জোটের আমি, জোটের তুমি, জোট দিয়ে যাবে কী ভোট কেনা! ভারতের নির্বাচনী রাজনীতিতে জোটের অঙ্ক ভোটে রূপান্তরিত করাটাই যেন সবথেকে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে তথাকথিত বিজেপি-বিরোধী শক্তিগুলির কাছে। লোকসভা ভোটের আগে কংগ্রেস-সহ বিজেপি-বিরোধী দলগুলিকে নিয়ে চন্দ্রবাবু নাইডু, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মুখকে সামনে রেখে ‘ফেডেরাল ফ্রন্ট’-কে বাজারে ভাসানো হয়। কিন্তু একের পর এক জোটসঙ্গীর আলটপকা আচরণ এবং কংগ্রেসের দাগাবাজিতে বিজেপি-বিরোধী ফ্রন্ট ভোটের আগেই কার্যত মুখ থুবড়ে পড়ে। দেশের প্রধান বিরোধী শক্তি কংগ্রেসের ভরাডুবির সঙ্গে-সঙ্গেই ‘ফেডেরাল ফ্রন্টের’ প্রধান দুই মুখ চন্দ্রবাবু নাইডু এবং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজেদের রাজ্যেই পর্যুদস্ত হন। অন্ধ্রে ক্ষমতাচ্যুত হয় চন্দ্রবাবুর তেলুগু দেশম; অন্যদিকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৃণমূল কংগ্রেসও জোর ধাক্কা খায় বিজেপির কাছে। লোকসভা ভোটপর্ব মিটেছে প্রায় দু’মাস হতে চলল, তার মধ্যেই কর্নাটকে জেডি(এস)-কংগ্রেসের জোট সরকারের পতন ঘটেছে বিজেপির প্রত্যক্ষ মদতে। এবার আসন্ন মহারাষ্ট্রের বিধানসভা ভোটকে সামনে রেখে রাজ্য-রাজনীতিতে আবার জোটের নতুন তর্জা উঠে আসতে শুরু করেছে।

জোটের জটিল অঙ্ক কষে পশ্চিম মহারাষ্ট্রের কৃষক নেতা তথা স্বভিমানী পক্ষের প্রধান রাজু শেট্টি মন্তব্য করেছেন, বিজেপি বিরোধী মহাজোটে কংগ্রেস-এনসিপির পাশাপাশি সম-মনষ্ক প্রকাশ আম্বেদকরের বঞ্চিত বহুজন আহাদি এবং রাজ ঠাকরের নবনির্মাণ সেনাকেও অংশীদার করা হোক। পরিস্থিতি সেদিকে না গেলে রাজু শেট্টি বিধানসভায় একাই ৫০ টি আসনে ভোট লড়বেন বলে জানিয়েছেন। রাজু শেট্টির এমন মন্তব্যে শোরগোল পরে গেছে মরাঠি রাজনীতিতে। এমনিতেই লোকসভা ভোটের আগে থেকেই কৃষকদের লঙ-মার্চ, খরা, আখচাষীদের দাম না পাওয়া এবং চিনি মিলগুলির দুরবস্থা নিয়ে যথেষ্ট সরগরম গ্রামীন মহারাষ্ট্র-এর রাজনীতি, সেখানে দাঁড়িয়ে প্রাক্তন সাংসদ এবং কৃষক নেতা রাজু শেট্টির এই মন্তব্যে আরো জলঘোলা হতে চলেছে প্রাক-বিধানসভা নির্বাচন পর্বে।

মহারাষ্ট্রের রাজ্য রাজনীতিতে জোট বরাবরই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়ে এসেছে। কংগ্রেস-এনসিপি ও শিবসেনা-বিজেপি জোটের মধ্যে টালমাটাল পরিস্থিতি প্রায়শই দেখা যায়। শিবসেনার মুখপত্র ‘সামনা’-তে বিজেপি সরকারের একের পর এক নীতির বিরোধিতা করে লেখা বের হয়েছিল লোকসভা নির্বাচনের আগে। কিন্তু তারপরেও বিজেপি-শিবসেনা জোট লোকসভায় কার্যত শুইয়ে দেয় বিরোধী কংগ্রেস-এনসিপি জোটকে। বিগত বিধানসভায় মহারাষ্ট্রে চতুর্মুখী লড়াই হয় এবং শেষ অবধি বিজেপি দেবেন্দ্র ফড়নবীশের মুখ্যমন্ত্রীত্বে সরকার গঠন করে। কিন্তু এবারের লোকসভায় বিজেপি-শিবসেনা জোট রাজ্যে ৪৮ টির মধ্যে ৪১ টি আসন দখল করে, অন্যদিকে কংগ্রেস-এনসিপি জোটের ঝুলিতে মাত্র পাঁচটি আসন আসে। যে রাজু শেট্টির জোটভাবনা নিয়ে গুঞ্জন, তিনি এবারের ভোটে কোলাপুরের হাটকাঙলে লোকসভা থেকে শিবসেনার ধৈর্যশীল মানের কাছে ৫০ হাজারের বেশী ভোটে পরাস্ত হন। কংগ্রেস-এনসিপি জোটের মধ্যে থেকে রাজু শেট্টির স্বভিমানী পক্ষ এবারের ভোটে লড়লেও খালি হাতেই ফিরতে হয়েছে তাকে। কিন্তু এর আগে ২০০৯ এবং ২০১৪-এর লোকসভা নির্বাচনে তিনি বিজেপির সমর্থনে জিতে লোকসভায় যান। ২০১৪-তে প্রায় ১.৭৭ লক্ষ ভোটে জেতেন রাজু। কিন্তু তারপরে ২০১৭-তে স্বভিমানী পক্ষ এনডিএ থেকে বেরিয়ে আসে।

অন্যদিকে, প্রকাশ আম্বেদকর যে বঞ্চিত বহুজন আহাদি এবং রাজ ঠাকরের নবনির্মাণ সেনাকে জোটে শামিল করার কথা বলেছেন তাদেরও ইতিহাস যথেষ্ট সুবিদিত। রাজ ঠাকরের মতো উগ্র-হিন্দুত্ববাদী মুখকে কিভাবে জোটে নেওয়া যেতে পারে এই প্রশ্নের উত্তরে রাজের পক্ষে দাঁড়িয়ে রাজু বলেন, লোকসভা নির্বাচনের একাধিক সভায় রাজ বিজেপিকে আক্রমন করেছেন, তাই রাজ বিজেপি-বিরোধী এটা প্রমাণিত। অপরদিকে বি.আর. অম্বেদকরের নাতি এবং বঞ্চিত বহুজন আহদির নেতা প্রকাশ অম্বেদকরের সাথে কংগ্রেসের জোটের কথা লোকসভা ভোটের বহুদিন আগে থেকেই চলছিল, প্রকাশ কংগ্রেসের রাজ্য নেতাদের সাথে কথা বলতেই রাজি ছিলেন না; তিনি চেয়েছিলেন সরাসরি কেন্দ্রীয় নেতাদের সাথে কথা বলতে। রাহুল গান্ধী তাকে সময় না দেওয়ায় জোট আলোচনা শেষ পর্যন্ত ভেস্তে যায়। এরপর প্রকাশ আসাদুদ্দিন ওয়েইসির অল ইন্ডিয়া মজলিশ-ই-ইত্তিহাদ-অল-মুসলিমিনের সাথে জোট করেন, ঔরঙ্গাবাদ আসন থেকে ওয়েইসির দলের প্রার্থী ইমতিয়াজ জলিল সৈয়দ জেতেন। অন্যদিকে বঞ্চিত বহুজন আহাদিও প্রায় ১৪% ভোট পায়। ভোট কাটাকাটির অঙ্কে প্রায় ৮ টা আসনে পরাস্ত হতে হয় কংগ্রেস-এনসিপি জোটকে। এমতাবস্থায় বিধানসভা নির্বাচনে দলিত মুখ প্রকাশ যে গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর হতে চলেছেন তা বুঝছে কংগ্রেস-এনসিপি সহ সকলেই।

কংগ্রেস-এনসিপি জোটে নবনির্মাণ সেনা ও বঞ্চিত বহুজন আহাদি কী সামিল হবে , বা এই জোট কতটা বিজেপিকে বেগ দিতে পারবে তা নিয়েই মহারাষ্ট্রের রাজনীতি সন্দিহান। রাজু শেট্টির এই মন্তব্যের পর কংগ্রেস কি নবনির্মান সেনাকে জোটে সামিল করবে? এই প্রশ্নের সদুত্তর পাওয়া যায় নি। যতই বিজেপি বিরোধিতা করুন না কেন, উগ্র হিন্দুত্ববাদী মুখ রাজকে জোটে সামিল করলে লাভের থেকে লোকসান বেশী হয় কিনা সে নিয়ে কংগ্রেসের মধ্যেই গুঞ্জন আছে। এনসিপি নেতা অজিত পওয়ার এই নিয়ে মন্তব্য  করেননি এখনো। উপরন্তু দলিত নেতা প্রকাশ রাজ ঠাকরের মত নেতাকে নিলে জোটে আসবেন কিনা এ নিয়েও রয়েছে সংশয়।  অনাবৃষ্টি, খরা এবং আখচাষীদের দূরাবস্থা নিয়ে গোটা গ্রামীন-মহারাষ্ট্রের কৃষক মহলে আবারো অসন্তোষের মেঘ জমেছে। গত বছর মহারাষ্ট্রের সারা ভারত কিষাণ সভার ডাকে কিষাণ লঙ-মার্চ গোটা দেশে কৃষক আন্দোলনে মাইলফলক তৈরি করলেও তা ইভিএমে ছাপ ফেলতে পারেনি। ঋণ মুকুব এবং স্বামীনাথন কমিশনের সুপারিশ লাঘু করার মত যথাক্রমে বড় চাষি এবং কর্পোরেটদের অ্যাজেন্ডাকেই প্রতিষ্ঠা দিতে গিয়ে এই ভরাডুবি। ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্ক্সবাদী) এবার পালঘর আসনে বঞ্চিত বহুজন আহাদি-র প্রার্থীকে সমর্থন করবে বলে জানিয়েছে। পূর্বতন এনসিপি আসন দিন্দোরি থেকেও সিপিআই(এম) প্রার্থী দেবে বলে জানিয়েছে। কিন্তু বাম বিধায়ক জিভা পাণ্ডু গাভিত-এর পাঁচ বারের জেতা আসন সুরগুনা বা বর্তমান আসন কালওয়ান নিয়ে তাঁরা এখনও কিছুই জানাতে পারেননি।

কংগ্রেস-এনসিপি-কে রাজু শেট্টি রাজ ঠাকরে আর দলিতদের সঙ্গে হাত মেলানোর কথা বলছে। আর সিপিআই(এম) সেই দলিত পার্টিকেই সমর্থন করছে যারা এতিমধ্যেই আসাদুদ্দিনের সাথে মঞ্চ ভাগাভাগি করে এসেছে! এখন প্রশ্ন হল, দিন্দোরি আসনে কি এনসিপি প্রার্থী দাঁড় করাবে? আগেরবার বামপন্থীরা ২০টা আসনে লড়েছিল। এবারে কালওয়ান নিয়েই তাঁদের অবস্থান নিশ্চিত নয়। অর্থাৎ আবারও কি সেই বিজেপি বিরোধী মহা-“ঘোঁট”-এর সুইসাইডাল ফর্মুলা? জোটের নামে ঘোলাজলের রাজনীতিতে আবারও কি ফসল ঘরে তুলবে বিজেপি-শিবসেনা জোট?

Similar Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *