[সিএএ, এনআরসি, এনপিআর-সহ শ্রমিক বিরোধী শ্রম কোড বিল, রাষ্ট্রায়ত্ত্ব সংস্থার বেসরকারীকরণ এবং কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারের বিভিন্ন জনবিরোধী নীতির প্রতিবাদে গত ৩০শে ডিসেম্বর, কলকাতায়, বেলা ১২:৩০ নাগাদ মৌলালির রামলীলা ময়দান থেকে শুরু হয় রাজভবন অভিযান। কলকাতা কর্পোরেশন পর্যন্ত মিছিল করেন পিপল’স ব্রিগেড, সিপিআই(এমএল)-রেড ষ্টার, এমকেপি, সিপিআই(এমএল), সিপিআই(এমএল)-নিউ ডেমোক্রাসি, পিসিসি সিপিআই(এমএল) এবং পিআরসি সিপিআই(এমএল)। মিছিল শেষে সাতটি বাম সংগঠনের তরফ থেকে এক প্রতিনিধিদল গিয়ে ডেপুটেশন দেন রাজ্যপালের কাছে। একটি সমাবেশের আয়োজন করা হয়। উক্ত সমাবেশে প্রতিটি সংগঠনের তরফে বক্তব্য রাখা হয়। পিপল’স ব্রিগেডের পক্ষে বক্তব্য রাখেন কম: কিংশুক চক্রবর্তী। নিম্নোক্ত প্রবন্ধে তিনি সমাবেশে তাঁর বক্তব্যের মূল নির্যাসটুকু তুলে ধরেছেন।]

বক্তব্যরত কমরেড কিংশুক চক্রবর্তী

দেশে ক্রমশ ঘনীভূত হচ্ছে অর্থনৈতিক মন্দা। শেয়ার বাজারের ফাটকা কারবারিদের কারসাজিতে লক্ষ লক্ষ কৃষক ফসলের ন্যায্য দাম পাচ্ছেন না। কাজ হারিয়ে পথে বসতে চলেছেন দেশের কয়েক লক্ষ শ্রমিক। রাষ্ট্রক্ষমতায় আসীন বিজেপি সরকার ন্যুনতম গণতান্ত্রিক প্রাপ্যটুকু আজ দিতে অস্বীকার করছে মানুষকে। অগণতান্ত্রিকভাবে ফ্যাসিবাদী কায়দায় ছেঁটে ফেলছে মানুষের সামান্য অধিকারগুলোকেও। শ্রম-আইনের সংশোধনী থেকে শুরু করে বিলগ্নিকরণ, কার্যত দেশের সমস্ত সম্পদকেই বে-সরকারি মালিকদের হাতে তুলে দিতে চাইছে কেন্দ্রের বিজেপি সরকার। দেশের প্রায় ৭৩% সম্পদ যখন ১% মানুষের হাতে গচ্ছিত তখন এক বিশেষ সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে নিশানা করে বিজেপি ও তার সরকার প্রচার চালাচ্ছে যে, এদের জন্যই বাকিদের করুণ পরিণতি।

মুসলমানদের শত্রু খাড়া করে বিজেপি চাইছে এনআরসি, সিএএ যৌথভাবে চালু করতে, যাতে করে এনআরসি-এর মাধ্যমে প্রথমে দেশের বিরাট সংখ্যক মানুষের নাগরিকত্ব কেড়ে নেওয়া যায় এবং পরবর্তীতে সিএএ আইনের বলে মুসলমান ব্যাতিরেকে সবাইকে নাগরিকত্ব দেওয়া যায়। অর্থাৎ, উদ্দেশ্য একটাই- যেন তেন প্রকারেণ দেশের একটি নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের মানুষের উপর চরম রাষ্ট্রীয় নিপীড়ণ নামিয়ে আনা যায়।

সব থেকে বড় কথা যে সমস্ত রাজ্যগুলিতে এনআরসি কখনই কোনো ইস্যু হয়ে ওঠেনি, এনআরসি চালুর কোনো দাবিই ছিল না, সেখানে বিজেপি এই ইস্যুটিকে এমন ভাবে প্রচারের আলোয় এনেছে যাতে মনে হয় যে, আমাদের দেশের যাবতীয় অধোগতির জন্য মুসলমানেরাই দায়ী, এবং তাদের দেশ থেকে তাড়ালেই দেশের ‘সমস্ত’ সমস্যার নিরসন হবে।

আসলে দেশের অর্থনীতি আজ খাদের কিনারে, ২০১৬ থেকেই পিপল’স ব্রিগেড বলে আসছে আশু অর্থনৈতিক সংকটের কথা। ২০১৯-এ এসে সেই অর্থনৈতিক সংকট আজ খবরের কাগজের সাতের পাতা থেকে প্রথম পাতায় উঠে এসেছে। বিগত ৪৫ বছরে দেশের বেকারত্বের হার সর্বোচ্চ। গাড়ি শিল্পে মন্দা, সেই জন্য উত্তর ভারতে বিভিন্ন বড় গাড়ি কারখানাগুলিতে কয়েক লক্ষ গাড়ি শিল্পের শ্রমিক আর অনুসারী শিল্পের শ্রমিক কাজ হারাচ্ছেন। একের পর এক রিপোর্টে দেশের অর্থনীতির করুণ হাল দেখা যাচ্ছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম আকাশছোঁয়া। অনাদায়ী ঋণের ভারে জর্জরিত ব্যাঙ্কগুলি ধুঁকছে, কয়লা শিল্পে ১০০% বিদেশী বিনিয়োগের রাস্তা খুলে দেওয়া হয়েছে, ভারত পেট্রোলিয়াম থেকে কনকোর, একের পর এক রাষ্ট্রায়ত্ত্ব সংস্থা বেসরকারী হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে,। আর এসব নিয়ে প্রশ্ন করা হলে কেন্দ্রীয় মন্ত্রীরা অসংলগ্ন উত্তর দিচ্ছেন।

সংকটের এই পরিস্থিতির চাপে পড়েই আজ ভারতের জনগণ সরকারের কাছে ‘উদ্বৃত্ত’। তাদেরকে ন্যুনতম সুযোগ-সুবিধাগুলিও দিতে আজ সরকার অপারগ, তাই এনআরসির নামে স্রেফ ছেঁটে ফেলার চেষ্টা করছে বিজেপি সরকার, আর বিভাজনের রাজনীতির আগুনে এই নীতিতে হাত সেঁকতেই রামমন্দির থেকে কাশ্মীর ইস্যু, একের পর এক তাস ফেলতে থাকছে তারা। সবথেকে বড় কথা যারা এদেশে এসেছেন অন্য দেশ থেকে, তারা কি শুধু পেটটাই নিয়ে এসেছেন? না, তারা দুটো হাতও নিয়ে এসেছেন, যা দিয়ে বছরের পর বছর এদেশের উৎপাদনের জন্য, এদেশের উন্নতির জন্য ঘাম-রক্ত ঝরিয়েছেন। এদেশ যতটা অম্বানী-আদানী-বিড়লাদের, তার থেকেও বেশী এই সব মানুষদের কারণ তাদের পরিশ্রমের ঘামে সিক্ত এদেশের মাটি। 

পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে সিএএ আইন আসার পরেই এনআরসি ও সিএএ আইন নিয়ে অতিসক্রিয় হয়ে ওঠেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে এই পরিস্থিতিতে আইনশৃঙ্খলার অবনতি হবে জেনেও বিভাজনের রাজনীতির ঘোলাজলে মাছ ধরতে কার্যত নিষ্ক্রিয় করে রাখেন প্রশাসনকে। যার ফলে মেরুকরণ আরো তীব্রতর করা সম্ভব হয়। কিন্তু প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, এই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ‘অণুপ্রবেশকারীদের’ বিতাড়ণের দাবিতে কাগজ ছুঁড়ে মেরেছিলেন লোকসভার স্পীকারকে। আজ তিনি ১৮০ ডিগ্রি ঘুরে শ্লোগান দিচ্ছেন ‘ক্যা ক্যা ছিঃ ছিঃ’, এর সাথে বাজারি মিডিয়া এমনভাবে প্রচার জমায় যে, বিজেপির বিরুদ্ধে যদি কেউ এই কালাকানুন আটকাতে পারেন তা হলো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। কিন্তু বিগত সাড়ে আট বছরে ভাঙর থেকে বস্তি হয়ে বিধাননগরের হকার, মানুষ উচ্ছেদের কালিতে যাদের হাত কালো তারা রক্ষা করবেন মানুষকে! যারা কিনা একসময় আরএসএস-কে ধর্মনিরপেক্ষ বলেছিলেন তারা কিনা রক্ষা করবেন সংখ্যালঘু মুসলমানদের! হাস্যকর এই কথা। পশ্চিমবঙ্গের সচেতন মানুষকে এর থেকে বড় ভাঁওতা আর কখনো কেউ দেয়নি।

কেবল ভারত বা পশ্চিমবঙ্গের ইতিহাসেই নয় বিশ্বের প্রতিটা প্রান্তে নিপীড়িত, শোষিত, ঠিকানাহীন, বাস্তুহারা মানুষের অধিকারের দাবিতে পথে নেমেছে একমাত্র লালঝাণ্ডাধারী কমিউনিস্টরাই। মনে রাখতে হবে, আমাদের দেশে যাঁরাই এসেছেন, তাঁরা কেবল তাঁদের পেটটুকু নিয়ে আসেননি, নিজেদের হাত দুটোও নিয়ে এসেছেন, যা দিয়ে তাঁরা নিজেদের খেতে খাবার তাগিদে ইট বয়ে ইমারত গড়তে গিয়ে দেশ গঠনে সাহায্য করেছেন। তাঁদের এই দেশ থেকে বিতাড়নকারী বেইমানরাই প্রকৃত ‘আন্টি-ন্যাশনাল’। ভারতের খেটে খাওয়া মেহনতি মানুষের এই বিপদে লুঠে খাওয়াদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে কমিউনিস্টরাই। 

ইনকিলাব জিন্দাবাদ !

সংগ্রামী ৭টি বাম দলের ঐক্য জিন্দাবাদ !

Similar Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *