“সব খেলার সেরা বাঙালীর তুমি ফুটবল।” ধন্যি মেয়ের এই গান আজো বাঙালীর স্মৃতিতে অমলীন। স্বর্ণযুগের বাঙালীর ফুটবল ইতিহাসের স্মৃতিচারণ করতে গেলে পঞ্চাশ-ষাটের দশকের – চুনী-পিকে-বলরাম ত্রয়ীর নাম সবার আগে মনে আসে ফুটবল নস্ট্যালজিক বাঙালীর। ভারতের জাতীয় ফুটবল দলের কিংবদন্তী স্ট্রাইকার ও পরবর্তীতে কলকাতা ময়দানের অন্যতম সেরা প্রশিক্ষক প্রদীপ কুমার বন্দ্যোপাধ্যায় প্রয়াত হলেন। বাংলা, তথা বিশ্বের ফুটবলপ্রেমী মানুষের কাছে তিনি পরিচিত পিকে ব্যানার্জি নামে।

পেশাদারী ফুটবলের আঙিনায় তিনি পা রাখেন বিহারের হয়ে, ১৯৫১ সালে বিহারের হয়ে সন্তোষ ট্রফিতে মাত্র ১৫ বছর বয়সে তার অভিষেক হয়। ১৯৫৪ সালে তিনি পাকাপাকিভাবে কলকাতার ময়দানে প্রবেশ করেন এবং যোগ দেন আরিয়ান ক্লাবে, এরপর ১৯৫৪-১৯৬৭, প্রায় গোটা ফুটবল জীবনেই তিনি খেলেন ইস্টার্ন রেলের হয়ে। পিকে-ই ছিলেন বাংলার প্রথম ফুটবলার যিনি কলকাতার তিন প্রধান মোহনবাগান-ইস্টবেঙ্গল-মহামেডানে না খেলেও জাতীয় দলে সুযোগ পেয়েছিলেন। ১৯ বছর বয়সে ঢাকায় কুয়াডরাঙ্গুলার টুর্নামেন্টে প্রথমবার জাতীয় দলের সদস্য হন। পিকের নেতৃত্বে তৎকালীন ময়দানের ‘আণ্ডারডগ’ হয়েও ইস্টার্ন রেল ১৯৫৮-তে কলকাতা লিগ জয়ের কৃতিত্ব অর্জন করেছিল।

ভারতীয় ফুটবলের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ত্রয়ী(বাম দিক থেকে) চুনী গোস্বামী, পিকে ব্যানার্জী ও তুলসীদাস বলরাম
PDF Embedder requires a url attribute

জাতীয় দলের জার্সি গায়ে তিনি একের পর এক কৃতিত্ব অর্জন করেছেন। চুনী-পিকে-বলরামের জুটির কৃতিত্বে বহু আন্তর্জাতিক ম্যাচ থেকে সম্মান আদায় করে এনেছে ভারত। ভারতকে আন্তর্জাতিক ফুটবলে সমীহ করে চলত এশিয়া থেকে ইউরোপের বহু দল। ১৯৫৬ এর মেলবোর্ন অলিম্পিক, ১৯৫৮ এর টোকিও এশিয়ান গেমস, ১৯৬২-এ জাকার্তা এশিয়ান গেমস, ১৯৬৬ এশিয়ান গেমস ব্যাংককে ভারতীয় জাতীয় ফুটবল দলের প্রতিনিধিত্ব করেন। তবে ক্রমাগত চোটের কারনে ১৯৬৭ সালে তিনি পেশাদার ফুটবল থেকে সরে দাঁড়ান।  ১৬ বছরের ফুটবল জীবনে ৬৫ টি গোল করেছেন পিকে। ফিফা এ লিস্টেড ম্যাচে তার গোলসংখ্যা ১৫। ১৯৬০ সালে রোম অলিম্পিকে তার নেতৃত্বে ফ্রান্সের বিরুদ্ধে ১-১ রুদ্ধশ্বাস ড্র ভারতের জাতীয় ফুটবলের ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লিপিবদ্ধ ।

ফুটবলার হিসেবে যেমন বর্ণময় তার কেরিয়ার কোচ হিসেবে তিনি আরো বর্ণময় ছিলেন। ১৯৬৭ সালে ফুটবলের থেকে অবসর নিয়ে ইষ্ট বেঙ্গল ক্লাবের কোচ হিসাবে তার ফুটবল জীবনের দ্বিতীয় অধ্যায় শুরু হয়। কলকাতা ময়দানের তিন প্রধানের হয়ে না খেললেও কোচ হিসেবে সুদে-আসলে উশুল করে নিয়েছিলেন কোচিং জীবনে। তার প্রশিক্ষণে মোহনবাগান একই মরসুমে ঐতিহাসিক আই এফ এ শিল্ড, রোভারস কাপ এবং ডুরাণ্ড কাপ জেতে। ১৯৭২ সালে মিউনিখ অলিম্পিকে জাতীয় দলের কোচ হন পিকে।  ১৯৭২ থেকে ১৯৮৬ সাল পর্যন্ত জাতীয় দলের কোচ ছিলেন তিনি। কলকাতা ময়দানে কোচিং-এ একের পর এক কৃতিত্ব অর্জন করেছেন তিনি। মোহনবাগানের বিরুদ্ধে ডার্বিতে ৫-০ গোলে ইস্টবেঙ্গলের জয় ময়দানের লোকগাথায় ঢুকে পড়ে। কোচিং জীবনে মোহনবাগানের হয়ে ২৩-টি ও ইস্টবেঙ্গলের হয়ে ৩০-টি ট্রফি জেতেন। পেলের কসমসের বিরুদ্ধে ইডেন গার্ডেনের সেই ঐতিহাসিক ম্যাচে মোহন কোচ ছিলেন তিনি।  

ভাইচুং ভুটিয়ার সাথে ১৯৯৭-এর জুলাইতে মোহন-ইস্ট ম্যাচে

কোচিং জীবনে পিকের সবথেকে বর প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন ডায়মণ্ড কোচ নামে পরিচিত অমল দত্ত। বিভিন্ন ম্যাচের আগে একে অন্যের সম্পর্কে স্লেজিং ময়দানে কান পাতলেই শোনা যেত। যা সপ্তমে উঠেছিল ১৯৯৭-তে। যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গনের সেই মোহনবাগান-ইস্টবেঙ্গল ম্যাচের আগে মোহনবাগান কোচ অমল দত্ত ইস্টবেঙ্গলের ফুটবলার স্যামি ওমোলোকে ‘ওমলেট’ আর ফর্মের তুঙ্গে থাকা পাহাড়ি স্ট্রাইকার ভাইচুং ভুটিয়াকে ‘চুমচুম’ বলে কটাক্ষ করেন। ’৯৭-এর জুলাইতে সেই ম্যাচে প্রায় ১ লক্ষ ৩৫ হাজার দর্শকের সামনে অমল দত্তের মোহনবাগানকে ধরাশায়ী করে দেয় পিকের ইস্টবেঙ্গল।

পিকে ব্যানার্জীর হাত ধরে উঠে এসেছেন ময়দানের বহু তারকা। সুব্রত ভট্টাচার্য, সুভাষ ভৌমিক, বিদেশ বসু, সুরজিত সেনগুপ্ত থেকে ভাইচুং ভুটিয়া। যারা একইসাথে আলোকিত করেছেন কলকাতা তথা দেশের ফুটবলকে।   ফুটবলার হিসেবে অবদানের জন্য ১৯৬১ সালে তিনি পান ‘অর্জুন পুরস্কার’, ১৯৯০ সালে পান ‘পদ্মশ্রী’ সম্মান। ২০০৪ সালে ফিফা পি কে ব্যানার্জি কে বিংশ শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ ভারতীয় ফুটবলার আখ্যা দেয় এবং ফিফা অডার অফ মেরিট পুরস্কারে পুরস্কৃত করে। ফুটবলার জীবনের এবং কোচিং জীবনের ফুটবলার তৈরির একের পর রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতার কথা তিনি লিখেছেন তার আত্মজীবনী ‘বিয়ণ্ড নাইন্টি মিনিটস’ বইতে।  
২০ শে মার্চ, ২০২০ সালে দুপুর ১২ টা বেজে ৪০ মিনিটে বাংলা তথা ভারতের কিংবদন্তী ফুটবলার পি কে ব্যানার্জি ৮৩ বছর বয়সে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করলেন ভারতীয় ফুটবলের এই কিংবদন্তী। নক্ষত্রপতন হলো চুনী-পিকে-বলরাম জুটির একজনের। ভারতীয় ফুটবল আর কলকাতা ময়দানী ফুটবলে তিনি যে রোমাঞ্চ তৈরি করেছেন তাতেই তিনি অমর হয়ে থাকবেন। বিশেষতঃ  যেভাবে তিনি গ্রাম-মফঃস্বল থেকে উঠে আসা প্রতিভাদের ভারতীয় ফুটবলের দরবারে উপহার দিয়েছেন। প্রত্যন্ত শ্যামনগর থেকে উঠে আসা পিকের ছাত্র সুব্রত ভট্টাচার্য বলেন, “ প্রদীপদা না থাকলে আমাদের প্রজন্মের অনেক ফুটবলারই হারিয়ে যেত।”  

আজ ভারতীয় ফুটবল কর্পোরেটদের হাত ধরে ক্রিকেটের মতো ফুটবলকে গ্ল্যামারাস করে তোলার দিবাস্বপ্নে মগ্ন। তখন স্পনসর বিহীন দল নিয়ে স্রেফ ফুটবলের উৎকর্ষতার গুণে বছরের পর বছর ময়দানের ‘ক্রাউডপুলার’ ছিলেন এরা।  আই.এস.এলের নামে ভারতীয় ফুটবলকে বিক্রি করার যে প্রয়াস কলকাতা ময়দান-আই.এফ.এ- এ.আই.এফ.এফ করছে তা দেখে ১৯৬২ সালের এশিয়ান গেমসে পিকে ব্যানার্জির নেতৃত্বে সোনা জয়ী জাতীয় দলের সদস্যরা থাকলে বলতেন, ‘স্পনসরশিপের গল্প ছড়িয়ে কি ফুটবলার তৈরি করা যায়?’

Similar Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *