২০১১-তে রাজ্যে ক্ষমতায় আসার পরেই কলকাতাকে লন্ডন বানানোর পরিকল্পনা নিয়েছিলেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। এরপর তাঁর নির্দেশেই শহরে শুরু হয় নীল-সাদা সৌন্দর্যায়ন। রেলিং, রাস্তার ডিভাইডার থেকে শুরু করে সরকারি ভবন, শহরকে নীল সাদা রঙে রাঙানোর নির্দেশ দেন মুখ্যমন্ত্রী। কলকাতা পুরসভা তো একধাপ এগিয়ে ঘোষণা করে বাড়ির বাইরে নীল-সাদা রঙ করলে সম্পত্তি করে ছাড় পাওয়া যাবে। তারপর গঙ্গা দিয়ে অনেক জল বয়েছে, নীল-সাদা রঙের টেন্ডার ও রঙ কেনা নিয়ে একাধিক দুর্নীতির অভিযোগও হয়েছে। আর এবার বিতর্ক দানা বাঁধল সরকারের আরও এক ‘উন্নয়নমুখী’ প্রকল্পকে ঘিরে। সম্প্রতি কলকাতা ও হাওড়ায় ঠিকা জমিতে আবাসন তৈরির লক্ষ্যে বিধানসভার চলতি অধিবেশনে ‘ওয়েস্ট বেঙ্গল ঠিকা টেনেন্সি (একুইজিশন এণ্ড রেগুলেশন এমেন্ডমেন্ট) বিল, ২০১৯’ পেশ করতে চলেছে রাজ্যের ভূমি ও ভূমি সংস্কার দফতর। চলতি আইনের কয়েকটি ধারায় সংশোধনী এনে বলা হয়েছে, কলকাতা ও হাওড়ায় ঠিকা জমিতে, ফাঁকা জমিতে এবং মামলা মোকদ্দমায় জর্জরিত ভগ্নপ্রায় বাড়িতে সরকারী মধ্যস্থতায় বেসরকারী সংস্থাগুলি আবাসন-সহ অন্যান্য প্রকল্প তৈরি করবে।
নতুন সংশোধিত বিলে প্রস্তাবিত যে, শুধু ঠিকা জমির বাসিন্দারাই নন, এই সমস্ত আবাসনগুলিতে গৃহহীনদেরও পুনর্বাসনে ব্যবস্থা করা হবে। গালভরা এইসব শব্দ, বিলের পরিণতি যে কি হবে তা অনেকাংশেই অনুমেয় অতীতে তৃণমূল সরকারের বিভিন্ন ‘উন্নয়মূলক’ কর্মকাণ্ড থেকেই। প্রস্তাবের সারবত্তা একটু গভীরে অনুধাবন করলেই সরকার তথা শাসকদলের আসল উদ্দেশ্য স্পষ্ট হয়ে যাবে। বস্তি, ঠিকা জমি, ফাঁকা জমি এবং ভগ্নপ্রায় মামলা-মোকদ্দমায় জড়িত বাড়িগুলি, যেখানেই এই আবাসনগুলি গড়া হবে এবং তা সবই হবে বেসরকারী সংস্থার হাত ধরে, সরকার সেখানে ‘মধ্যস্থতাকারী’-র ভূমিকায় থাকবে। অর্থাৎ আবাসনগুলির গুণগত মান থেকে হস্তান্তর, সবেতেই বেসরকারী সংস্থার প্রত্যক্ষ প্রভাব থাকবে। এতে আদতেও কতটা বস্তিবাসী বা সংশ্লিষ্ট বাড়ির বাসিন্দাদের স্বার্থ রক্ষিত হবে সে নিয়েই উঠে গেছে সবথেকে বড় প্রশ্নচিহ্ন।
আসলে বস্তি ভেঙ্গে নগরের সৌন্দর্যায়নের নামে বস্তি ভাঙাকেই আইনসিদ্ধ করতে চাইছে সরকার। ধীরে ধীরে যাতে এটি আইনের আওতায় এসে যায়, তার চেষ্টাও চালানো হচ্ছে ‘উন্নয়নের মোড়কে’। বিগত কয়েক বছর ধরে আমরা দেখেছি, কলকাতা ও বিধাননগরে এলাকায় এভাবেই সৌন্দর্যায়নের নামে ফুটপাথের হকারদের কোনোরকমের পুনর্বাসন ছাড়াই উচ্ছেদ করেছে পুরসভাগুলি। স্ট্রিট ভেন্ডিং অ্যাক্টের পরোয়া না করেই কখনো হল্লা গাড়ি পাঠিয়ে, কখনো মাথার ছাউনি খুলে চলেছে উচ্ছেদ। আর এবার একই ফর্মুলায় আইন বানিয়ে পরিকল্পিতভাবে বস্তি উচ্ছেদের দিকে পা বাড়াচ্ছে সরকার। এই আইনের মাধ্যমে উচ্ছেদের খাঁড়া নামতে চলেছে হতদরিদ্র মানুষের ওপর। মাথা গোজার ঠাঁইটুকুও ‘উন্নয়নের’ নামে কেড়ে নিতে চাইছে বর্তমান শাসক দল।
ফাঁকা জমি,বস্তি ও ভগ্নপ্রায় বাড়িগুলি ভেঙে যে আবাসন নির্মান হবে, তাতে প্রোমোটার-রাজ ও সিন্ডিকেট-রাজ যে আরো ফুলেফেঁপে উঠবে তা গত আট বছরের অভিজ্ঞতায় দিব্যি অনুমেয়। তৃণমূল আমলে সিন্ডিকেট আর প্রোমোটারদের দাপটে নিত্যদিনের তোলাবাজি ও দুষ্কৃতিরাজ বেড়েই চলেছে কলকাতা ও জেলার শহরগুলিতে। বিগত কয়েক বছরে যা এক ভয়াবহ মাত্রা নিয়েছে। নিউটাউন, কলকাতার উত্তর ও দক্ষিণ শহরতলীর এলাকাগুলিতে সিণ্ডিকেট ও মাফিয়ারাজের জন্য আইনশৃঙ্খলার ভয়াবহ অবস্থা কার্যত লুম্পেনদের একচ্ছত্র আধিপত্য স্থাপিত করেছে। বেসরকারী সংস্থার বানানো এই আবাসনগুলি নিয়ে কলকাতা ও হাওড়ায় যে ‘পুকুরচুরি’ হতে চলেছে তা সরকারের বিল দেখেই অনুমেয়। “প্রধানমন্ত্রী গ্রামীন আবাস যোজনা” এবং “গীতাঞ্জলি” প্রকল্পগুলিতে দুর্নীতি এবং গরীব প্রান্তিক মানুষের কাছ থেকে যেভাবে কাটমানি নেবার অভিযোগ প্রায় প্রতি ঘন্টায় তৃণমূল নেতা ও জনপ্রতিনিধিদের বিরুদ্ধে উঠছে তা এখন গা-সওয়া হয়ে গেছে রাজ্যবাসীর। এবার শহরাঞ্চলেও যে এই ঘটনার প্রতিচ্ছবি দেখা যেতে চলেছে তা কেবল সময়ের অপেক্ষা।
বস্তি ভেঙে আবাসন তৈরী হওয়ার পর তা বস্তিবাসীদের হাতে তুলে দেওয়ার যে মহান উদ্যোগের কথা বলে বিল আনা হয়েছে তা যে বাস্তবে কি মূর্তি ধারণ করবে তা নিয়েই এখন আশঙ্কার মেঘ। অর্থের বিনিময়েই আবাসনগুলি বন্টিত হবে এবং বস্তিবাসীরা তাদের প্রাপ্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়ে আরো কোণঠাসা হবে একথা হলফ করে বলা চলে।
কখনও ‘উন্নয়ন’, কখনও ‘সৌন্দর্যায়ন’-এর নামে খেটে খাওয়া মানুষের পেটে লাথি মারা তৃণমূল সরকার কার্যত অভ্যাস করে ফেলেছে। পাহাড় প্রমাণ দুর্নীতি, সাধারন মানুষের বরাদ্দ টাকা আত্মসাৎ করে দিনের পর দিন পকেট ভরাচ্ছেন তৃণমূল নেতারা। আর সাধারন মানুষের প্রাপ্য সেই টাকারই ৪৫০ কোটি দিয়ে প্রশান্ত কিশোরকে উড়িয়ে আনা হয়েছে তৃণমূলের ২০২১ ভোট বৈতরণী পার করবার জন্য।

Similar Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *