১৯৮১ সালে আনোয়ার সাদাতের হত্যার মধ্যে দিয়ে মিশরে সূচিত হয়েছিল হোসনি মোবারকের স্বৈরতান্ত্রিক শাসন। তাঁর শাসনকালেই মিশরে নয়াউদারবাদী অর্থনীতি প্রবর্তিত হয়। ২০১১ সালে অর্থনৈতিক দুরাবস্থা এবং স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে জনগণ বিদ্রোহ শুরু করে যা ‘আরব বসন্ত’ গণজাগরণ সমূহের অন্তর্গত। কাইরোর তাহরির স্কয়ারের জমায়েত কাঁপিয়ে দিয়েছিল মোবারকের ভিত। মোবারক ক্ষমতা থেকে সরে গেলে মিশরের সেনা দেশের তদারকির দায়িত্ব নেয়। পুরানো সংবিধান খারিজ করে দেওয়া হয় এবং সাধারণ নির্বাচনের মাধ্যমে ‘মুসলিম ব্রাদারহুড’-এর নেতা মহম্মদ মর্সি রাষ্ট্রপতি পদে নিযুক্ত হন। ইসলাম বিচ্যুতিই বর্তমান দুরাবস্থার কারণ হিসেবে দর্শে হাসান আল বান্নার আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে তৈরি হয়েছিল এই ‘মুসলিম ব্রাদারহুড’। মর্সি নতুন সংবিধান প্রণয়ন করতে চাইলেও তাঁর মধ্যপন্থী অবস্থানের ফলে ইসলামী গোষ্ঠীগুলির বিরোধীতার সম্মুখীন হতে হয়। শুরু হয় বিদ্রোহ। ২০১৩ সালে সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে মর্সিকে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়। ২০১৪ সালের সাধারণ নির্বাচনে জয়ী হয়ে আব্দুল ফতেহ আল-সিসি রাষ্ট্রপতি পদে অভিষিক্ত হন। আল-সিসিও মার্কিন রাজনীতির মিশরীয় প্রহরী হিসেবে কাজ করছেন ফলে উপেক্ষিত হচ্ছে দেশের অর্থাভাব, অশিক্ষা, বেকারত্ব, মহিলাদের অধিকার প্রভৃতি।

সারা বিশ্বে যখন নয়াউদারবাদী অর্থনীতির দ্বারা সৃষ্ট ফাটলগুলি একে একে বেড়িয়ে পড়ছে তখন বিক্ষিপ্তভাবে বিদ্রোহের আগুন দানা বাঁধছে তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলিতে। তারই অংশ হিসেবে, গত ২০শে ও ২১শে অক্টোবর মিশরের রাজধানী কায়রো, দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর আলেকজান্দ্রিয়া, বন্দর শহর দামিয়েত্তা সহ অন্যান্য ৫টি শহরে বিদ্রোহের প্রতিফলন দেখা গেল যখন হাজারে হাজারে মানুষ রাস্তায় নেমে দেশের বর্তমান রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের দাবীতে বিক্ষোভ প্রদর্শন করলেন। ২০১১ সালে “মোবারক নিপাত যাক “-এর ধ্বনিতে মুখরিত হওয়া তাহরির স্কোয়ারে এবার গুঞ্জরিত হল “আল-সিসি ক্ষমতা ছাড়ো”-এর স্লোগান। প্রতিরক্ষা বাহিনী টিয়ার গ্যাস, রাবারের বুলেট ব্যবহার করে বিক্ষুব্ধ জনতাকে ছত্রভঙ্গ করার প্রয়াস সফল তো হয়ই নি বরং প্রায় ৪,৩০০ জনের কাছাকাছি লোককে গ্রেপ্তার করতে হয়েছে পরিস্থিতি সামাল দিতে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, সাম্প্রতিক ইন্টারন্যাশনাল মনিটরি ফান্ড (আইএমএফ)-এর কর্মসূচির সাথে চুক্তিবদ্ধ হওয়ার পর দেশের গ্রোথ রেট যখন ৫.৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে এই অর্থবর্ষে, তখন বিগত সপ্তাহের মধ্যে গড়ে ওঠা জনরোষের কারণ কী? এই জনরোষ কী স্বতঃস্ফূর্ত অর্থাৎ দেশের সাধারণ মানুষের ওপর অর্থনৈতিক শোষণের কারণে তিলে তিলে গড়ে ওঠা ক্ষোভের উদগীরণ নাকি একটি আগত বিদ্রোহের সূচনা? মিশরের অর্থনীতিকে একটু গভীরে বিশ্লেষণ করলেই জানা যায় দেশজুড়ে দারিদ্রের হার ব্যপকভাবে বেড়েছে এবং সাধারণ জীবনধারণও অত্যাধিক ব্যয়সঙ্কুল হয়ে ওঠার কারণে মধ্যবিত্তের জীবনও হয়ে উঠেছে দুর্বিষহ। এই আন্দোলনের বীজ যে গভীর অর্থনৈতিক বঞ্চনা থেকেই প্রণোদিত, ওয়ার্ল্ড ব্যাঙ্ক-এর ঘোষণাতেই তা সুস্পষ্ট, “মিশরের ৬০ শতাংশ মানুষই হয় দারিদ্র্যসীমার নীচে অথবা প্রবলভাবে অসুরক্ষিত”। দেশের সরকারি খাতের ব্যয়ে যখন চরম মিতব্যয়ীতা তখন বেসরকারি প্রকল্প এবং মন্ত্রীদের বিলাসিতায় জনগণের অর্থ ওড়াচ্ছে সরকার ও মিলিটারী। দেশের ১০ কোটি জনতার বেকারত্বের খাড়ার প্রকোপে ও জিনিসপত্রের মূল্যবৃদ্ধির কারণে জীবন বিপর্যস্ত। একটি সরকারি হিসাবই জানাচ্ছে যে দেশের ৩২.৫ শতাংশ মানুষ বর্তমানে দারিদ্রসীমার নীচে। আসলে মুদ্রাস্ফীতির হার ২০১৫-২০১৮ সালে বেড়েছে ৬০ শতাংশ, তবে জনসাধারণের মজুরির পরিমাণ একই থেকে গেছে, যার ফলে বাইরে থেকে বিনিয়োগের পরিসংখ্যান দেখানো হলেও ভেতরে দেশের অবস্থা হয়ে রয়েছে ভঙ্গুর। আইএমএফ-এর প্রকল্পের প্রতিফলন জনসাধারণের জীবনে পড়ল না কেন? আসলে আইএমএফ-এর প্রকল্পের তলায় এসে মিশরের পাউন্ডের দাম পড়ে যায়, জ্বালানি তেল থেকে তুলে নেওয়া হয় ভর্তুকি, করের ক্ষেত্রে সংযুক্তিকরণ করা হয় ‘ভ্যাট’। এছাড়া উক্ত প্রকল্পের মাধ্যমে দেশের মাত্র ৯.৪ মিলিয়ন মানুষকেই এই কর্মসূচির অন্তর্ভুক্ত করা গেছে যা দেশের জনসংখ্যার ১০ শতাংশেরও কম। আল-সিসি সরকার জাতীয় পরিকাঠামো নির্মাণের মতো ব্যয়বহুল প্রকল্পের জন্য ৫৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের লগ্নি আনতে শুরু করে ২০১৫ সালে, তবে মাঝপথে সংযুক্ত আরব আমিরশাহী লগ্নি তুলে নেওয়ায় সরকার চীনের কাছ থেকে ৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের ঋণে ডুবে যায়। সবমিলিয়ে বেকারত্ব ও প্রবল মূল্যবৃদ্ধি, দারিদ্র্যসীমার নীচেই থাকা দেশের অধিকাংশ মানুষের দুর্দশার কারণ রূপে বারংবার উঠে আসছে বেসরকারিকরণ এবং সরকারি মিতব্যয়ীতা। এখন লক্ষণীয় বিষয় এই যে একদিকে নয়াউদারবাদী অর্থনৈতিক সংকট এবং অন্যদিকে স্বৈরশাসনের ফলে তৈরী জনরোষ কোনপথে পরিচালিত হয়!!!

Similar Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *