ভোর হতে না হতে লাইন দিয়েছেন রবিউল শেখ। আজ হয়তো কাজ হবে এই আশায়। গত বছরই তিনি পেয়েছেন ডিজিটাল রেশন কার্ড, তাতে তার নাম এসেছে শেখ রবিউল। বিপত্তির শুরু সেখান থেকেই। নাম সংশোধনের কথা মাথাতে এলেও রেশন পাচ্ছিলেন বলে দিন আনি দিন খাই মানুষটি গুরুত্ব দেন নি বিষয়টা। কিন্তু অসমে এনআরসি চালু হবার পর ভীতি ধরে গেছে বসিরহাট-২ ব্লকের রাজেন্দ্রপুরের এই মানুষটির। অসমে নামে ভুল থাকায় এবং কাগজপত্র ঠিক না থাকায় নাম বাদ গেছে লক্ষাধিক মানুষের, তাদেরকে রাখা হবে ‘ডিটেনশন ক্যাম্পে’, এই খবরই রাতে ঘুম উড়িয়ে দিয়েছে রবিউল শেখের। তাই রাত থাকতে থাকতেই বাড়ি থেকে বেরিয়ে ১০ কিমি দূরে লাইন দিয়েছেন তিনি। কেবল বসিরহাট-২ নয়। পশ্চিমবঙ্গের ব্লকে ব্লকে এই একই চিত্র ধরা পরছে, অশীতিপর বৃদ্ধ থেকে দেড় মাসের শিশু কোলে প্রসূতি— সকলেই লাইনে। গতবছরেই অসমে এনআরসি হবার পরে একাধিক জায়গায় সভাতে এবং সাংবাদিক সম্মেলনে বাংলাতেও এনআরসি হবে বলে হুংকার দিতে থেকেছেন বিজেপির পশ্চিমবঙ্গের সভাপতি দিলীপ ঘোষ তা আজও অব্যাহত। আর এতেই ভিটেমাটি ছাড়ার আতঙ্কে মানুষ বিভিন্ন অফিসে দৌড়োচ্ছেন নাম সংশোধন করার জন্য পাছে তাদের বাংলাদেশি বলে দাগানো হয়য় এই ভয়ে। নোটবন্দির সময় ব্যাঙ্কের লম্বা লাইন এবং সেই লাইনে দাঁড়িয়ে প্রায় ১৫০ জনের মৃত্যুর স্মৃতিই যেন ফেরাচ্ছে এই ‘সংশোধন-ভূত।

কেবল রেশন কার্ড নয়, ভোটার কার্ড সংশোধন, জন্ম শংসাপত্রে নাম সংশোধন, ব্যাঙ্কের একাউণ্টে নাম সংশোধন—  সর্বত্রই বিভিন্ন সরকারি অফিসে হুড়োহুড়ি পড়ে গেছে। অফিস-কাছারি, দোকান-ব্যবসা ছেড়ে মানুষ দৌড়োচ্ছেন বিভিন্ন অফিসে। ২-৩ বছর আগে আবেদন করার পরেও ডিজিটাল রেশন কার্ড পাননি অনেকে। বারেবারে পঞ্চায়েত থেকে খাদ্য দফতরের অফিসে দরবার করেও ফল মেলেনি। ফর্মের বিভিন্নতার ঘনঘটায় মানুষ গিয়ে পড়ছেন দালালদের খপ্পরে। প্রতিটা অফিসের সামনেই রমরম করে চলছে দালালচক্র। কোথাও বিনামূল্যের ফর্ম বিক্রি হচ্ছে ১০০-২০০ টাকায়। আবার কোথাও ফর্ম-ফিলাপ করার জন্য দালালরা হাতিয়ে নিচ্ছে কয়েকশো টাকা। ভোটার কার্ড সংশোধন হচ্ছে আবার অনলাইনে, তাই সাইবার ক্যাফে গুলোর সাথেও পড়ছে লম্বা লাইন। ভোটার আইডি কার্ড থেকে আধার কার্ড; সমস্ত নথি নাকি একে অপরের সাথে ‘লিঙ্ক’ করাতে হবে। অনলাইনে আপলোড করতে হবে ‘ফ্যামিলি ট্রি’। নির্বাচন কমিশনের ওয়েবসাইটে এই তালিকা দিতে হবে, এই মর্মেই চলছে প্রচার। এর সাথে গুজব ছরানো হচ্ছে নির্দিষ্ট দিনের মধ্যে এসব তথ্য সংশোধন না করলে আর সংশোধন করা যাবে না।

হোয়াটস এপ, ফেসবুকের মত বিভিন্ন ‘সোশ্যাল মিডিয়া’-তে পশ্চিমবঙ্গে এনআরসি সংক্রান্ত এহেন গুজব ভরা পোস্ট কার্যত ছেয়ে গেছে। এই প্রচারের সবথেকে বেশী বিচরণ গ্রামাঞ্চলে। প্রশাসনিক গাফিলতিতে দিনের পর দিন বিভিন্ন সরকারি নথিতে ভুল তথ্য আসে। যেমন  ভোটার কার্ডে নামে ভুল, স্বামীর নামের জায়গায় পিতার নাম বসিয়ে দেওয়া ইত্যাদি। এহেন ভুল আকছারই ঘটে। সেজন্য প্রতি বছর ভোটার লিস্ট আর ভোটার কার্ডে সংশোধনী করা হয়ে থাকে বিডিও অফিস গুলিতে। কিন্তু ‘ফ্যামিলি ট্রি’ এবং সমস্ত নথি ‘লিঙ্ক’ করানোর চক্করে প্রাণ ওষ্ঠাগত মানুষের। আর এর সবথেকে করুণ শিকার মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষরা। কারণ তাদের নামের বানান সঠিক করতে না পেরে প্রশাসনের ওপরমহলে বসে থাকা কর্মচারীরা নিজেদের ইচ্ছামতো বানান করে দেন। আর সেই গাফিলতির ফল ভুগতে হচ্ছে তাদের। যেখানে ভোটার কার্ডের ক্ষেত্রে নিয়ম আছে সঠিকভাবে ফর্ম পুরণ করিয়েই বুথ স্তরে ফর্ম জমা নেওয়ার দ্বায়িত্ব নির্বাচন কমিশন নিযুক্ত ‘ডি ও’-এর। সেখানে একই ত্রুটি বছরের পর বছর কীভাবে চলতে পারে, এ নিয়েও উঠেছে প্রশ্ন।

প্রশ্ন উঠছে ভোটার কার্ড সংশোধনে নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়েও। সংশোধনের সম্পূর্ন প্রক্রিয়া অনলাইনে করা হয়েছে। ‘গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা’-এর উৎসব হিসেবে প্রচার করা হয় ভোটকে, সেখানে ভোটার কার্ড সংশোধনের মত গুরুত্বপূর্ন বিষয়কে কীভাবে পুরোটাই অনলাইনে করে দেওয়া কতটা যুক্তিযুক্ত? দেশের কত শতাংশ মানুষ সরাসরি ইন্টারনেট বা ব্রডব্যাণ্ডের মত মহার্ঘ্য প্রযুক্তি সুবিধা পেয়ে থাকেন? পুরো পদ্ধতিটা অনলাইনে করে ঘুরপথে বেসরকারিকরণ এবং  দালালরাজকেই কী প্রশ্রয় দিচ্ছে  নির্বাচন কমিশন?

এনআরসি আতঙ্কের প্রধান মুখই আজ দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। সম্প্রতি ঝাড়খণ্ডের একটি সভায় তিনি জানিয়েছিলেন গোটা দেশেই এনআরসি চালু হোক সেটাই চায় সরকার। এই মন্তব্যের পর উদ্বাস্তু অধ্যুষিত সীমান্ত অঞ্চলগুলিতে চিন্তার ভাঁজ মানুষের কপালে। নাগরিকত্ব আইনের সংশোধন করে বাংলাদেশ থেকে আগত হিন্দুদের নাগরিকত্ব দেওয়া হবে বলে বিজেপি প্রচার চালিয়েছিল পশ্চিমবঙ্গের উদ্বাস্তু মতুয়া অধ্যুষিত দুটি লোকসভা কেন্দ্র বনগাঁ ও রাণাঘাটে। তার ফলও মিলেছে হাতেনাতে। দুটিতেই জয় পেয়েছে বিজেপি। কিন্তু বছর ঘুরতে না ঘুরতেই অসমের ১৯ লক্ষ মানুষের নাম বাদ যাবার আতঙ্ক, ডিটেনশন ক্যাম্পের ছবির আতঙ্ক চেপে বসেছে সীমান্ত অধ্যুষিত এই অঞ্চলগুলির মানুষের মনে।

 ২০০৫-এ পশ্চিমবঙ্গে এনআরসি চালুর দাবিতে লোকসভার স্পীকারকে কাগজ ছুঁড়ে মেরেছিলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। বর্তমানে ১৮০ ডিগ্রি ঘুরে তিনিই এনআরসির ঘোর বিরোধী। সম্প্রতি কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের সাথে বৈঠকের পর মুখ্যমত্রী জানিয়েছেন তিনি অমিত শাহকে বলেছেন ভূকৌশলগত দিক দিয়ে এনআরসি পশ্চিমবঙ্গে উপযুক্ত নয়। বস্তুত বাংলায় এনআরসি নিয়ে তারপর একটা কথাও খরচ করেননি অমিত শাহ। কিন্তু তাতে তার দলের পশ্চিমবঙ্গের নেতারা বিন্দুমাত্র দমছেন না। সর্বত্রই এর সমর্থনে বিশেষ সম্প্রদায়ের অনুপ্রবেশকারীদেরকে ‘খেদানো’ হবে বলে প্রচার চালাচ্ছেন তারা। আর এতে করেই আতঙ্ক বেড়েছে সাধারন মানুষের মনে। তাই সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ যিনি কিনা কখনো পশ্চিমবঙ্গের সবকটা জেলায় গেছেন কিনা সন্দেহ তারাও নিজের রুটি-রুজির সংস্থান বাদ দিয়ে দৌড়োচ্ছেন নিজেদেরকে ‘ভারতীয়’ প্রমাণ করতে।  

Similar Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *