কাশ্মীরের ওপর থেকে সংবিধানের ৩৭০ ও ৩৫-এ ধারা বাতিল সহ কেন্দ্রীয় সরকারের একাধিক জনবিরোধী নীতি প্রণয়নের বিরুদ্ধে গত ৩রা সেপ্টেম্বর একাধিক বামপন্থী দলের ডাকে মৌলালি যুব কেন্দ্রে এক গণকনভেনশন আহ্বান করা হয়। কনভেনশনে কেন্দ্রের বিজেপি সরকারের সাম্প্রতিক বিভিন্ন পদক্ষেপ যেমন ইউ.এ.পি.এ. আইনের সংশোধন, এন.আই.এ.-র ক্ষমতাবৃদ্ধি, আর.টি.আই সংশোধনী ইত্যাদির পাশাপাশি কেন্দ্রীয় সরকারের অর্থনৈতিক পদক্ষেপগুলির তীব্র বিরোধিতা করে এই বামপন্থী দলগুলি। গত ৫ই অগাস্ট কাশ্মীরের ওপর থেকে  ৩৭০ ও ৩৫-এ ধারা বাতিল হবার পর প্রেস ক্লাবে সাংবাদিক সম্মেলন করে গণ অবস্থানের ডাক দেয় পিপ্‌ল্‌’স্ ব্রিগেড, সিপিআই(এম-এল)রেড স্টার, এবং সিপিআই(এম-এল)। এরপর গত ১৯শে অগাস্ট মৌলালি মোড়ে গণ অবস্থান করে এই তিন রাজনৈতিক দল। সেই অবস্থান থেকেই আরো বামদলগুলির সমন্বয়ে তারা গণ কনভেনশনের ডাক দেয়। ৩রা সেপ্টেম্বর বেলা ৩টে থেকে মৌলালি যুব কেন্দ্রে পিপ্‌ল্‌’স্ ব্রিগেড, সিপিআই(এম-এল)রেড স্টার, সিপিআই(এম-এল), সিপিআই(এম-এল) প্রেপারেটরি সেন্ট্রাল কমিটি, শ্রমিক কৃষক সংগ্রামী মঞ্চ এবং নভেম্বর বিপ্লব শতবার্ষিকী কমিটি আহুত গণ-কনভেনশন হয়। সিপিআই(এম-এল) নিউ ডেমোক্রেসি এবং মজদুর ক্রান্তি পরিষদও এই গণকনভেনশনে সামিল হয়।

পিপ্‌ল্‌’স্‌ ব্রিগেডের সদস্য শুভাশিস দাস গণ কনভেনশনের প্রস্তাবনা পাঠ করেন। কনভেনশনে অংশগ্রহনকারী সংগ্রামী শক্তিগুলি একত্রিত হয়ে বলেন যে, কেন্দ্রের বিজেপি সরকার কাশ্মীরের ওপর বন্দুকের নল তাক করে তার উপর এই ভয়ংকর সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিয়েছে। এই ঘেরাটোপ থেকে অবিলম্বে মুক্তি দিয়ে কাশ্মীরের জনগণকে তাঁদের নিজেদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের অধিকারকে ফিরিয়ে দিতে হবে। কাশ্মীরের উপর থেকে ৩৭০ ধারা বাতিল করে কাশ্মীরি জণগণের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের কফিনে শেষ পেরেকটি পুঁতে দেওয়া হয়েছে বলে দাবি করেন পিসিসি সিপিআই(এম-এল)-এর শৈলেন ভট্টাচার্য। অন্যদিকে কাশ্মীর ইস্যুতে বিজেপি নেতারা যেভাবে শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের ‘এক দেশ, এক নিশান, এক প্রধান’-এর শ্লোগানকে সামনে রেখে ৩৭০ ধারা বাতিল করলেন তার ইতিহাস বলতে গিয়ে সিপিআই(এম-এল)-এর আলোক মুখার্জী বলেন, “নেহরু ক্যাবিনেটে যে শ্যামাপ্রসাদ ৩৭০ ধারা প্রণয়ণের পক্ষে ছিলেন আরএসএস-কে সঙ্গে নিয়ে জনসংঘ তৈরির পর তিনি তার দায় অস্বীকার করলেন, এর কারণ হলো তিনি কাশ্মীরের হিন্দু জায়গিরদার-দের স্বার্থরক্ষা করতে চেয়েছিলেন।” কনভেনশনে অংশগ্রহণকারী বামদলগুলি দ্ব্যর্থহীন ভাষায় উল্লেখ করে, ঐতিহাসিকভাবে বৈচিত্রে ভরা ভারতের সকল প্রদেশের সার্বভৌমত্ব এবং প্রতিটি নিপীড়িত জাতির মানুষের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারই এদেশের জাতীয় ঐক্য রক্ষা করার প্রধান শর্ত। ৩৭০ ও ৩৫-এ ধারা বাতিলের মাধ্যমে কেন্দ্রের বিজেপি সরকার সেই অধিকারের মূলেই কুঠারাঘাত করেছে বলে দাবি করে তারা। সিপিআই(এম-এল) রেডস্টারের প্রদীপ সিংহ ঠাকুর বলেন, “বিজেপি আসলে হলো আরএসএস-এর এককেন্দ্রিক মতাদর্শের বাহক; সেই আরএসএস যে তার জন্মলগ্ন থেকেই ভারতের বিভিন্নতাকে অস্বীকার করে একটা দমনমূলক এককেন্দ্রিক স্বৈরতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থাকে কায়েম করতে চেয়েছে ভারতের বুকে।” তিনি আরো বলেন যে, “ভারতের স্বাধীনতার সময় কাশ্মীরের তো ভারতে আসার কথাই ছিল না। কারণ কাশ্মীরের সিংহভাগ ছিলেন মুসলমান। মুসলমান ধর্মভিত্তিক গঠিত রাষ্ট্র পাকিস্তানে যাওয়াই তো তাঁদের কাছে স্বাভাবিক ছিল কিন্তু কাশ্মীরের মানুষ ভারত সরকারকে বিশ্বাস করেছিলেন যে তারা তাদের প্রতিশ্রুতি রাখবে কিন্তু ধারাবাহিকভাবে কেন্দ্রের প্রতিটি সরকার তাঁদের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। আর এখন কেন্দ্রের বিজেপি সরকার তাঁদের যেটুকু অধিকার ছিল তাও কেড়ে নিল। কাশ্মিরকে লক্ষ্যবস্তু করার মাধ্যমে আসলে বিজেপির মূল লক্ষ্য হলো ভারতের মুসলমানদের উপর আক্রমণকে নিবদ্ধ করা।” কাশ্মীর পরিস্থিতির পাশাপাশি ‘এনআরসি’-চালু করে যেভাবে অসমে ১৯ লক্ষ মানুষকে ‘অনুপ্রবেশকারী’ বলে দাগিয়ে দেওয়ার চক্রান্ত করা হচ্ছে তার বিরুদ্ধেও সরব হন বক্তারা। চক্রান্ত করে অসমে বসবাসকারী বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মানুষকে এর মাধ্যমে জাতিদাঙ্গায় প্ররোচনা দেবার ছক কষছে বিজেপি সরকার, এই দাবিও করেন অনেকে। পিপ্‌ল্‌’স্ ব্রিগেডের কনভেনর বাসুদেব নাগচৌধুরী কাশ্মীর সমস্যার আড়ালে ভারতের ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক সংকটের কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, “লোকসভা নির্বাচনপর্ব থেকে এই সময় অবধি অনেকগুলি স্ববিরোধী ইস্যুকে নিয়ে পরপর সিদ্ধান্ত নিচ্ছে মোদি সরকার। এগুলি কি কেবল তুঘলকি সরকারের  দ্বারা নেওয়া কয়েকটি সিদ্ধান্ত?” বিষয়টি সেরকম নয় বলে তিনি দাবি করে বলেন, “৫ই অগাস্ট কাশ্মীরের উপর থেকে ৩৭০ ও ৩৫-এ ধারা কার্যত বাতিল করা হলো সেই দিন যেদিন ভারতের টাকার দাম বিগত ছ’ বছরে সবথেকে বৃহত্তম পতন ঘটেছে।” কিন্তু কাশ্মীরের আবহে এই খবর কার্যত ধামাচাপা দেওয়া হয়। গোটা বিশ্বের তথ্যকে করায়ত্ত্ব করতে সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলির নতুন হাতিয়ার ‘কোয়ান্টাম ইনফর্মেশন’ প্রসঙ্গে বাসুদেব নাগচৌধুরী বলেন,  “শেয়ার বাজারে ফাটকাবাজিকে মদত জোগাতে মোদি সরকার এই সংক্রান্ত গবেষণার বাজেটে সাত’শ কোটি টাকা অনুদান ঘোষণা করেছে এবং দাবি করেছে যে আগামী তিন বছরে এই গবেষণায় ভারতের প্রথম সারির সমস্ত প্রতিষ্ঠানগুলি এই বিষয়ে পারদর্শী হয়ে উঠবে। এহেন দাবি হাস্যকর, কারণ পশ্চিমী দেশগুলির অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানই এই গবেষণার উর্ধ্বসীমা ধরেছে ২০৩০। আসলে এর মাধমে সরাসরি দেশের গুরুত্বপূর্ণ তথ্যাদি সরাসরি কর্পোরেটদের হাতে তুলে দেওয়ার চক্রান্ত করছে বিজেপি সরকার।” ইউএপিএ আইন সংশোধন, এনআইএ-কে শক্তিশালী করা, ব্যাঙ্ক সংযুক্তিকরণ থেকে রাষ্ট্রায়ত্ত্ব সংস্থাগুলিকে বেসরকারীকরণ ইত্যাদি প্রত্যেকটি বিষয় যে সরকারের অর্থনৈতিক সংকটের জন্য তৈরি হওয়া একটি বাধ্যতামূলক পরিস্থিতি তা তিনি উল্লেখ করেন। মোদীর জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের নিদানকে কটাক্ষ করে তিনি বলেন, “যে দেশে মানুষকে জনসম্পদ বলা হয়, সেই দেশেই মানুষকে অতিরিক্ত জনসংখ্যা বলা হচ্ছে। আসলে, ক্রয় ক্ষমতার সাপেক্ষে এই উদ্বৃত্ত জনসংখ্যা বলা হচ্ছে। যাদেরকে পণ্য বেচে মুনাফার পাহাড় বাড়ানো যাবে এবং অর্থনৈতিক সংকট থেকে বেরিয়ে আসতে পারবে তার বাইরের জনগণকেই উদ্বৃত্ত জনসংখ্যা বলা হচ্ছে।” কাশ্মীর প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “৩৫-এ ধারা বাতিল করার পেছনে অন্যতম উদ্দেশ্য হলো, সেখানের মাটির নীচে থাকা লিগনাইট খনিগুলি যা নিয়ে ভারত সরকারের সঙ্গে আমেরিকার কর্পোরেটদের ইতিমধ্যেই কথা হয়েছে।” চেতনা লহর পত্রিকার পক্ষ থেকে বক্তব্য রাখেন অনন্ত আচার্য। সংগ্রামী শ্রমিক কৃষক মঞ্চের পক্ষে বক্তব্য রাখেন সুখেন্দু সরকার।

পিপ্‌ল্‌’স্‌ ব্রিগেড কালচারাল ইউনিটের আবৃত্তি পাঠঃ ‘গুলদাস্তা’

এই কনভেনশনে রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে জনসমাগম হয়। বামপন্থী রাজনৈতিক দলগুলির পাশাপাশি সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ ছিল চোখে পড়ার মত। কনভেনশনে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানেরও আয়োজন করা হয়। গণসঙ্গীত শিল্পী অসীম গিরি ও লিডা চক্রবর্তী প্রতিবাদের গান গান। পাশাপাশি আবৃত্তি করেন সুদীপ্তা বন্দ্যোপাধ্যায় ও পিপল’স ব্রিগেড কালচারাল ইউনিটের সদস্যরা। ৮ বামদলের এই কনভেনশনে কাশ্মীরের বিরুদ্ধে করা ষড়যন্ত্র এবং কেন্দ্রের সরকারের বিরুদ্ধে জনজোট গঠনের ডাক দেন উদ্যোক্তারা। কাশ্মীর ইস্যুর পাশাপাশি দেশে কর্মহীন বিকাশ এবং রেকর্ড পরিমাণ বেকারত্বের বিরুদ্ধে গণ আন্দোলনের ডাক দেওয়া হয় বামদলগুলির পক্ষ থেকে।

Similar Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *