তিন থেকে ছয় মাসের জন্য সম্ভাব্য কোরোনা সংক্রমণের জন্য ইন্টারফেরন আলফা-২বি মজুত থাকবে।

এই মুহূর্তে কোভিড-১৯ সৃষ্টিকারী নতুন ধরণের করোনা ভাইরাস সার্স কোভ-২-এর (SARS COV-2) কোন প্রতিষেধক বা নির্দিষ্ট চিকিৎসা না থাকলেও, কিউবার ফার্মাসিউটিক্যাল শিল্প এই রোগে আক্রান্তদের চিকিৎসার জন্য ও এই সংক্রান্ত জটিলতার জন্য প্রটোকলে আছে এমন অন্যান্য গ্রুপের ওষুধ-সহ প্রমাণিত,উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন রিকম্বিনেন্ট হিউম্যান ইন্টারফেরন আলফা-২বি-র উৎপাদন সুনিশ্চিত করছে।

বায়ো-কিউবা ফার্মার প্রেসিডেন্ট ডাঃ এদুরাদো মার্টিনেজ ডিয়াজের বলেছেন, এই এন্টারপ্রাইজ গ্রুপ, এই কাজে চীনের অভিজ্ঞতাকে ধর্তব্যের মধ্যে এনেছে। দেশের ফার্মাসিউটিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের প্রকাশিত ভাইরাসের চিহ্নিতকরণ ও চিকিৎসা সংক্রান্ত নির্দেশিকার মাধ্যমে চীনের অভিজ্ঞতাকে যুক্ত করার চেষ্টা করা হয়েছে।

তিনি এও বলেছেন যে, এই নির্দেশিকা ইন্টারফেরনকে পছন্দের প্রথম ওষুধ হিসেবে সুপারিশ করেছে, যা আমরা আমাদের জনস্বাস্থ্য-ব্যবস্থায় এবং আন্তর্জাতিক স্তরে যোগান দিতে পারব।

কিউবার সেন্টার ফর জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড বায়োটেকনোলজি (সি.আই.জি.বি)-র ডেপুটি ডিরেক্টর মার্তা আয়লা আভিলা ব্যাখ্যা করেছেন যে, চীনের জিলিনে অবস্থিত চীন-কিউবা যৌথ-উদ্যোগ চ্যাঙ্গচুন হেবার বায়োলজিক্যাল টেকনোলজির ব্যবস্থাপনায়, কিউবার প্রযুক্তিতে তৈরি ইন্টারফেরনের যোগান দিয়ে আসছে কিউবা এবং তা বর্তমানে নেবুলাইজেশনের মাধ্যমে উচ্চ-আশঙ্কাজনক ব্যক্তিদের এবং স্বাস্থ্য-কর্মীদের জন্য প্রতিরোধক হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। একইসঙ্গে এটা ব্যবহৃত হচ্ছে কোভিড-১৯ আক্রান্তদের জন্যও, যাতে দ্রুত ফুসফুসে পৌঁছে সংক্রমণের প্রাথমিক পর্যায়ে প্রভাব ফেলতে পারে।

একইসাথে তিনি জানাচ্ছেন যে, আমরা কিউবাতেও ইন্টারফেরন ব্যবহারের জন্য প্রস্তুতি নিয়ে চলেছি, কারণ যৌথ উদ্যোগের সুবিধার পাশাপাশি আমাদের দেশেরও এককভাবে সেই সামর্থ্য আছে।

এবিষয়ে, সিআইজিবি-র জেনারেল ডিরেক্টর ইউলোজিও পিমেন্তেল ভ্যাজকুয়েজ, জানিয়েছেন যে, কিউবাতে আগামী তিন থেকে ছয় মাসের মধ্যে যতগুলি সংক্রমণের ঘটনা ঘটতে পারে তার চিকিৎসার জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণে ইন্টারফেরনের যোগান আছে। সেই সঙ্গে তিনি বলেছেন, “আমাদের মোট ততপরিমাণ ইন্টারফেরনের যোগান প্রক্রিয়াধীন আছে, যতটা  চীনের মোট সংক্রমিতদের চিকিৎসার জন্য পর্যাপ্ত ছিল।”

অধুনা, এই ওষুধটিকে নতুন কোরোনা ভাইরাসের চিকিৎসার জন্য জনস্বাস্থ্য মন্ত্রকের (মিনসাপ) স্বীকৃত প্রোটোকলে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, এবং অন্যান্য দেশের স্বাস্থ্য মন্ত্রকের তরফ থেকেও আবেদন এসেছে। পিমন্তেল বলেছেন, শুধু দেশের সম্ভাব্য বাড়তে থাকা চাহিদাই নয়, এমনকি অন্যান্য দেশগুলি থেকে ওষুধের তথ্য এবং যোগান উভয় নিয়েই আসা ১৫ টি আবেদনে সাড়া দেওয়ার সামর্থ্যও এই সংস্থার আছে।

নতুন কোরোনা ভাইরাসে আক্রান্তদের চিকিৎসায় ফলপ্রসূ হওয়ার দরুন বিগত কয়েকদিনে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের শিরোনামে রিকম্বিনেন্ট হিউম্যান ইন্টারফেরন আলফা ২বি-র নাম উঠে এলেও, বিশ্বব্যাপী অতিমারীকে প্রতিহত করার জন্য কিউবার কাছে কেবলমাত্র এই একটি ওষুধই আছে এমন নয়।

মার্টিনেজ জোরের সঙ্গে জানিয়েছেন যে, কিউবার চিকিৎসা-সংক্রান্ত প্রোটোকলে এমন আরও ২১ টি ওষুধ যুক্ত করা হয়ছে, যেগুলির মধ্যে একাধিক অ্যান্টি-ভাইরাল, অ্যান্টি-অ্যারিদমিক (হার্টেরওষুধ) এবং অ্যান্টি-বায়োটিক রাখা হয়েছে কোভিড-১৯ রোগীদের সম্ভাব্য জটিলতার চিকিৎসার জন্য, এবং দেশের শিল্পক্ষেত্র এগুলির উৎপাদন সুনিশ্চিত করতে পারে।

উদাহরণস্বরূপ, এ.আই.সি.এ ল্যাবরেটরিজের জেনারেল ডিরেক্টর অ্যান্তোনিয় ভাল্লিন জানিয়েছেন, ১৭০ টি সূচের মাধ্যমে দেওয়া যায় এমন ওষুধ এবং জীবাণুমুক্তকারী চোখের ড্রপ তৈরি করে, যার মধ্যে পাঁচটি রোগী শুশ্রূষার মূল প্রোটোকলে আছে।

তিনি আরও বলেছেন যে, উৎপাদন চলছে এবং উৎপাদিত হয়ে গেছে এমন জিনিসের জাতীয় যোগান খতিয়ে দেখা হয়েছে, সেই সঙ্গে নজরে রাখা হচ্ছে উৎপাদন বজায় রাখার ক্ষমতাও, একইসঙ্গে, অনাক্রম্যতায় (ইমিউনিটি) সাহায্যকারী প্রাকৃতিক জিনিসের উৎপাদন এবং যেকোনো ভাইরাসে তাদের কার্যকারিতা বাড়ানোর কাজ চলছে।

বায়ো-কিউবা ফার্মার অপারেশনস ও টেকনোলজির ডিরেক্টর রিতা মারিয়া গার্সিয়া জানাচ্ছেন যে, বর্তমান পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুতি যথেষ্ট আগেভাগেই নেওয়া হয়েছিল, যাতে দেশের সমস্ত স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানগুলিতে প্রয়োজনীয় ওষুধগুলির পর্যাপ্ত যোগান থাকে। যদিও এর পরিধি বিস্তারের কৌশলগুলি বাস্তবায়িত করা হচ্ছে।

প্রাপ্ত ওষুধগুলির মধ্যে আছে, ট্যাবলেট ও সাসপেনশন রূপে অ্যাজিথ্রোমাইসিন, ইঞ্জেক্টেবল ভ্যাঙ্কোমাইসিন, অ্যাটেনোলল, মিথাইল-প্রেডনিসোলোন, ডিয়াজিপাম, মিডাজোলাম, প্যারাসিটামল, আইবুপ্রফেন, ডিপাইরন, সাধারণ অ্যানেস্থেটিক, সেই সঙ্গে ডেক্সট্রোজ, রিঙ্গার এবং অ্যালবুমিনের মতো নিবিড় পরিচর্যায় (ইন্টেনসিভ কেয়ার) প্রয়োজনীয় ওষুধ।

ডিপাইরন সম্পর্কে বায়ো-কিউবা ফার্মার সভাপতি বলছেন যে, দেশে বছরে ৬০ কোটি ট্যাবলেটের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে এবং বর্তমানে এত পরিমাণ উৎপাদন সুনিশ্চিত করার সামর্থ্য না থাকলেও, হাসপাতালের ব্যবহারের জন্য প্রয়োজনীয় উৎপাদন সুনিশ্চিত করা গেছে।

তিনি বলেন যে, আমরা আশা করছি মহামারীর উপর নজরদারি আর নিয়ন্ত্রণের জন্য জনস্বাস্থ্য মন্ত্রকের দ্বারা গৃহীত পদক্ষেপগুলি দেশে আরও সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে কার্যকরী প্রভাব ফেলবে,তবে বায়ো-কিউবা ফার্মা হাজার হাজার আক্রান্তদের চিকিৎসার জন্য এই ২২ টি ওষুধের যোগান দিতে প্রস্তুত।

মার্টিনেজ ডিয়াজ স্বীকার করেছেন যে মোট তৈরি ওষুধের  ১৫% ফার্মাসিগুলি থেকে ইতিমধ্যেই শেষ হয়ে গেছে এবং তার জন্য বণ্টন ব্যবস্থা ব্যপকতর করা হয়েছে। যার ফলে কাঁচামাল সংগ্রহে অসুবিধা এবং উৎপাদনে ব্যবহৃত যন্ত্রাংশের ঘাটতি দেখা গেছে।

তিনি উল্লেখ করেছেন, এই ওষুধগুলোতে মার্কিন অবরোধ গুরুতর প্রভাব ফেলেছে, কারন মার্কিন যোগানদাররা সরকারের আর্থিক নির্যাতনকে সামনে রেখে কিউবাকে যন্ত্রাদি ও বরাত বিক্রি করতে নারাজ। অন্যরা কেউ নতুন চুক্তি করতে রাজি নয়। যারা বাণিজ্যিক যোগাযোগ রেখে চলেছেন, তাঁদেরকেও বাধার সম্মুখীন হতে হচ্ছে।

তিনি উল্লেখ করেছেন যে, বস্তুতঃ আমাদের বিপুল পরিমাণ অর্থসম্পদ আছে, যা ব্যাঙ্কের উপর অবরোধের নিষেধাজ্ঞার দরুন, আমরা দেশে জমাতে পারছি না।

অন্যদিকে, নতুন করোনা ভাইরাসের চিকিৎসায় বায়োমডিউলিনা টি নামক ওষুধটিও ব্যবহৃত হচ্ছে। ন্যাশনাল সেন্টার ফর বায়োপ্রিপারেশনস-এ (বায়োসেন) ইমিউনোলজি-বিশেষজ্ঞ ও চিকিৎসা-সংক্রান্ত গবেষণার প্রধানমেরী কার্মেন রেয়েস-এর মতে এটি কিউবার মূল ওষুধের তালিকায় থাকা একটি নিয়ন্ত্রক, যা বয়স্কদের ক্রমবর্ধমান শ্বাসজনিত সংক্রমণে, রোগ-প্রতিরোধী ক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য ব্যবহৃত হত।

কোভিড-১৯-এর ক্ষেত্রে, তিনি বলেছেন, বৈজ্ঞানিক জার্নালগুলিতে প্রকাশিত তথ্য দেখায় এই ভাইরাস রোগীর অনাক্রম্যতা প্রতিক্রিয়ায় প্রভাব ফেলেএবং টি-কোষ হ্রাস করে। এই ওষুধটি এই কোষগুলির উৎপাদনকে চাঙ্গা করে, এমনটাই ব্যাখ্যা দিয়েছেন।

বয়স্ক রোগীদের দুর্বল অনাক্রম্যতা সহজেই জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে ব’লে সংক্রমিত ও আশঙ্কাজনক উভয় রোগীদের ক্ষেত্রে, এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের ক্ষেত্রেও এটি যথাযথ ব্যবহার্য ওষুধ।

অতিমারী মোকাবিলায় গবেষণা ও বিকাশের উপর জোর দিচ্ছে কিউবার ফার্মাসিউটিক্যাল শিল্পক্ষেত্র, এবং অনুসন্ধান চালাচ্ছে এই ভাইরাসের জন্ম প্রতিরোধ করতে পারে এমন নতুন নতুন প্রোডাক্টের।

সিআইজিবি-র বায়ো-মেডিক্যাল রিসার্চের ডিরেক্টর জেরার্ডো এনরিকে গুইলেন নিয়েতো-র মতে, দুটো প্রতিরোধকারী (ইনহিবিটরি) পেপটাইড নিয়ে গবেষণা চলছে। তার মধ্যে একটি সি.আই.জি.বি ২১০, যা এইডস আক্রান্তদের চিকিৎসার জন্য অ্যান্টি-ভাইরাল হিসেবে বহু বছর ধরে চলা একটি গবেষণার অংশ।

 “গবেষণাপত্রে থাকা তথ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে আমরা বোভাইন কোরোনা ভাইরাসের উপর এই পেপটাইডের প্রভাব নিয়ে গবেষণা চালাচ্ছি, এর প্রতিরোধক (ইনহিবিশন) ক্ষমতা পরিমাপের জন্য। চীনের ল্যাবরটারির সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে যদি এটি কার্যকরী হয়, তাহলে নতুন কোরোনা ভাইরাসের উপর এর প্রভাব আমরা বিশ্লেষণ করতে পারি”।

সি.আই.জি.বি ৩০০ সাংকেতিক নামের আর একটি ওষুধকেও বিবেচনা করাহয়েছে, যা সারভাইকাল ও ফুসফুসের ক্যান্সার-সহ ভিন্ন ধরণের ক্যান্সারের জন্য ব্যবহৃত হয়, এবং এইডস, হেপাটাইটিস সি এবং ও অন্যান্য ভাইরাসসের বিরুদ্ধেও এর অ্যান্টি-ভাইরাল ক্ষমতা পরীক্ষিত।

তিনি শেষ করলেন এই ব’লে যে, সেই সঙ্গে ভাইরাস-সদৃশ কণার ভিত্তিতে একটা প্রতিষেধক প্রকল্প তৈরি হচ্ছে যা শ্বাসযন্ত্রের রোগ-প্রতিরোধী হিসেবে প্রয়োগ করা হবে, যেমনটা ক্রনিক হেপাটাইটিস বি রোগের বিরুদ্ধে সিআইজিবি-তে গড়া প্রতিষেধক প্রয়োগের ক্ষেত্রে করা হত। এই প্রকল্পের তথ্যাবলি চীনের স্বাস্থ্যকর্তাদের দেওয়া হয়েছে যাতে তারা এর বিকাশে অংশগ্রহণ করে।

 ভাষান্তর- শুভাশিস দাস

লেখাটি কিউবার ‘গ্রানমা’ পত্রিকায় ১৭ই মার্চ ২০২০-তে প্রকাশিত।

Similar Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *