণী তাদের কাছে গুটকা-খোর, ‘খোট্টা’ এবং ‘মেড়ো’। বড় পুঁজির মালিকদের কোনও ট্যাগ নেই কারন তাদের সমাজে অন্য প্রতিষ্ঠা রয়েছে।

ইদানিং বিপুল জনসমর্থনে জিতে আসা ভারতীয় জনতা পার্টি তার বহুল প্রচারিত সাংস্কৃতিক ও চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যর মধ্যে অন্যতম মূর্তি ভাঙা গড়ার খেলায় ভিন্নমতের এক উস্কানিমূলক ভাবধারার প্রচারের পথ প্রশস্ত করছে। তারা স্ট্যাচু অফ ইউনিটি ২৯৮৯ কোটি টাকায় প্রতিষ্ঠা করে ফেলেছে পাশ্চাত্য সংস্কৃতির বিরোধিতা ও জাতীয়তাবাদের নামে এবং অপর দিকে, পেরিয়ার, লেনিন, আম্বেদকার এবং সুকান্ত মূর্তি ভেঙ্গে জনরোষ সৃষ্টি করে চলেছে প্রতিনিয়ত। ত্রিপুরায় লেনিন মূর্তি ভাঙার প্রতিপক্ষ হিসেবে অতি-বাম মনভাবাপন্ন কিছু ব্যাক্তি শ্যামাপ্রসাদের মূর্তিকে কালিমালিপ্ত করলে গেরুয়া শিবিরের পক্ষ থেকে সেই কালি দুধ দিয়ে মুছে ফেলার পরিকল্পনাকে কেন্দ্র করে তৃণমূল ও তাদের হাত ধরে উঠে আসা এবং বর্তমানে রাজ্যে প্রধান বিরোধী দলের তকমা পেতে মরিয়া নবজাতক বিজেপির সংঘর্ষের মধ্যে দিয়ে এক হাস্যকর পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।

২০১৯-এর ১৪ই মে’তে তারা যে আচরণের বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েছে তা দিয়ে রাজ্যের শাসক ও বিরোধী দলগুলি ইতিমধ্যে বাঙালির সহনশীলতা, কালচারাল সেন্টিমেন্টকে নাড়া দিয়ে ভোটের সপ্তম দফায় এসে ভোট-বাক্স ভরাতে ব্যাপক প্রচারে অংশগ্রহন করছে। দাঙ্গাবাজরা নিজের প্রকৃত রূপ বাংলার মানুষকে দেখাচ্ছে বিদ্যাসাগর কলেজের সামনে আগুন লাগিয়ে এবং বিদ্যাসাগরের আবক্ষ মূর্তি ভাংচুর করে। ১৪ই মে বিকেল সাড়ে চারটে নাগাদ ধর্মতলায় রোড শো শুরু করে বিজেপির সর্বভারতীয় সভাপতি অমিত শাহ। অমিত শাহর সঙ্গে গাড়িতে ছিল বিজেপি নেতা মুকুল রায়, দলের রাজ্য সভাপতি দিলীপ ঘোষ, কলকাতা উত্তর কেন্দ্রের প্রার্থী রাহুল সিনহা ও দক্ষিণ কলকাতার প্রার্থী চন্দ্র বসু। ধর্মতলা থেকে শুরু হওয়া মিছিল কলেজ স্ট্রিট যেতে সময় নেয় প্রায় দু’ঘন্টা। মিছিল বিদ্যাসাগর কলেজের সামনে পৌঁছনোর পরে তৃণমূল ছাত্র পরিষদ সমর্থকরা বিজেপি সভাপতিকে কালো পতাকা দেখায় বলে অভিযোগ। দেওয়া হয় ‘অমিত শাহ গো ব্যাক’ শ্লোগান। এবিভিপি সমর্থকরা পাল্টা শ্লোগান দিতে থাকে। শুরু হয় পেশী শক্তি প্রদর্শনের রাজনীতির ঘৃণ্য নিদর্শন। আধলা ইট থেকে শুরু করে জলের বোতল থেকে লাঠি উড়তে থাকে এদিক ওদিক। যার জেরে গোটা এলাকায় উত্তেজনা ছড়ায়। আগুন লাগিয়ে দেওয়া হয় কলেজের গেটে। চূড়ান্ত উত্তেজনার মধ্যেও রোড শো থামায়নি বিজেপি সভাপতি অমিত শাহ। কেবল ওই উত্তেজনার মুহূর্তটুকুতে গাড়ির ভিতরে ঢুকে যায়, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের কোন প্রচেষ্টা ছাড়াই!

ফলে ঘটনা চলাকালীন শাসক দলের নিষ্ক্রিয় পুলিশ বাহিনী শুধুমাত্র প্রত্যক্ষদর্শীর ভূমিকা পালন করে এবং শাসক দল তারই সমর্থক ও কর্মীদের এই ঘৃণ্য ধ্বংস লীলায় বোড়ে হিসেবে ব্যবহার করে বিজেপিকে এই রাজ্যে প্রধান বিরোধী দল হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার উদ্দেশ্যে। শাসক দলের এই ইচ্ছাকৃত নিষ্ক্রিয়তা এই রাজ্যে বিজেপির সাম্প্রদায়িক রাজনীতির পথ সুপ্রশস্ত করছে এবং সেই একই রাজনীতির মধ্যে দিয়ে তৃণমূল নিজেদের অস্তিত্বকে টিকিয়ে রাখার এক সুপরিকল্পিত চেষ্টা চালাচ্ছে। তৃণমূল কংগ্রেস বাম রাজনীতিকে বাঙালি মধ্যবিত্তের কালচারাল রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে সরিয়ে দিতেই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে হামলা থেকে শুরু করে শিক্ষা ব্যবস্থার পতন ঘটাতে বদ্ধপরিকর। মালিক শ্রেণীর স্বার্থে শ্রমিক বিরোধী নীতি নিয়ে বিজেপির সাম্প্রদায়িক রাজনীতির বিরোধিতার মুখোশ পরে আসলে তারা কর্পোরেট দাসবৃত্তি এবং বিজেপি বিরোধী গোষ্ঠীর কর্পোরেট বাহিনীর স্নেহভরা দৃষ্টি আকর্ষণের জন্যই নিজেদের বিজেপি বিরোধী দল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করছে এবং এই রাজ্যে সাম্প্রদায়িক রাজনীতির হাত শক্ত করার খেলায় মেতেছে। এই মূর্তি ভাঙ্গা গড়ার খেলায় বৃহত্তর বাম দলগুলিও তাদের জাতি ও স্বদেশপ্রেমের প্রচারের সুবর্ণ সুযোগ হিসেবে বেছে নিয়েছে। বিগত কালে লাল পতাকার সাথে জাতীয় পতাকা নিয়ে মিছিল কংগ্রেসের সাথে তাদের মধুচন্দ্রিমার ইচ্ছারই বহিঃপ্রকাশ মাত্র। তারা তাদের বাম আদর্শ থেকে ক্রোশ খানেক সরে এসে, রাজনৈতিক ভাবে দেউলিয়া হয়েছে ইতিমধ্যেই। এবার তারা সম্পূর্ণ রূপে ২০১৯ এর ভোট-বাক্স ভরাতে, শাসক দলের মতো সেই একই সাম্প্রদায়িকতা বিরোধিতার পথ হিসেবে প্রতীকী আন্দোলন ও প্রচারের মাধ্যমকে বেছে নিয়ে আরও কেন্দ্রীয় রাজনীতিতে নিজেদের অপ্রাসঙ্গিক করে তুলতে উদ্যত হয়েছে।

এই সময়ে দাঁড়িয়ে সমস্ত খেটে খাওয়া মানুষকে বুঝে নিতে হবে তারা কাদের পক্ষ নেবেন, যেখানে প্রধান রাজনৈতিক দলগুলি মূর্তি নিয়ে মেতেছে এবং তাদেরই কর্মী সমর্থকদের সুরক্ষা তারা সুনিশ্চিত করছে না সেখানে জনসাধারনের সুরক্ষার দায় তারা কিভাবে, কিরূপে সুনিশ্চিত করবে? এখন সময় সচেতন হয়ে দেখার, কারা কালচারাল অ্যাটাকের নামে শ্রেণী ভোলাতে সচেষ্ট হয়েছে এবং কারা মজুরি-মুনাফার ব্যবস্থায় শ্রেণী সচেতনতার পক্ষে সওয়াল করে যাচ্ছে।

“মূর্তি ভাঙো মূর্তি গড়ো, মালিক-শ্রমিক গুলিও না,

মাটির থেকে আদর্শ বড়ো, শ্রেণী ভোলাতে দিও না।”

Similar Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *