Mohon Bagan ATK merger

বিগত কয়েক দশকে বৃহৎ পুঁজির দাপাদাপিতে এবং সরকারী নীতির ফলে ছোট ব্যবসায়ী থেকে খুচরো ব্যবসায়ী সকলেরই নাভিশ্বাস ওঠার জোগাড়। বৃহৎ পুঁজিপতিদের রমরমায় এখন ভারতে সাধারন মানুষের ক্ষমতা ও আবেগ ধীরে ধীরে পিঁপড়ের বেঁচে থাকার ইচ্ছার মতো হয়ে যাচ্ছে। শতবর্ষ প্রাচীন ঐতিহ্যশালী ক্লাব মোহনবাগান ও ইস্টবেঙ্গলকে বহুদিন আগেই স্পনসরের নাম নিজের নামের আগে রাখতে হয়েছিল, এবার মোহনবাগানকে টিকে থাকার জন্য শরনাপন্ন হতে হচ্ছে আরপিজি গ্রুপের কর্ণধার ও এটিকের মালিক সঞ্জীব গোয়েঙ্কার কাছে। মোহনবাগানের সাথে তাদের চুক্তির শর্তকে সহজ বাংলায় ব্যাখ্যা করলে বলতে হয় একপ্রকার মোহনবাগান কার্যত নিজেদের স্বাধীনতাকে বিক্রি করছে কর্পোরেট কোম্পানীর হাতে।

টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটের ‘জনপ্রিয়তা’-এর অজুহাত দেখিয়ে আইপিএলের দ্বারা বিসিসিআই ভারতীয় ক্রিকেটকে কর্পোরেটীদের হাতে তুলে দিয়েছিল বছর দশেক আগেই। উন্নতির নামে ভারতীয় ক্রিকেটকে বিনোদন আর বলিউডের ককটেলে পরিণত করা প্রায় সাঙ্গ। তা দেখাদেখিই আইপিএলের ধাঁচে ভারতীয় ফুটবলের ‘জনপ্রিয়তা’ বাড়াতে রিলায়েন্সের আইএমজি এবং অল ইন্ডিয়া ফুটবল ফেডেরেশনের তত্ত্বাবধানে চালু হয় আইএসএল।  যদিও এর আগে ভারতের জনপ্রিয়তম ফুটবল লিগ বা আই লিগ চালু ছিল ভারতীয় ক্লাবগুলিকে নিয়ে। কিন্তু আইএসএল চালু হবার প্রথম পর্বের পর থেকেই দেখা যেতে থাকে এই লিগ দর্শক টানতে সামগ্রিকভাবে ব্যার্থ। কলকাতার ইস্ট-মোহন ডার্বিতে বা গোয়ানিজ ক্লাবগুলির সঙ্গে খেলায় যে পরিমাণ উদ্দীপনা ভারতীয় ফুটবলপ্রেমীদের থাকে তার সিকি ভাগে পৌঁছোতেও ব্যর্থ ছিল আইএসএল। তাই কয়েকবছর পর থেকেই দুই লিগকে মার্জ করার প্রক্রিয়াতে ছিল ফেডেরেশন, যার নেপথ্যে যথারীতি রিলায়েন্স। কিন্তু দুই লিগ জুড়ে দিলে সমস্যা তৈরি হবে দলের সংখ্যা নিয়ে। তদুপরি মোহনবাগান বা ইস্টবেঙ্গলের সমর্থকসংখ্যা বা আবেগ কোনোটিতেই টেক্কা দেবার ক্ষমতা আইএসএলের দলগুলির নেই তা ক্রমেই স্পষ্ট হতে থাকে ফেডেরেশন ও কর্পোরেটদের। সেখান থেকেই বছরখানেক আগে শুরু হয় আই লিগের ক্লাবগুলির সাথে মার্জ করার বিষয়টি। এই সমগ্র প্রক্রিয়া তেই আছে FSDL অর্থাৎ নেপথ্যে বলাই আম্বানীর কোম্পানি রিলায়েন্স।

সঞ্জীব গোয়েঙ্কা-সহ একাধিক কর্পোরেট মালিকানার ক্লাব যখন বিভিন্ন ফন্দি ও ফিকিরে ফ্রী টিকিট বিলিয়ে, মিষ্টির প্যাকেট বিলিয়েও যখন দর্শক সমর্থন টানতে ব্যর্থ হচ্ছিল। তখনই ISL টুর্নামেন্টের প্রধান আয়োজক রিলায়েন্স FSDL অনুভব করে একমাত্র এটিকে নামে কলকাতার ফুটবলপ্রেমীরা আসবেন না, আর সেজন্যই কলকাতায় ভারতীয় ফুটবল-বিপণনের সেরা বাজারটাও তাদের হাতের বাইরে রয়ে যাচ্ছে। এরসাথে এটিকে ধীরে ধীরে ক্ষতির তালিকার শীর্ষে উঠে থাকে। স্রেফ এটিকে-তে বিনিয়োগকারীদের চাপে আয়োজকরা পরিকল্পনা করে যে, এটিকে-র সাথে ইস্টবেঙ্গল বা মোহনবাগানের মতো দুই সমর্থক পুষ্ট ক্লাবের মধ্যে কোনো একটিকে যদি জুড়ে দেওয়া যায় তাহলেই এটিকে আবার লাভের  মুখ দেখতে পারে।

কলকাতার দুই প্রধানের মধ্যে ইস্টবেঙ্গলের সাথে কোয়েস-এর চুক্তি থাকায় রিলায়েন্স মোহনবাগানকেই লক্ষ্যবস্ত করে ‘মার্জ’ করার জন্য। যদিও কোয়েসের সাথে মাত্র কয়েক বছরেই ইস্টবেঙ্গলের সম্পর্ক অম্লমধুর হয়েছে। কিন্তু মোহনবাগান যে কোনো শিক্ষা নিচ্ছে না তা স্পষ্ট। আর এতে সবথেকে বেশী অবাক মোহন সমর্থকেরা।

রিলায়েন্স কোনো মতেই চায় না বাংলা থেকে দুটোর বেশী দল খেলুক আইএসএলে। আর তার সাথে তাল মিলিয়ে ভারতীয় ফুটবল ফেডারেশন মেরুদন্ডহীনের মতো কর্পোরেটের উঞ্ছবৃত্তিতে নিমগ্ন। আর যার পুরোভাগে আছেন ভারতের সবথেকে ধনী সাংসদ প্রফুল্ল পটেল। যারা ইতিমধ্যেই নিজেদের আয়োজিত লিগকে বাদ দিয়ে আইএসএলকে দেশের সর্বোচ্চ লিগের তকমা দিয়েছে।

কলকাতাকে বলা হয় ভারতীয় ফুটবলের মক্কা। আজ থেকে বছর দশেক আগেও বাংলা থেকে তিন-চারটি ক্লাব খেলত পূর্বতন জাতীয় লিগে। সেখানে এখন বাংলা থেকে দুটির বেশী ক্লাব জাতীয় স্তরে খেলার সুযোগ পাচ্ছে না বলা ভালো বলপূর্বক খেলতে দেওয়া হচ্ছে না। দেশের অন্যতম প্রাচীন ফুটবল লিগ কার্যত ধুঁকছে। লিগের সূচির মাথামুণ্ডু থাকে না। একসময় জাতীয় লিগ খেলা মহামেডান স্পোর্টিং, টালিগঞ্জ অগ্রগামী মৃত্যুর মুখে। আর আরজ্যের সরকারের ক্রীড়া দফতরও এব্যপারে টু-শব্দটিও করছে না। বর্তমানে পরিস্থিতি এমন জায়গায় গেছে যে, মোহনবাগানকে দর কষাকষি করতে হচ্ছে কত শতাংশ শেয়ার তারা নিজেদের রাখতে পারবে এবং শতাংশ শেয়ার তারা নিবেদন করবেন কর্পোরেট কোম্পানীর ঝুলিতে। ইস্টবেঙ্গল ক্লাব যেমন একবছর আগে নিজেদের সত্ত্বাকে বিক্রি করে এখন ঠারেঠারে বুঝতে পারছে, যে কর্পোরেট কোম্পানীগুলির কাছে লাখ লাখ সমর্থকদের আবেগ আসলে প্রফিট রেটের মতই কিছু শেয়ার বাজারী গণিত। ‘ফুটবলের উন্নতি’  তা অনেকটা ‘সোনার পাথরবাটি’।

যে বাংলাকে ফুটবলারদের আঁতুড়ঘর বলা হত সেই বাংলার ঐতিহ্যশালী ক্লাবগুলিই আজ সংকটে। স্থানীয় বা কলকাতা লিগের ক্লাবগুলির কথা ধর্তব্যের মধ্যে আনাটাও ধৃষ্টতার মতো। ফুটবলের মতো একটা খেলাকে নিয়েও চলছে কর্পোরেট এবং সরকারের নোংরা ধান্দা। মুনাফার তাগিদে হত্যা করা হচ্ছে ময়দানের ছোট-বড় প্রাচীন ক্লাবগুলিকে আর সেখানে খেলতে আসা ভবিষ্যতের কৃষাণু- বিকাশদের।

Similar Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *