পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূল সরকারের আমলে শিক্ষক নিয়োগের হাঁড়ির হাল নতুন কিছু নয়, সরকারি এবং সরকার পোষিত বিদ্যালয়গুলিতে শিক্ষকের আকাল আজ প্রায় সর্বত্র। গ্রামের দিকের স্কুলগুলির অবস্থা সবথেকে শোচনীয়, স্কুলগুলি থেকে পড়ুয়ারা স্কুলব্যাগ, সাইকেল, জুতো ইত্যাদি পেলেও শিক্ষকের অভাবে পঠনপাঠন কার্যত শিকেয়। একদিকে শিক্ষক নিয়োগের যখন এই হাল তখন পাল্লা দিয়ে বাড়ছে শিক্ষক নিয়োগে তৃণমূল সরকারের উপর দুর্নীতির অভিযোগ, যার সর্বশেষ উদাহরণ হলো আপার-প্রাইমারির শিক্ষক নিয়োগ। সম্প্রতি আপার প্রাইমারিতে শিক্ষক নিয়োগের জন্য শুরু হয়েছে শিক্ষকদের ইন্টার্ভিউ। অভিযোগ যে, শিক্ষক নিয়োগের জন্য কলকাতার বিভিন্ন কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলি থেকে যে সমস্ত পরীক্ষককে ডাকা হয়েছে তাদেরকে ইন্টার্ভিউতে পরীক্ষার্থীর প্রাপ্ত মান বসাতে হচ্ছে পেনসিলে, কিন্তু সই করতে হচ্ছে পেন দিয়ে! অর্থাৎ, যাতে করে পরীক্ষকের অনুপস্থিতিতে পরীক্ষার্থীদের নম্বর পরিবর্তন করা যায়।

শিক্ষক নিয়োগে দুর্নীতির অভিযোগ তৃণমূল সরকারের আমলে নতুন নয় সরকারে আসার প্রথম থেকেই তাদের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ ছিল ভুড়িভুড়ি; সরকারে আসার কয়েক বছরের মধ্যেই নিম্ন-প্রাথমিকস্তরে শিক্ষক নিয়োগের অভিযোগ দিয়ে যার হাতেখড়ি। বাম আমলে প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগের তত্ত্বাবধায়ক ছিল সংশ্লিষ্ট জেলার ডি.পি.এস.সি-গুলি। সরকারে আসার পর তৃণমূল প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগে পশ্চিমবঙ্গ প্রাথমিক শিক্ষা বোর্ডের আওতাধীনে শিক্ষকদের নিয়োগের ব্যবস্থা করে এবং তার জন্য যে পরীক্ষার আয়োজন করা হয় তার পোশাকি নাম দেওয়া হয় টেট (টিচার্স এলিজিবিলিটি টেস্ট)। টেটে বসতে গেলে ন্যূনতম যোগ্যতামান রাখা হয় উচ্চ-মাধ্যমিক স্তরে ৫০% নম্বর এবং সংরক্ষণের আওতায় থাকা প্রার্থীদের ক্ষেত্রে তা ৪৫% নম্বর। ২০১২ সালে প্রথম এই টেট পরীক্ষায় বসেন প্রায় ৫৫ লক্ষ পরীক্ষার্থী, পাশের হার ছিল ০.৩ শতাংশেরও কম। প্রশ্নপত্র থেকে নিয়োগ সবেতেই উঠেছিল দুর্নীতির অজস্র অভিযোগ। শিক্ষক নিয়োগের যোগ্যতামান ঠিক করার সর্বভারতীয় প্রতিষ্ঠান হলো ন্যাশনাল কাউন্সিল ফর টিচার্স এডুকেশন বা এন.সি.টি.ই। তাদের প্রস্তাবিত শিক্ষক নিয়োগের প্রশ্নপত্রের সাথে কোনোরকম সঙ্গতি না রেখেই প্রাথমিক শিক্ষা দপ্তর পরীক্ষা নেয়, পরীক্ষা পদ্ধতি জুড়ে ছিল একের পর এক অনিয়মের অভিযোগ।  

নিয়োগের ক্ষেত্রেও টাকা নেওয়া, ও.এম.আর. শীট পরিবর্তন, স্বজনপোষণ-এর অভিযোগ ওঠে। একাধিক তৃণমূল নেতা, বিধায়ক, সাংসদের ঘনিষ্ঠরা প্রাথমিক শিক্ষক পদে নিযুক্ত হন। কালনার তৎকালীন তৃণমূল বিধায়ক  বিশ্বজিৎ কুণ্ডুর পরিবার ও ঘণিষ্ঠরা মিলিয়ে ১৩ জন চাকরি পেয়েছিলেন। যেখানে পাশের হার ছিল ০.৩ শতাংশেরও কম, সেখানে তৃণমূল নেতাদের পরিবারের সকলে কিভাবে পাশ করলেন তা নিয়েই প্রশ্ন উঠে যায়।

তৃণমূল আমলে প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগে দুর্নীতির অভিযোগ এরপর আসে ২০০৯ সালের প্রাথমিক-শিক্ষক নিয়োগের স্থগিত একটি পরীক্ষাকে কেন্দ্র করে। ২০০৯-তে প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগের জন্য তৎকালীন বামফ্রন্ট সরকারের আমলে ডি.পি.এস.সির তত্ত্বাবধানে জেলাগুলিতে পরীক্ষা নেবার ব্যবস্থা করা হয়, কিন্তু পি.টি.টি.আই আন্দোলনকারীদের একটি মামলার জেরে (বাম সরকারের আমলে ২০০৬ সালে প্রাথমিক শিক্ষক প্রশিক্ষণরতদের প্রশিক্ষণ বাতিলের এবং শিক্ষক-প্রশিক্ষণ কলেজগুলির অনুমোদন বাতিলের সুপারিশ করে এন.সি.টি.ই, যেখানে দেখানো হয় যে রাজ্য সরকার প্রাথমিক শিক্ষক প্রশিক্ষণের ন্যূনতম যোগ্যতামান না মেনেই এই প্রশিক্ষণ দিচ্ছিল) পরীক্ষা বেশ কতকগুলি জেলাতে স্থগিত রাখা হয়। সরকার পরিবর্তনের পর ঐ পরীক্ষা নিতে উদ্যোগী হয় তৃণমূল; ঠিক হয়, যেহেতু এই পরীক্ষাটি আগেই জেলার ডি.পি.এস.সি-র তত্ত্বাবধানে হবার কথা ছিল, তাই তারাই এই পরীক্ষাপর্ব পরিচালনা করবে। আবারও একের পর এক দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে জেলার বিদ্যালয় পরিদর্শক থেকে বিধায়ক, মন্ত্রীদের বিরুদ্ধে। সবথেকে উল্লেখযোগ্য ঘটনা হল উত্তর ২৪ পরগণার ডি.পি.এস.সি-র চেয়ারম্যান সম্রাট মুখোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে আদালত গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয় কিছু পরীক্ষার্থীর মামলার প্রেক্ষিতে। কেবল উত্তর ২৪ পরগণা নয়, হাওড়া এবং মালদাতেও একই ভাবে ওঠে এই নিয়োগ প্রক্রিয়াকে ঘিরে দুর্নীতির অভিযোগ।

শিক্ষক নিয়োগে দুর্নীতির অভিযোগ আবার ওঠে প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগের দ্বিতীয় টেটের সময়। ২০১৫-এর অগাস্টে এই পরীক্ষাটি নেবার দিন ঘোষণা হয় কিন্তু কয়েকদিন আগেই জানা যায় যে প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়ে গেছে। অক্টোবর মাসে নতুন করে ২০১৫-এর টেট পরীক্ষার দিন ঘোষণা করা হয়। পরীক্ষার আগে থেকেই প্রক্রিয়া ঘিরে একের পর এক নিয়ম উল্লঙ্ঘনের অভিযোগ ওঠে পশ্চিমবঙ্গ প্রাথমিক শিক্ষা পর্ষদের বিরুদ্ধে। কেন্দ্র সরকার এন.সি.টি.ই-র নির্দেশিকায় এবং ‘রাইট টু এডুকেশন-২০০৯’–তে নিম্ন ও উচ্চ প্রাথমিকস্তরে শিক্ষকতার জন্য ডি.এল.এড প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক করায় প্রাইভেটে আকাশচুম্বী ফি দিয়ে ডিগ্রী বিলির পথ প্রশস্ত হলে তৃণমূল সরকার প্রশিক্ষণহীন লক্ষ লক্ষ ছেলেমেয়েদের টাকার বিনিময়ে ফর্ম ফিলাপ করায় এবং এন.সি.টি.ই-কে ‘অনুরোধ করে’ আইন পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে শিথীল করার জন্য। দীর্ঘ টালবাহানার পর প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত এবং প্রশিক্ষণহীন উভয়কে নিয়েই পরীক্ষা হয়, যদিও পরীক্ষায় শিক্ষক নিয়োগের অন্যান্য অনেক নির্দেশিকাকেই কার্যত এড়িয়ে যায় প্রাথমিক শিক্ষা পর্ষদ। এরপর দীর্ঘ দু-বছর বাদে নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু হয় ২০১৭-তে, যার শুরু থেকেই বিপুল টাকার লেনদেনের অভিযোগ ওঠে প্রাথমিক পর্ষদের বিরুদ্ধে। সংরক্ষিত আসনে অসংরক্ষিত প্রার্থীদের নিয়োগ, পার্শ্ব-শিক্ষকদের নিয়োগে বেনিয়মের অভিযোগ, কাউন্সেলিং সঠিকভাবে না করে নিয়োগপত্র প্রদানের অভিযোগ আসতে থাকে গুচ্ছ গুচ্ছ। একাধিক তৃণমূল নেতাদের বিরুদ্ধে ৮-১২ লাখ টাকা ঘুষ নিয়ে চাকরি দেবার অভিযোগ ওঠে, কোথাও আবার টাকা দিয়েও নিয়োগ না হওয়ার অভিযোগ ওঠে। মোট কত শিক্ষক এই টেট পরীক্ষার মাধ্যমে যে নিযুক্ত হয়েছেন তার শ্বেতপত্র আজও প্রকাশ করেনি শিক্ষা দফতর। অতি সম্প্রতি যখন কাটমানি নিয়ে রাজ্য সরগরম তখন কোচবিহারে প্রাথমিক-শিক্ষকরা চাকরি পাবার জন্য তৃণমূল নেতাদের যে টাকা দিয়েছিলেন তা ফেরতের দাবিতে বিক্ষোভও দেখান, যা কার্যত তৃণমূলের বিরুদ্ধে শিক্ষক নিয়োগে দুর্নীতির অভিযোগকেই শীলমোহর দেয়। বিধানসভায় এবিষয়ে প্রশ্ন উঠলে শিক্ষামন্ত্রী পার্থ চট্টোপাধ্যায় বিরোধী দলগুলিকে বলেন, আপনারা তো সঠিকভাবে কোনো তথ্যই দেন না যাতে করে শিক্ষক নিয়োগের দুর্নীতির ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে। সরকারের সদিচ্ছার এহেন কুম্ভীরাশ্রু যদিও অতি-সাম্প্রতিক।

যে পরীক্ষায় দুর্নীতির অভিযোগ ঘিরে চাঞ্চল্য সেই আপার-প্রাইমারিতে শিক্ষক নিয়োগে দুর্নীতির অভিযোগ এই নিয়ে নতুন নয়, ২০১৪-তে এই পরীক্ষা হবার পর বারে বারে নিয়োগের প্রতি পদক্ষেপে উঠেছে দুর্নীতির অভিযোগ। একসময় আপার প্রাইমারির নিয়োগের তত্ত্বাবধায়ক সংস্থা পশ্চিমবঙ্গ স্কুল সার্ভিস কমিশনের চেয়ারপার্সন তার পদ থেকে ইস্তফা দেন কমিশনে দুর্নীতির অভিযোগ তুলে, যার জেরে মুখ রক্ষার্থে একাধিক পরিবর্তন করা হলেও সর্ষের মধ্যেই যে ভূত আছে তা আরো একবার তা প্রামাণিত হয়। এস.এস.সি-তে দুর্নীতির আরো একটি অভিযোগ আসে লোকসভা ভোটের ঠিক প্রাক্কালে। ফরওয়ার্ড ব্লক বিধায়ক তথা রাজ্যের প্রাক্তন মন্ত্রী পরেশ অধিকারী লোকসভা ভোটের আগে তৃণমূলে যোগ দেন। তিনি তৃণমূলে যোগদানের পরেই এস.এস.সি-র উচ্চ-মাধ্যমিক স্তরের প্যানেলে পরিবর্তন ধরা পড়ে; যেখানে প্রাক্তন মন্ত্রীর মেয়ে প্রথম ওয়েটিং লিস্টে জায়গা না পেলেও আচমকা ওয়েটিং লিস্টের প্রথমে উঠে আসেন। বিতর্ক ও দুর্নীতির অভিযোগ সত্ত্বেও পরেশ অধিকারীর মেয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের শিক্ষিকা হিসেবে চাকরিতে যোগদান করেন।

‘এস.এস.সি. যুব ছাত্র অধিকার মঞ্চ’-এর অনশন

প্যানেলে থাকা সত্ত্বেও এস.এস.সি-তে নিয়োগ হচ্ছে না এই দাবিতে ভোটের প্রাক্কালে কলকাতায় অনশনে বসেন কিছু প্রার্থী। প্রায় ৪৫০ জন পরীক্ষার্থী স্কুল সার্ভিস কমিশনের সহশিক্ষক পদে নিয়োগ দুর্নীতির বিরুদ্ধে ‘এস.এস.সি. যুব ছাত্র অধিকার মঞ্চ’ গঠন করে ২৮ শে ফেব্রুয়ারি থেকে আমরণ অনশনে বসেছিলেন। কলকাতার ধর্মতলার প্রেস ক্লাবের সামনে, মেয়ো রোডে। ২০১৩ এবং ২০১৭ সালের স্কুল সার্ভিস কমিশনের প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ এই প্রার্থীরা দীর্ঘদিন ধরে নিয়োগের জন্য অপেক্ষারত। ‘এস.এস.সি. যুব ছাত্র অধিকার মঞ্চ’-এর দাবীঃ ১. স্কুল সার্ভিস কমিশন প্রকাশিত গ্যাজেট পুঙ্খানুপুঙ্খ মেনে (যেমন আপ-টু-ডেট ভ্যাকেন্সি, ১:১:৪ অনুপাতকে মান্যতা ইত্যাদি) নিয়োগ না হওয়ায় যারা ওয়েটলিস্টেড হয়েছে, সেই অনশনরতদের চাকরি দিতে হবে। ২. স্কুল সার্ভিস কমিশন প্রকাশিত গ্যাজেট অনুযায়ী আপ-টু-ডেট ভ্যাকেন্সি (চূড়ান্ত মেধা তালিকার ১৫দিন আগের) প্রদান না করায় এবং সেন্ট্রাল ইন্টারভিউ না হওয়ায় অনশনরত ওয়েটলিস্টেড প্রার্থীদের এম্প্যানেল করতে হবে।  পশ্চিমবঙ্গের অসংখ্য স্কুলে প্রচুর সংখ্যক শিক্ষকের পদ খালি থাকলেও তাদের কোনোভাবে নিযুক্তকরণ করা হচ্ছে না। এই অনশন প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণকারী বহু সদস্যকে অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়েছিল কিন্তু একটু সুস্থ হলেই তাঁরা আবার অনশন মঞ্চে ফিরে আসছিলেন। ‘এস.এস.সি. যুব ছাত্র অধিকার মঞ্চ’-এর আহ্বায়ক ইনসান জানান, “শিক্ষা নিয়ে রাজনীতি বন্ধ করুক সরকার। বিগত বছরগুলোতে বারেবারে এক একটা কাউন্সেলিং-এর পর পদসংখ্যা গায়েব হয়ে যেতে থাকে কিন্তু সেই পদে কোনো সফল পরিক্ষার্থীকে নিযুক্ত করা হয়নি।” শিক্ষামন্ত্রী পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, ‘উনি আসলে পাওয়ার ম্যান। উনি নিজের দপ্তর সম্পর্কেই কিছু জানেন না। উনি আমাদের সামনে এও স্বীকার করে নিয়েছেন যে দুর্নীতি হচ্ছে’। তিনি আরও যোগ করেন যে এই সরকার শুধু শিক্ষক নয়,সমস্ত স্কুলপড়ুয়াদের ভবিষ্যৎ নিয়েও ছিনিমিনি খেলছে। সরকার এবং এই কমিশনের ওপর আর কোনো আস্থাই রাখেন না তাঁরা। চাকরি না পেলেও দুঃখ নেই কিন্তু স্কুল সার্ভিস কমিশনের এই এতো বড় স্ক্যাম সকল মানুষের কাছে জানান দেওয়াই তাঁদের লক্ষ্য যাতে আগামী ভবিষ্যতকে এর ফল ভোগ করতে না হয়। সমাজের বিভিন্ন মহলেরে বিশিষ্ট্যজন তাদের সাথে দেখা করতে যান। সরকারের তরফে এই আন্দোলনকে ভাঙার সবরকম চেষ্টা করা হয়, বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে, ত্রিপল খুলে নিয়ে, জলের সরবরাহ বন্ধ করে। শেষে মুখ্যমন্ত্রীর আশ্বাসে তাঁরা অনশন তুলে নেন।  

তৃণমূল আমলে রাজ্যে শিক্ষাব্যবস্থার কঙ্কালসার পরিস্থিতি কার্যত উন্মুক্ত। কেবল স্কুল স্তরের শিক্ষাই নয়, কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তিতে সীট পাইয়ে দেবার নাম করে তৃণমূলের ছাত্র-সংগঠনগুলির তোলাবাজির কাহিনী রাজ্যের প্রতিটি কলেজেই সুবিদিত। প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তা এবং স্থানীয় তৃণমূল নেতৃত্বের পরোক্ষ মদতে টাকা দিয়ে অনার্স পাইয়ে দেওয়ার সংস্কৃতি আজ সুবিদিত। জেলা থেকে শহর, ছবি সর্বত্র একই। শিক্ষক নিয়োগে প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক হলেও আজ প্রায় ১০ বছর ধরে নতুন কোনো সরকারী বা সরকার পোষিত শিক্ষক-প্রশিক্ষণ কলেজ তৈরি হয়নি। বদলে রাজ্যের অলিতে গলিতে গজিয়ে উঠেছে নিত্যনতুন বি.এড. কলেজ, যেখানে প্রশিক্ষণের মান যথেষ্ট প্রশ্নযোগ্য এবং কোর্স ফি আকাশচুম্বী। দীর্ঘদিন নিয়োগ না হওয়ায় প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত পড়ুয়ারাও যেন-তেন প্রকারে সার্টিফিকেটটা জোগাড় করতে চাইছে।

সরকারী শিক্ষাব্যবস্থায় এই দুর্নীতি আসলে ঘুরপথে বেসরকারী শিক্ষাব্যবস্থার বিজ্ঞাপণেরই সমতুল্য। স্কুল কলেজগুলির বেহাল পরিকাঠামো, শিক্ষাঙ্গণে ব্যাপক নৈরাজ্য বেসরকারী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলিকে ধূমকেতুর মত উত্থানের সুযোগ করে দিচ্ছে। খাস কলকাতায় বাংলা মাধ্যম সরকারী স্কুলগুলি আজ ধুঁকছে পড়ুয়ার অভাবে। কলকাতার পাশাপাশি মফঃস্বল শহরগুলিতে ব্যাঙের ছাতার মত গজিয়ে উঠছে বেসরকারী স্কুল যেখানে শিক্ষার মান এবং শিক্ষকেদের যোগ্যতা নিয়ে বড়সড় প্রশ্নচিহ্ন থাকলেও তা অভিভাবকদের কাছে আকর্ষণীয় হয়ে উঠছে। তাছাড়া, শিক্ষক-প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক করে সরকারি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের সংখ্যা কমিয়ে রেখে ব্যয়বহুল বেসরকারি শিক্ষক-প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের কোর্সে ভর্তি হতে বাধ্য করা হচ্ছে যুব সমাজকে। শিক্ষক নিয়োগের দুর্নীতি এবং অযোগ্য শিক্ষক নিয়োগ সরকারী স্কুলগুলির শিক্ষার মানকে তলানিতে নামিয়ে আনতে বাধ্য, আর সেই ফাঁকে বন্যার জলের মত হু হু করে ঢুকছে বেসরকারী স্কুল কলেজগুলি আর যা সলিলসমাধি ঘটাচ্ছে সরকারী শিক্ষাব্যবস্থার।

সল্ট লেকে ময়ূখ ভবনের সামনে শিশু ও মধ্য শিক্ষা কেন্দ্রের শিক্ষকদের বিক্ষোভ

সাম্প্রতিক শিশু ও মধ্য শিক্ষা কেন্দ্রের শিক্ষকরা তাঁদের বেতন বৃদ্ধির দাবীতে ধর্নায় বসেছেন। তাঁদের বর্তমান বেতন মাসিক ৫,৯০০ টাকা মাত্র। শিক্ষামন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করতে গিয়েও জুটেছে লাঠিচার্জ। ফলে শিক্ষক নিয়োগ হোক কিংবা নিযুক্ত শিক্ষকদের বেতন, কোনকিছুতেই মাথাব্যথা নেই রাজ্য সরকারের। শিক্ষা ব্যবস্থা এখন বিষ বাঁও জলে। 

Similar Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *