ফ্রান্স, আইফেল টাওয়ার-লুভ্যার মিউজিয়াম-এর দেশ। শিল্প-সংস্কৃতি, কৃষ্টির পীঠস্থান। আবার লুই পাস্তুর, মেরী ক্যুরীর মতো বিখ্যাত বৈজ্ঞানিকদের জন্ম ও কর্মস্থান। আবার আমার মতো ফুটবল প্রেমীদের কাছে যেন এক রূপকথার দেশ এই ফ্রান্স… জিদান, গ্ৰীজম্যান, এমবাপ্পের দেশ !!

কিন্তু এইসবই ফ্রান্সের আসল পরিচয় নয়। ফ্রান্স হল সেই দেশ, যেখানে প্রায় ২৩০ বছর আগে রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে আওয়াজ তোলে সাধারণ মানুষ। সাম্য ও মৈত্রীর বীজমন্ত্র সাথে নিয়ে প্রজাতন্ত্র গঠনে উদ্যোগী হয়েছিলেন ফরাসী জনগণ। ১৪ই জুলাই, ১৭৮৯ বাস্তিল দুর্গের পতনের পরে প্রায় ১০ বছর চলে এই সংগ্ৰাম। এই সংগ্ৰাম পরিবর্তন আনে মানুষের মনন-চিন্তনে, যে দেশে নারীদের পরোক্ষ নাগরিক বলা হতো, নিজের ভালো-মন্দের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতাও ছিল না নারীদের হাতে, সেই দেশে এই বিপ্লব প্রথম দেখায় নারীরাও পুরুষের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে পারে, শাসকের বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলতে পারে। এমনকি, প্রথম সমাজতান্ত্রিক সমাজ নির্মাণের চিন্তা ভাবনাও শুরু হয় এর পরেই ।

ফরাসী বিপ্লবের, নবজাগরণের এই দেশ বারবার জেগে উঠেছে, গর্জে উঠেছে, প্রতিবাদ করেছে সবরকমের অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে। ১৯৩৬, ১৯৬৮, ১৯৯৫, ২০১০ বা সাম্প্রতিক ২০১৮ সালের ইয়ালো ভেষ্ট আন্দোলন বারবার প্রমাণ দিয়েছে এই দেশের জনগণের প্রতিবাদী ও প্রতিক্রিয়াশীল চরিত্রের।

১৯৯৩, ২০০৩, ২০১০ ও ২০১৩ সালের পর আবার ২০১৯ সালে ফরাসী সরকার সিদ্ধান্ত নেয় পেনশন সংক্রান্ত নিয়মাবলী ও অবসর ভাতার পরিমাণ সংশোধনের। ২০১৭ সালের সেপ্টেম্বর এ জীন-পর দেলেভয় পেনশন সংশোধন কমিটির হাই কমিশনার নিয়োজিত হন। ২০১৯ সালের জুলাই মাসে প্রথম রিপোর্ট প্রকাশ করে ওই কমিটি। ১৬ই ডিসেম্বর তিনি পদত্যাগ করতে বাধ্য হন যখন জানা যায় যে তিনি রিপোর্টে ১৩জন স্বেচ্ছাসেবীর কার্যক্রম প্রকাশ করেননি। ফরাসি বহুজাতিক সংস্থার প্রাক্তন কর্মচারী ঋরেন্ট পিয়েট্রাসিউস্কিকে ওই কমিটির হাই কমিশনার নিয়োজিত করা হয়। ফরাসি সরকারের মতে, এই সংশোধন অনেকগুলি জটিল ব্যবস্থাকে সরলীকৃত করে। কিন্তু ট্রেড ইউনিয়নগুলির  বক্তব্য এই নতুন ব্যবস্থা সমাজে অসমানতা বাড়াবে এবং অবসর ভাতার গড় পরিমাণ কমে যাবে। নতুন নিয়ম অনুযায়ী, সমস্ত কর্মচারী তাঁর বার্ষিক আয়-এর একটি অংশ ব্যয় করে কিছু পয়েন্ট কিনবেন। এই জমানো পয়েন্টগুলি দিয়ে অবসরের পর তিনি অবসর ভাতা পাবেন। আগে যেমন এক কাজে একই অবসর ভাতা ছিল, এই নিয়মের পর তা আর থাকবে না। ফরাসি সংবাদ সংস্থা ‘ফ্রান্স ২৪’-এর রিপোর্ট অনুযায়ী এই নিয়ম কার্যকর হলে সবথেকে বেশি ক্ষতিগ্রস্থ হবেন মহিলারা।

৫ই ডিসেম্বর ২০১৯-এ ৩০-এরও বেশী ট্রেড ইউনিয়নগুলোর ডাকে হরতাল শুরু হয় যার ফলে আইফেল টাওয়ার বন্ধ করে দিতে হয় এবং প্রায় ৬০০০ পুলিশ মোতায়েন করা হয় শুধু মাত্র প্যারিসে‌। পুলিশ ও সরকারি রিপোর্ট অনুযায়ী, প্যারিসে প্রায় ৬৫,০০০ ও সারা দেশে ৮০০,০০০ মানুষ এই বিক্ষোভে অংশ নেন। ৮ই ডিসেম্বর পর্যন্ত ফ্রান্সের যোগাযোগ ব্যবস্থা স্তব্ধ হয়ে থাকে‌। কয়েকশো বিমান পর্যন্ত বাতিল করতে হয়‌। ১২ই ডিসেম্বর প্রধানমন্ত্রী এদুয়ার্দো ফিলিপ্পে ঘোষণা করেন যে অবসরের বয়সসীমা ৬২ থেকে বাড়িয়ে ৬৪ করা হবে যার ফলে ১৭ ডিসেম্বর দেশজুড়ে প্রতিবাদ বাড়িয়ে তুলতে বিক্ষোভ প্রদর্শনের ডাক দেওয়া হয়। ফরাসি বিদ্যুৎ সংস্থা “ইলেক্ট্রিসিটি অফ ফ্রান্স”-এর কর্মীরা অ্যামাজন ও অন্যান্য বহুজাতিক সংস্থার দপ্তর এবং রাষ্ট্রপতি মাঁক্রুর দলের অফিসগুলিতে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করেন এবং বিল দিতে না পারায় বিচ্ছিন্ন হওয়া ঘরগুলিতে বিদ্যুৎ সংযোগ চালু করেন। ৮ই জানুয়ারি ২০২০ কেইন শহরে আইনমন্ত্রকের দপ্তরের সামনে বেশকিছু আইনজীবী তাঁদের পোশাক ছুঁড়ে ফেলেন ও পেনশন ব্যবস্থা ধ্বংসের প্রতিবাদ সামিল হন। ২৫শে জানুয়ারি এই আন্দোলন অন্য রূপ পায় যখন দমকল কর্মীরা বিভিন্ন গণআন্দোলনের পতাকা নিয়ে এবং কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিকের গান “দা ইন্টারন্যাশনাল” গাইতে গাইতে সামিল হন। ওইদিন সারাদেশ ব্যাপী এই আন্দোলনে পুঁজিবাদী ব্যবস্থা ছুঁড়ে ফেলার স্লোগান ওঠে।

ফরাসী প্রধানমন্ত্রী জানান যে, এই আন্দোলন সরকারের পেনশন সংশোধনের সিদ্ধান্তকে দমাতে পারেনি এবং পারবেও না। অপর দিকে বামপন্থী ট্রেড ইউনিয়নগুলিও এই আন্দোলন থেকে সরে আসতে নারাজ। বিভিন্ন বেসরকারি সমীক্ষা সংস্থা ও সংবাদপত্রের রিপোর্টের ভিত্তিতে জানা গেছে যে, প্রায় ৬১% জনগণ এই আন্দোলনকে সমর্থন করেন এবং ক্রাউডফান্ডিং-এর মাধ্যমে ২ মিলিয়ন ইউরো অর্থসাহায্য করেছেন। এই আন্দোলন ফ্রান্সের গত ৫০ বছরের ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘ দিন চলতে থাকা বনধ এবং জনগনের যোগদানের হিসেবে গত ১০ বছরের বৃহত্তম হরতাল হিসেবে পালিত হয়েছে।

এই আন্দোলন বারবার করে পুঁজিবাদী ব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে এবং এই একুশ শতকেও বামপন্থা ও বামপন্থীদের প্রয়োজনীয়তাকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে।

শঙ্খ শুভ্র গোস্বামী প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়ে জীবন বিজ্ঞান বিভাগের ছাত্র।

Similar Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *