করোনা প্রতিরোধে কেন্দ্র সরকার এবং রাজ্য সরকার যুগপদ সক্রিয়। করোনা প্রতিরোধের এক অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হিসেবে বারেবারে লকডাউনকে অপরিহার্য্য বলা হচ্ছে দু’তরফে। দেশের প্রধানমন্ত্রী থালাবাসন বাজানো, লাইট নেভানো, মোমবাতি জ্বালানোর মাধ্যমে মানুষকে ‘প্রেরণা’ দেবার কথা বলেছেন আর রাজ্যে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় রাস্তায় নেমে দাগ কাটা থেকে শুরু করে পাড়ায় পাড়ায় মাইক বাজিয়ে জনগণের কাছে অর্থ-সাহায্যের আবেদন করা— ইতিমধ্যেই যথেষ্ট সাড়া ফেলে দিয়েছে।  নাগরিক সমাজের একাংশও তার এই ভূমিকায় প্রশংসায় পঞ্চমুখ। পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকার করোনা সংক্রমণ শুরুর দিন থেকে প্রথম সারির খবরের চ্যানেলগুলিতে রীতিমতো বিজ্ঞাপন দিয়ে করোনা প্রতিরোধের জন্য রাজ্যবাসীকে সচেতন করার চেষ্টায় সদাজাগ্রত ভূমিকা পালন করে আসছে। মানুষকে সচেতন করার সাথে সাথে সরকার যে রাজ্যবাসীর জন্য  কতটা চিন্তিত তা বোঝাতে ৮০ কোটিরও বেশি অর্থ বিজ্ঞাপনের পেছনে ব্যয় করা হয়েছে। রাজ্য সরকারের খাদ্য দফতর যখন বাংলার প্রথম সারির খবরের চ্যানেলগুলোতে বিজ্ঞাপন দিয়ে বিভিন্ন অর্থনৈতিক অবস্থার মানুষের জন্য বরাদ্দ রেশনের তালিকা ও পরিমাণ কি হবে তা প্রায় প্রতি ঘন্টায় দেখাচ্ছে ঠিক সেইসময়েই রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসছে খাদ্য বন্টন নিয়ে তৃণমূল-সরকারের দুর্নীতি। কোথাও তার নেতৃত্বে স্থানীয় তৃণমূল নেতা আবার কোথাও অভিযোগের তীর সরাসরি জনপ্রতিনিধিদের দিকে। রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে অভিযোগ উঠেছে রেশনিং ব্যবস্থায় জণগণের জন্য বরাদ্দ চাল-আটা-গম-চিনি স্রেফ পেশীর জোরে রেশন ডিলারদের কাছ থেকে হাতিয়ে নিচ্ছে রাজ্যের শাসক দলের নেতা-কর্মীরা।

ত্রাণ বন্টনে তৃণমূল সরকারের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও দলবাজির অভিযোগ নতুন নয়। পীড়িত মানুষদের জন্য বরাদ্দ ত্রাণ নিয়ে দলবাজি করার অভিযোগ বিভিন্ন সময়েই তৃণমূল সরকারের বিরুদ্ধে উঠে এসেছে। সেই অভিযোগই মহীরূহ আকার ধারণ করল চলতি লকডাউনের সময়। উত্তর ২৪ পরগণায় বাদুড়িয়া পৌরসভার ৯ নং ওয়ার্ডে ত্রাণ বন্টনে স্বজনপোষনের অভিযোগকে কেন্দ্র করে ধুন্ধুমার কাণ্ড হয় গত ২২শে এপ্রিল। যার জেরে স্থানীয় মানুষ অবরোধ করেন বসিরহাটের খোলাপোতা-বাদুড়িয়া সড়ক।

যদিও সরকারী ত্রাণবণ্টনকে কেন্দ্র করে এই ঘটনা বাদুড়িয়ায় ঘতেছে বলে মানতে চাননি রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী। তিনি বলেছেন স্থানীয় স্তরে একটি বেসরকারী স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার ত্রাণ বন্টনকে কেন্দ্র করে নাকি এই ঘটনার সূত্রপাত। যদিও এই মতের ১৮০ ডিগ্রি উলটো কথাই বলেছেন বাদুড়িয়ার জোড়া-অশ্বত্থতলার মানুষ। তাদের বক্তব্য অনুযায়ী ওয়ার্ডের তৃণমূল কাউন্সিলর অরিত্র ঘোষ বেছে বেছে ত্রাণসামগ্রী দিচ্ছেন তৃণমূল সমর্থকদের। তার প্রতিবাদেই এই বিক্ষোভ।

লক-ডাউনের জেরে অসংগঠিত শ্রমিকদের রুজি রুটি কার্যত শিকেয়, দিন আনি দিন খাই মানুষের কাছে করোনার থেকেও এখন ভয়ানক হলো ক্ষুধা। বাদুড়িয়ায়  ত্রাণ না পাওয়া মানুষের বিক্ষোভ হঠাতে গিয়ে স্থানীয় মানুষদের সাথে উত্তপ্ত বাদানুবাদে জড়িয়ে পড়ে পুলিশ, পরিস্থিতি আয়ত্ত্বে আনতে বিশাল পুলিশবাহিনী সেখানে আসে এবং লাঠিচার্জ করে বিক্ষোভকারীদের হঠিয়ে দেয়। কোনো মহিলা পুলিশ ছাড়াই বিক্ষোভকারীদের হঠাতে এলোপাথারি লাঠি চালায় পুলিশবাহিনী।  স্থানীয় এক মহিলার উপর বর্বরভাবে পুরুষ পুলিশ দ্বারা লাঠিচার্জ করার ভিডিও-ও উঠে আসে। ঘটনাস্থল থেকে পুলিশ ২১ জনকে আটক করেছে।

লোকসভা ভোটের পর থেকেই তৃণমূল-বিজেপির দ্বৈরথ আর লাশ গোনার রাজনীতি এরাজ্যে অব্যাহত। করোনা প্রতিরোধ ও লকডাউনের আবহে তা আরো ডালপালা বিস্তার করেছে। সরকারী ত্রাণের দাবিতে মানুষের বিক্ষোভ ও তা নিয়ন্ত্রণে পুলিশ-প্রশাসনের সহানুভূতির অভাবের বদলে  তৃণমূল নেতৃত্ব আবার এই বিক্ষোভকে নিয়ন্ত্রণে প্রশাসনের দোষ দেখতে নারাজ। তাদের বক্তব্য বিক্ষোভকারীরা বিজেপির উস্কানিতে বাদুড়িয়া থানার ওসি বাপ্পা মিত্রের মাথা ফাটিয়ে দেয় আর সেজন্যই ‘বাধ্য হয়ে’ লাঠি চালায় পুলিশ। এখন প্রশ্ন হলো সরকারী ত্রাণসামগ্রী যদি এত সুষ্ঠুভাবে বন্টিত হয় তবে রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ত্রাণবিলি নিয়ে এত অভিযোগ আসছে কেন খাদ্য দফতরের বিরুদ্ধে।

চলতি লক ডাউনে সরকারী ত্রাণ বটনের অভিযোগ আসছে দক্ষিণবঙ্গের বিভিন্ন জেলা থেকে। বীরভূমে তৃণমূল সরকারের এক মন্ত্রী আশিস বন্দ্যোপাধ্যায়ের  ঘনিষ্ঠ তৃণমূল নেতার বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে। আবার গতকাল বীরভূমের সাইথিয়ার আমোদপুরে ত্রাণ বন্টনকে নিয়ে প্রত্যক্ষ সংঘর্ষের জড়িয়ে পরে তৃণমূল-বিজেপি। দুপক্ষই একে অপরের বিরুদ্ধে সমর্থকদের মারার অভিযোগ এনেছে। তৃণমূলের বিরুদ্ধে বেছে বেছে ত্রাণ দেবার অভিযোগ উঠেছে দক্ষিণ দিনাজপুরের বালুরঘাটের রবীন্দ্রনগরেও।   

উত্তর ২৪ পরগণারই  বসিরহাট পৌরসভার ২ নং ওয়ার্ডে একইভাবে ডিলারের গুদাম থেকে ত্রাণসামগ্রী সরানোর অভিযোগ ওঠে তৃণমূলের স্থানীয় এক নেতা এবং কর্মীর বিরুদ্ধে। বসিরহাট লোকসভার অন্তর্গত বাদুড়িয়া ও নৈহাটি  যেখানে এই দুটি ঘটনা ঘটেছে সেখানকার সাংসদ তথা অভিনেত্রী নুসরত জাহান রুহির ত্রাণের দাবিতে বিক্ষোভ নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায় নি, তবে এই ঘটনার পরবর্তীতে ইন্টারনেটে তার একটি নাচের ভিডিও ভাইরাল হয়, যার জেরে সমালোচনার মুখে পরেন তিনি।    

কেবলমাত্র ত্রাণ বন্টন নিয়েই নয়; করোনা মোকাবিলায়  চিকিৎসা পরিকাঠামো নিয়েও পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকারের ভূমিকার প্রশ্ন উঠেছে বারেবারে। করোনায় আক্রান্ত হয়ে রোগীমৃত্যুর সংখ্যা কমানো থেকে টেস্টের হার দেশে তলানিতে থাকা, চিকিৎসকদের সুরক্ষার জন্য পিপিই-এর মান নিয়ে প্রশ্ন। এর পাশাপাশি নতুন করে বিতর্ক উস্কে দিয়েছে গতকাল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মন্তব্য, বাড়িতেই সন্দেহভাজন করোনা সংক্রামিতের চিকিৎসার ব্যবস্থা করা নিয়ে। তবে কি পরিকাঠামোর অভাব প্রকট হচ্ছে এরাজ্যে? মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই বক্তব্যের পর তার রাস্তায় নেমে কাজ করা, বাজারে গিয়ে দাগ কাটা, মাইক ফুঁকে এলাকার মানুষকে সচেতন করার যথার্থতাও প্রশ্নের মুখে।

তবে ত্রাণ বন্টন নিয়ে দলীয় রাজনীতির অভিযোগ এখানেই থেমে নেই, দেশের বিভিন্ন জায়গায় বিজেপির বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে নরেন্দ্র মোদি ও পদ্মফুলের ছবি ছাপিয়ে প্রচার আর এরাজ্যে তৃণমূলের বিরুদ্ধে উঠেছে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ছবি ত্রানসামগ্রীতে ছাপানোর অভিযোগ।

এ দৃশ্য শুধু এই রাজ্যেরই নয়। লক-ডাউন যত দীর্ঘায়িত হচ্ছে  সাধারণ গরীব খেটে খাওয়াদের, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের পরিস্থিতি আরো অন্ধকারের দিকেই এগিয়ে যাচ্ছে । দেশের কয়েকটি অংশ বাদ দিলে গোটা দেশব্যাপী প্রায় একইরকম দৃশ্যই চোখে পড়ছে গত একমাসেরও বেশি সময় ধরে। ৯৬শতাংশ পরিযায়ী শ্রমিকের ভাগ্যে রেশনের বরাত হয়নি এখনো। ৯০শতাংশ শ্রমিকের মজুরি মেলেনি। দেশের ৭০শতাংশের বেশি মানুষের পেটে তালা পড়ে গিয়েছে লকডাউনের জেরে। ইতিমধ্যে কাজ হারিয়েছেন দেশের ১২ কোটিরও বেশি মানুষ (IMF এর তথ্য অনুসারে, তার বাইরে ঠিকা শ্রমিকদের কোনো হিসেব নেই)। পরিযায়ী শ্রমিকেরা ঘরে না ফিরতে পারলেও বা মাইলের পর মাইল পথ হেঁটে ফিরছেন অভুক্ত অবস্থায়। অনিশ্চিত আশঙ্কায়, খোলা রাস্তায় ব্যাধির ভয়ের থেকেও এই শ্রমিকদের কাছে বড় হয় হয়ে উঠছে অনাহার। একদিকে সংক্রমণ আর অন্যদিকে অনাহার- জলে কুমির ডাঙায় বাঘের মত পরিস্থিতি অসংগঠিত দিন আনি দিন খাই শ্রমিকদের কাছে।

Similar Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *