রাষ্ট্রায়ত্ত্ব সংস্থার বিলগ্নিকরণের যে হাইরোড ধরে ২০১৪-তে ক্ষমতায় আসার পর থেকেই কেন্দ্রের বিজেপি সরকারের চলছিল, তার এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হয়ে রইল ২০১৯-এর নভেম্বরের তৃতীয় সপ্তাহ। গত ২০শে নভেম্বর ক্যাবিনেট বৈঠকের শেষে কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারমন সাংবাদিক সম্মেলনে জানান যে, ভারত পেট্রোলিয়াম-সহ দেশের মোট ৫ টি গুরুত্বপূর্ণ কর্পোরেট পাবলিক সোশ্যাল এন্টারপ্রাইজের মালিকানাস্বত্ব বিক্রির সিদ্ধান্ত নিয়েছে কেন্দ্র সরকার। মন্ত্রীগোষ্ঠীর এহেন সিদ্ধান্তের নেপথ্যে অর্থমন্ত্রী যুক্তি দেখিয়েছেন দেশের ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলায় সরকারী কোষাগারের জন্য অর্থসংস্থান করতেই কেন্দ্র সরকারের এই পদক্ষেপ নিয়েছে।
সরাকারের এই সিদ্ধান্তের ফলে এক লপ্তে ৫ টি সংস্থার বিলগ্নিকরণের পথ খুলে দেওয়া হলো এদের মধ্যে সর্ববৃহত সংস্থাটি হলো ভারত পেট্রোলিয়াম, যার ৫৩.২৯% শেয়ার সরকারের হাতে ছিল। এছাড়াও কনটেনর কর্পোরেশন (কনকোর), শিপিং কর্পোরেশন, নর্থ ইস্টার্ণ ইলেকট্রিক পাওয়ার কর্পোরেশন (নিপকো) এবং তেহরাই হাইডেল পাওয়ার অন্যতম। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য ২০০০ সালে অটলবিহারী বাজপেয়ী সরকারের পর এটাই হলো কোনো কেন্দ্রীয় সরকারের তত্ত্বাবধানে গৃহীত সর্ববৃহত বিলগ্নিকরণের সিদ্ধান্ত।
সরকারী সংস্থায় বিলগ্নিকরণ থেকে মোট ১ লক্ষ ৫ হাজার কোটি টাকা তোলার লক্ষমাত্রা বাজেটে নিয়েছিলেন অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারমন, কিন্তু অর্থবছরের মধ্যপর্বে এসেও সেই টাকার পরিমাণ মাত্র ১৫ হাজার কোটি টাকা ছুঁয়েছে। ভারত পেট্রোলিয়াম-সহ এই পাঁচ সংস্থার বিলগ্নিকরণের ফলে সেই লক্ষমাত্রা ৬৫-৭৫ হাজার কোটি টাকা ছোঁবে বলে ধারণা অর্থমন্ত্রীর।
সরকারের এহেন সিদ্ধান্তের পর থেকেই হইচই পড়ে গেছে রাজনৈতিক মহলে। ২০১৯-এ দ্বিতীয়বার ক্ষমতায় আসার পর থেকেই দেশ অর্থনৈতিক মন্দার যে কালো মেঘে আবৃত তা বিভিন্নভাবে নস্যাৎ করে চলেছিলেন বিজেপি মন্ত্রীরা। তথ্য হিসেবে কেউ দেখিয়েছিলেন ৩০০ কোটি টাকার সিনেমার টিকিট বিক্রির হিসাব কেউ আবার ধনতেরাসের গহনা বিক্রির তথ্য। কিন্তু দেশের কর্মসংস্থানের হাঁড়ির হাল দিনকতক আগেই শ্রমমন্ত্রী সন্তোষ কুমার গঙ্গোয়ারের প্রদেয় তথ্য থেকেই উঠে আসে যে, বিগত ২৫ বছরের মধ্যে এই বছরেই বেকারত্বের হার সব থেকে বেশী। একইসঙ্গে গাড়ি শিল্পে কয়েক লক্ষ শ্রমিকের চাকরি যাওয়া ও ইনফোসিস, কগনিজেন্টের মতো দেশের বৃহদায়তন তথ্যপ্রযুক্তি সংস্থাগুলি থেকে কর্মীছাঁটাই এর সাক্ষ্য দিচ্ছে ক্রমশ ঘনীভূত হচ্ছে মন্দার মেঘ।
সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ভারত পেট্রোলিয়ামের সরকারের শেয়ার নামিয়ে আনা হবে পঞ্চাশ শতাংশের নীচে। একমাত্র নুমালগড় তেল-শোধনাগারটি ভারত সরকারের হাতে থাকবে বলে জানিয়েছে অর্থ দফতর। সরকারী সূত্রে জানা যাচ্ছে ভারত সরকার ইতিমধ্যে রাষ্ট্রায়াত্ত্ব এই পেট্রোলিয়াম সংস্থায় বিনিয়োগ করার জন্য বিশ্ববাজারে পেট্রোলিয়াম জায়ান্ট এক্সন মোবিল, শেভ্রন, কনকো ফিলিপ্স, রয়াল ডাচ শেল, পেট্রোচায়নার মতো সংস্থাগুলির কাছে প্রস্তাব জানাবে। এছাড়াও শোনা যাচ্ছে যে, রিলায়েন্স থেকে আদানী অনেকেই ভাবনাচিন্তা করছে বিপিসিএলে বিনিয়োগ করার কথা। এর আগেও কেন্দ্রীয় সরকার যখন কয়লাখনিতে ১০০% প্রত্যক্ষ সরকারী বিনিয়োগের পথ খুলে দিয়েছিল সেসময়েও বিএইচপি বিলিটন, রিও টিন্টো গ্লেনকোর মত বেশ কয়েকটি বিদেশী খনি সংস্থা বিনিয়োগে উৎসুক ছিল।
অর্থমন্ত্রক সূত্রে জানা যাচ্ছে যে শিপিং কর্পোরেশন অব ইন্ডিয়ার ৬৩.৭৫% সরকারী শেয়ার বিক্রি করে দেওয়া হবে। এছাড়াও, খণিজ ও বানিজ্যিক পণ্য পরিবহনে দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রেল-ওয়াগন প্রস্ততকারক সংস্থা কনকোর-এর ৩০% শেয়ার বিক্রির সিদ্ধান্ত এবছর সেপ্টেম্বরেও নেওয়া হয়েছিল। কনকোর-এর বিলগ্নিকরণের সিদ্ধান্তের ফলে অর্থনৈতিক মহলের ধারনা এই সংস্থার সিংহভাগ অংশীদারী কিনতে চলেছে দেশের নব্যোত্থিত খনি জায়ান্ট আদানী গোষ্ঠী।
এর আগে দেশের একমাত্র সরকারী ব্যাঙ্ক আইডিবিআই-এর মালিকানা কেনানো হয়েছিল রাষ্ট্রায়াত্ত্ব বিমা সংস্থা এলআইসিকে দিয়ে। এই মাসেরই প্রথম দিকে নির্মলা সীতারমন দেশের সরকারী বিমান পরিবহন সংস্থা এয়ার ইন্ডিয়ার বিলগ্নিকরণের সিদ্ধান্ত জানিয়েছিলেন। আর মাস পেরোতে না পেরোতেই এহেন সিদ্ধান্ত। রাষ্ট্রায়াত্ত্ব ব্যাঙ্কগুলির সংযুক্তি করার সময় দেশের অর্থনৈতিক দুর্দশার কথা প্রকারান্তরে স্বীকার করে নিয়েছিলেন নির্মলা সীতারমন। এমনকি অক্টোবর নভেম্বরে উৎসবের মরসুমেও জিডিপি কাঙ্খিত লক্ষ্যমাত্রা না ছোঁওয়ায় হতাশা লুকিয়ে রাখতে পারেননি অর্থমন্ত্রী। গাড়িশিল্পের সংকটকে আগল দিতে তিনি বলেন, “বর্তমান প্রজন্ম গাড়ির থেকে ওলা, উবের বা মেট্রোতেই স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করছে আর তাতেই গাড়ি বিক্রি কমছে।” ছাঁটাই থেকে শুরু করে ব্যাঙ্ক সংযুক্তি কেন্দ্রের প্রতিটি সিদ্ধান্তের ঝুলি থেকেই উঁকি মারছে মন্দার প্রতিরূপ বেড়াল। তাকে লুকোচাপা দিয়ে রাখতে একের পর এক কর্পোরেট পাবলিক সোশ্যাল এন্টারপ্রাইজের মালিকানাস্বত্ব বিক্রি করছে মোদি সরকার। আর জনমানসে এই প্রশ্ন ঢাকতে ঢাল হিসেবে বিজেপি ব্যবহার করছে কখনো এনআরসি, কখনও কাশ্মীরের উপর থেকে ৩৭০ বিলোপ কখনো রামমন্দির ইস্যু।

প্রচ্ছদঃ শ্রীমন্ত বোস

Similar Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *