রাজ্যের তৃণমূল সরকার যখন পুলিশ নিয়ে শিক্ষক পেটাতে ব্যস্ত, বারংবার পদাঘাত খাওয়ার পরেও যখন বাংলার বামেরা আবারও কংগ্রেস এর ধুতির কাছা ধরতে মত্ত, তখন ‘জয় শ্রীরাম’-এর পাল্টা দাওয়াই নিয়ে বাংলায় অনুপ্রবেশ করছে আরেক সাম্প্রদায়িক শক্তি এ.আই.এম.আই.এম। গত ১৪ই আগস্ট ডায়মন্ড হারবারের নিকট সংগ্রামপুর স্টেশনে তারই একটা ঝলক পাওয়া গেল।

এ.আই.এম.আই.এম. অর্থাৎ অল ইন্ডিয়া মজলিশ-এ ইত্তেহাদুল মুসলিমীন ১৯২৭ সালে গড়ে ওঠা একটি সর্বভারতীয় দল যা আদতেই হায়দ্রাবাদ এর একটি আঞ্চলিক শক্তি। তেলেঙ্গানা আন্দোলন চলাকালীন হায়দ্রাবাদের নিজামের পক্ষ নিয়ে যে রাজাকার বাহিনী কমিউনিস্টদের নির্মমভাবে হত্যা করতে উদ্যত হয়েছিল, তাদের সংগঠনই বর্তমানের এ.আই.এম.আই.এম পার্টি। এর বর্তমান সভাপতি আসাদুদ্দিন ওয়াইসি হলেন হায়দ্রাবাদ লোকসভা কেন্দ্রের সাংসদ। গত বুধবার এই ওয়াইসির দলের কয়েকশো সমর্থক শিয়ালদহ দক্ষিণ ডিভিশনের সংগ্রামপুর স্টেশনে জড়ো হয়ে অবরোধ কর্মসূচী পালন করে। অবরোধকারীদের অভিযোগ “জয় শ্রীরাম”-এর ধ্বনির আড়ালে সংখ্যালঘু মুসলিমদের ওপর জুলুম চালাচ্ছে বিজেপি এবং প্রশাসন এর বিরূদ্ধে কোনো কঠোর পদক্ষেপ নিতে একেবারেই ব্যর্থ। তাই তাদের এই অবরোধ কর্মসূচী বলে জানিয়েছেন সংগঠনের স্থানীয় নেতৃবৃন্দ।

এই বিক্ষোভকারীদের প্রত্যেকের হাতেই ছিল প্ল্যাকার্ড যাতে দেশজুড়ে সংখ্যালঘুদের ওপর অত্যাচারের একাধিক ঘটনার উল্লেখ ছিল। ঐদিন সকালে আচমকা সংগঠনের ফেস্টুন নিয়ে রেললাইনের ওপর বসে বিক্ষোভ দেখানো শুরু করে এ.আই.এম.আই.এম-এর সমর্থকরা। এমনকী ওভারহেডের তারে কলাপাতা ফেলে দেয় বিক্ষুব্ধ সমর্থকরা। ঘটনাস্থলে বিরাট পুলিশবাহিনীর সাথে নামানো হয় র‍্যাফ। পুলিশের লাঠি বিক্ষোভকারীদের দিকে ছুটে এলে উল্টোদিক থেকে ধেয়ে আসে ইঁট, ফটাস জলের বোতল।

এ.আই.এম.আই.এম-এর স্থানীয় নেতৃবৃন্দ লাইনের ওপর দাঁড়িয়েই বক্তৃতা দিতে থাকেন সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতন বন্ধের দাবীতে। এই ঘটনার জেরে লাগাতার ট্রেন বাতিল হয়।

তবে প্রশ্ন থেকেই যায় হায়দ্রাবাদের এই আঞ্চলিক সাম্প্রদায়িক শক্তির হঠাৎ এখানে বাড়বাড়ন্ত হয়ে উঠছে কেন? ওয়াইসির সংগঠন আর.এস.এস. বা বিজেপির মতোই ধর্মের সেক্রেড গেমস খেলেই অভ্যস্ত। প্রসঙ্গত আসাদুদ্দিনের কনিষ্ঠ ভ্রাতা আকবরুদ্দিন তাঁর ভাষণে বারংবার ধর্মীয় সুড়সুড়ি দিয়ে মুসলিম জনতার মনে জাতিগত ঘৃণার উদ্রেক করার জন্য অলংকৃত। এ.আই.এম.আই.এম দলটি বরাবরই একটি পরিবারতান্ত্রিক দল। আসাদুদ্দিনের পিতা সালাহুদ্দিন একসময় পার্টির প্রেসিডেন্ট ছিলেন এবং হায়দ্রাবাদ লোকসভার ছয় বারের সাংসদ ছিলেন। তাই এই পার্টির ইতিহাস থেকেই স্পষ্ট যে এই পার্টি উগ্র হিন্দুত্ববাদের মতোই মুসলিম ধর্মীয় পলিটিক্স খেলে এসেছে এবং কোনোকালেই খেটে খাওয়া মানুষের সমস্যার কথা বলতে এরা অভ্যস্ত নয়। মুসলিম সংখ্যাগুরু অঞ্চলে মুসলিম মেজোরিটেরিয়ান রাজনীতি ও অন্যান্য অঞ্চলে ধর্মের দোহাই দিয়ে মুসলিম ভোট গোছানোই এদের পাথেয়। তবে কী পশ্চিমবঙ্গেও সেই খেলার আসরে যোগ দেওয়ার প্রথম ধাপ ফেলল এ.আই.এম.আই.এম! তাই এই বিভেদকামী শক্তির আগমন নেহাৎ-ই কাকতালীয় বলা চলে না। বিগত নির্বাচনের ফলাফলেই দেখা গেছে বামপন্থীদের ও তৃণমূলের পক্ষে ভোট কমছে। এই সুযোগে মুসলিমবন্ধু পার্টির ইমেজ তৈরি করতেই এদের পদার্পণ নয়তো! রাজনৈতিক মহলের অনেকেই মনে করছেন, শুনতে অবাক লাগলেও, মুসলিমদের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি করতেই এ.আই.এম.আই.এম.-কে মাঠে নামানোর পরিকল্পনা বিজেপির দ্বারা প্রণোদিত হওয়ার যথেষ্ট সম্ভাবনা আছে। অর্থাৎ বিভেদের যে খেলা একদিকে বিজেপি ও অন্যদিকে তৃণমূল শুরু করেছে, সম্প্রীতির পশ্চিমবঙ্গে সেই খেলায় কী অন্য মাতব্বর যোগ হল, বিজেপির সুবিধা করে দিতে আর সাম্প্রদায়িকতার পরিস্থিতিকে আরও উস্কানি দিতে, সেই প্রশ্ন উদীয়মান!!

Similar Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *