প্রথম বিশ্ব যুদ্ধ শেষ হলে পরাজিত অটোম্যান সাম্রাজ্যেকে টুকরো টুকরো করে বিভিন্ন ছোট ছোট দেশ (যেমন তুরস্ক, সিরিয়া, জর্ডান, প্যালেস্তাইন) গঠন করা হয় যারা মূলত ব্রিটেন ও ফ্রেঞ্চ ম্যান্ডেটে পরিণত হয়। হিব্রু বাইবেলে ফ্যারোর দাসত্ব থেকে মুক্ত হয়ে মোজেজ-এর নেতৃত্বে ইহুদি সম্প্রদায়ের সিনাই উপত্যকায় (বর্তমান ইজরায়েল ও প্যালেস্তাইনের বিতর্কিত অংশ) যাত্রার কাহিনী ‘এক্সোডাস’ হিসেবে অবিহিত হয়েছে। ৫৮৬ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে ব্যাবিলনের আক্রমণ এবং খ্রিস্টপরবর্তী দ্বিতীয় দশকে রোমান সাম্রাজ্যে ইহুদি বিদ্বেষের সূচনা সমগ্র ইহুদি সম্প্রদায়কে সিনাই পরিত্যাগ করে ইউরোপে যাত্রা করতে বাধ্য করে।ঊনবিংশ শতকের শুরু থেকেই সারা ইউরোপ জুড়ে ইহুদি বিদ্বেষের ব্যাপ্তি ঘটে। তাদের আর্থিক সচ্ছলতা ও ঐক্যবদ্ধভাবে প্রতিবাদ করার প্রবণতাই এই বিদ্বেষের প্রধান কারণ।এই পরিস্থিতিতে জন্ম নেয় ইহুদিদের সিনাই অঞ্চলে ফেরার আকাঙ্ক্ষা, যার ধর্মীয় সংস্করণ হল ‘জিয়নবাদ’। ১৮৯৬ সালে থিওডর হার্টজি তাঁর ‘দের জুডেন্সট্যাট’ গ্রন্থে জিয়নবাদের রাজনৈতিক ভিত্তিপ্রস্তর প্রতিষ্ঠা করেন। জার শাসিত রাশিয়া, নাৎসি জার্মানিও ফ্রান্সের উগ্র ইহুদি বিদ্বেষ জিয়নবাদের ভিত আরও শক্ত করে তোলে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে অটোম্যান সাম্রাজ্যের পতন হলে ব্রিটিশদের ‘বালফোর ঘোষণা’ অনুযায়ী ১৯১৭ সাল থেকেই বিপুল সংখ্যক ইহুদিরা সিনাই অঞ্চলে ফিরে আসতে থাকে। কিন্তু ইতিহাসের এই দীর্ঘ সময়ের পরিসরে সেই অঞ্চল ততদিনে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ প্যালেস্তাইনের অন্তর্ভুক্ত হয়ে পড়েছে। ফলে প্রত্যেকটি আরব দেশ এর বিরোধিতা করতে থাকে।১৯৪৮ সালে রাষ্ট্রপুঞ্জের তদারকিতে ও মার্কিন সামরিক শক্তির বদান্যতায় প্যালেস্তাইনের পশ্চিম অংশকে ‘ইজরায়েল’ রাষ্ট্র হিসেবে ঘোষণা করা হয়।জেরুজালেমের নিকট ‘জিয়ন’ পর্বতের উপর ইহুদিদের ধর্মীয় ভাবাবেগকে কেন্দ্র করে নবগঠিত ইজরায়েল রাষ্ট্রের প্যালেস্তাইনের প্রতি আগ্রাসী মনোভাবের সূচনা হয়।সমগ্র আরব দুনিয়ার অবিসংবাদী জাতীয়তাবাদী নেতা মিশরের নাসের ইজরায়েলকে একাধিকবার আক্রমণ করেন এবং ১৯৫৬ সালে ‘সুয়েজখাল’ জাতীয়করণের মধ্যে দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের প্রধান বাণিজ্য সড়ক মিশরের অধিকারে নিয়ে আসেন। ১৯৬৭ সালে জর্ডান জলবন্টনকে কেন্দ্র করে নতুন করে অশান্তির সূত্রপাত হয়।মিশর লোহিত সাগরের সৈকতের উপর ইজরায়েলের অধিকার খর্ব করলে ইজরায়েল মিশর আক্রমণ করে। জর্ডান, সিরিয়া, মিশর ও ইরাক ইজরায়েলকে পাল্টা আক্রমণ করে বসে। মার্কিন সামরিক সাহায্যে বলিয়ান হয়ে ইজরায়েল এই যুদ্ধে জয়ী হয়। আরব দেশগুলির ঐক্যবদ্ধ আক্রমণ দেশটিকে ধ্বংস করতে পারেনি। আরব দুনিয়ার ঐক্য খর্ব করে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন স্যাটেলাইট রাষ্ট্র গঠনের পরিকল্পনা সফল হয়। ‘লেবার জিয়নবাদ’ ও ইজরায়েলী সংসদ ‘ন্যাসেট’-এ আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বের সুবাদে বামপন্থীরা শুরুতে বেশ শক্তিশালী হয়ে উঠলেও যুদ্ধপরিস্থিতি উগ্র জাতীয়তাবাদের সূচনা করে। ‘লিকুদ’ পার্টির নরমপন্থী নেতা মেনাকেম বেজিনের প্রধানমন্ত্রীত্বকালে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হলেও বর্তমান চরমপন্থী প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানয়াহু প্যালেস্তাইনের প্রতি আগ্রাসী মনোভাব দেখিয়ে চলেছেন। গাজার ফলের বাজার দখল করাই তার লক্ষ্য। 

ক্ষয়িষ্ণু প্যালেস্তাইনের অস্তিত্ব

১৯৬৭ সালের রাষ্ট্রপুঞ্জের সীমান্ত বিভক্তিকরণ পরিকল্পনা অনুযায়ী প্যালেস্তাইনের নির্ধারিত সীমানাকে কেন্দ্র করে মিশর, জর্ডান ও ইজরায়েলের যুদ্ধের পরবর্তীতে ইজরায়েলের আক্রমণের প্রতিরোধ করতে আরাফতের নেতৃত্বে ‘প্যালেস্তাইন লিবারেশান অরগানাইজেশান’ সংগ্রাম চালাতে থাকে। সাময়িক স্বায়ত্ত্বশাসন লাভ করলেও দুর্নীতিকে দর্শে তাদের অধিকার খর্ব করতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরব ‘হামাস’ সংগঠনের সৃষ্টি করে। আরাফতের দলের শাসনের অবশান হলে হামাসের ইজরায়েল বিরোধী উগ্রপন্থী কার্যকলাপ শুরু হয়। ব্যুমেরাং হয়ে যায় হামাস গঠনের পরিকল্পনা। বর্তমানে হামাস গাজা অঞ্চলে ইজরায়েলের বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রামে লিপ্ত। ‘প্যালেস্তাইন লিবারেশান অরগানাইজেশান’-এর একদা সর্ববৃহৎ অংশীদার ‘ফাতেহ’ গোষ্ঠী ওয়েস্ট ব্যাঙ্কে পৌরসভা ভিত্তিক সরকার চালাচ্ছে কারণ ইজরায়েল সেখানে সামরিক সাহায্যে ইহুদি বসতি বিস্তারে উদ্যত। 

১৯৬৭-এর রাষ্ট্রপুঞ্জের প্যালেস্তাইনের সীমান্ত পরিকল্পনা (কমলা অঞ্চল)

২৮শে জানুয়ারী, ২০২০-তে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইজরায়েলী প্রধানমন্ত্রী নেতায়াহুর সঙ্গে বৈঠক শেষে একটি ‘পিস প্ল্যান’ বা শান্তি পরিকল্পনা প্রস্তাব করেন। এই পরিকল্পনা শান্তির বদলে প্যালেস্তাইনের মানুষদের নিজেদের সার্বভৌমত্ব ইজরায়েলের সাথে রফা করার প্রস্তাব দিচ্ছে। ১৯৬৭-এর প্রস্তাবে উল্লিখিত ম্যাপের থেকেও ছোট, সীমানাগতভাবে দুর্বল এবং পূর্বতন দ্বিখন্ডিত অবস্থা থেকে একটি বহু খন্ডিত, খন্ডগুলির মধ্যে সরাসরি সংযুক্তির অভাব ও ব্রিজ নির্ভর সংস্থাপন ভিত্তিক একটি ইঁদুরে খাওয়া প্যালেস্তাইন রাষ্ট্রের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে এই পরিকল্পনায়। এই “শান্তি (!)” প্রস্তাব অনুযায়ী ইজরায়েল ১৯৬৭ থেকে আজ অবধি প্রস্তাবিত প্যালেস্তাইন রাষ্ট্রের যতটা যুদ্ধ মারফৎ অধিকার করে রেখেছে তার অধিকাংশই দখলে রাখতে পারবে। বর্তমানে ১৩৮টি দেশ প্যালেস্তাইনকে দেশ হিসেবে মানলেও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইজরায়েল তার অস্তিত্ব অস্বীকার করে। ফলে, এই শান্তি প্রস্তাবে প্যালেস্তাইনের মানুষের কাছে কিছু শর্তারোপ করা হয়েছে যা মানলে তাদের জন্য একটি ইঁদুরে খাওয়া রাষ্ট্রের স্বীকৃতি দেওয়া হলেও হতে পারে। “হলেও হতে পারে” বলা হল কারণ এই প্রস্তাবে প্যালেস্তাইনের সার্বভৌমত্ব সম্পর্কে খোলসা করে কিছুই বলা হয়নি। নেতানয়াহু প্যালেস্তাইনের পূর্ণ নিরস্ত্রীকরণ এবং তার সীমানায় কড়াভাবে ইজরায়েলী সেনার উপস্থিতির পক্ষে সওয়াল করেছেন। উক্ত শর্তগুলির মধ্যে রয়েছেঃ (১) প্যালেস্তাইনের সামরিক নিরস্ত্রীকরণ (২) জিহাদীদের অর্থ সাহায্য রদ (৩) ইজরায়েলকে ইহুদী রাষ্ট্র হিসেবে মেনে নেওয়া (৪) মার্কিন ও ইজরায়েলী নাগরিকদের উপর সকল প্রকার আইনী কার্যাবলী বন্ধ করা এবং (৫) ইজরায়েলের সম্মতি ব্যতীত কোনও আন্তর্জাতিক সংস্থার সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন না করা। এই শর্তগুলির পাশাপাশি যদি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইজরায়েল মনে করে যে প্যালেস্তাইন সংবিধান তৈরি করে পশ্চিমী গণতন্ত্রের ধাঁচে নিজেদের অঞ্চলগুলির উপর আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সাজুয্যপূর্ণ অর্থনৈতিক কার্যকলাপ চালাতে পাড়ছে, তবে তারা প্যালেস্তাইন রাষ্ট্রের স্বীকৃতি দেবে। এই রাষ্ট্রের সীমানা হবে এই রূপঃ (১) গাজার বেশ কিছু অঞ্চল ইজরায়েলী দখলে থাকবে যার ফলে বাকি অংশগুলির মধ্যে সরাসরি সংযোগ থাকবে না (২) গাজার সঙ্গে ওয়েস্ট ব্যাঙ্কের ভূগর্ভস্থ টানেল মারফৎ সংযোগ থাকবে (৩) ওয়েস্ট ব্যাঙ্কেরও একটা বড় অংশ ইজরায়েলের দখলে থাকবে এবং বাকি অংশ প্যালেস্তাইন পেলেও সেখানে ইজরায়েলী বসতি অঞ্চলগুলি ইজরায়েলী সার্বভৌমত্ব বজায় রাখবে এবং ব্রিজ মারফৎ ইহুদি রাষ্ট্রের সঙ্গে তাদের সংযোগ থাকবে (৪) জর্ডান নদীর অববাহিকা ইজরায়েলী দখলেই থাকবে যদিও প্যালেস্তাইন সেই জল ব্যবহার করার অধিকার পাবে (৫) পূর্ব জেরুজালেম ইজরায়েলের অধীনস্থ হবে এবং ওই শহরে পাশে প্যালেস্তাইনের রাজধানী তৈরি হবে (৬) প্যালেস্তিনীয় উদ্বাস্তুরা ইজরায়েলের অনুমতি ব্যতীত নিজের মাতৃভূমিতে ফেরার অধিকার হারাবে। তাছাড়া, প্যালেস্তাইন রাষ্ট্রের অর্থনীতি একটি বহুজাতিক ব্যাঙ্কের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হবে। বোঝায় যাচ্ছে, প্যালেস্তাইনকে এক প্রকার ইজরায়েলের উপনিবেশে পরিণত করতে চাইছে ট্রাম্প ও নেতানয়াহু।       

ট্রাম্পের “শান্তি” পরিকল্পনায় প্যালেস্তাইনের পরিণতি (নীল অংশ)

৩০শে জানুয়ারী কিউবার বিদেশ মন্ত্রী ব্রুনো রড্রিগুয়েজ ট্রাম্পের এই শান্তি পরিকল্পনাকে ‘সাম্রাজ্যবাদী স্বার্থের প্রতীক” রূপে চিহ্নিত করেছেন। তিনি প্যালেস্তাইনের পূর্ণ সার্বভৌমত্ব, রাজধানী হিসেবে পূর্ব জেরুজালেম এবং উদ্বাস্তুদের দেশে ফেরার অধিকারের পক্ষে কিউবার অবস্থানের কথা জানিয়েছেন। 

১২ই ফেব্রুয়ারী স্ট্রাসবার্গে ইউরোপীয় পার্লামেন্টের প্লেনারি ভাষণে বক্তব্য রাখতে গিয়ে গ্রীসের কমিউনিস্ট পার্টির প্রতিনিধি নিকোলাই-আলাভানোস মধ্য প্রাচ্যের ইজরায়েল-প্যালেস্তাইন সম্পর্কিত মার্কিন পরিকল্পনার নিন্দা করেছেন। কিন্তু এই একই ইস্যুকে বিদেশ ও সুরক্ষা নীতি বিষয়ক ইউরোপীয় ইউনিয়নের হাই কমিশনার জোসেপ বোরেল এবং ইউরোপিয়ান পিপল’স পার্টির অ্যানা-মিশেল অসিমাকোপলৌ ইতিবাচক আখ্যা দিয়েছে। নিকোলাই-আলাভানোস বলেছেন, “আমরা প্যালেস্তাইন ইস্যুতে ইজরায়েলী দখলকে স্থায়ী রক্ষাকবচ দেওয়ার মত মার্কিন পরিকল্পনাকে গ্রহণযোগ্য বলে মনে করি না। প্রচারিত চুক্তিটি মধ্য প্রাচ্যের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদী পরিকল্পনার অংশ। এই চুক্তিটি জেরুজালেমকে “অবিভক্ত ইজরায়েলের রাজধানী” হিসেবে তুলে ধরতে, জর্দান উপত্যকা দখল এবং সেখানে ইজরায়েলী বসতি স্থাপনে উদ্যত। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র প্যালেস্তাইনের জন্য তাদের তহবিল উজাড় করে দিয়েছে অর্থ সাহায্যের বিনিময়ে ব্ল্যাকমেইল করার জন্য”। তিনি বলেছেন যে ইউরোপীয় ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত জাতীয় সরকারগুলি (তাদের মধ্যে অন্যতম গ্রীসের পূর্বতন সাইরিজা এবং বর্তমান নিউ ডেমোক্রাসি-র সরকার) এই বিষয়ে শোষক এবং শোষিতের থেকে সমদূরত্ব বজায় রেখে চলেছে এবং পক্ষান্তরে ইজরায়েলী সামরিক দখলদারিত্বের গুণগান গেয়ে আসছে। গত ফেব্রুয়ারী মাসে গ্রীসের কমিউনিস্ট পার্টি একটি প্রেস বিবৃতিতে উল্লেখ করেছে যে তারা “ইজরায়েলী দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে এবং ১৯৬৭ সালের রাষ্ট্রপুঞ্জের সীমান্ত বিভক্তিকরণ অনুযায়ী একটি স্বাধীন প্যালেস্তাইন রাষ্ট্র এবং পূর্ব জেরুজালেমকে তার রাজধানী হিসাবে প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে প্যালেস্তাইনের জনগণের ন্যায়সঙ্গত সংগ্রাম”-কে সমর্থন করে। 

আজ আন্তর্জাতিক মেহনতি নারী দিবসে, কবি ও সাংবাদিক রাফিফ জিয়াদার কলমেঃ 

“Allow me to speak my Arab tongue before they occupy my language as well,

Allow me to speak my mother tongue before they colonize her memory as well,

I am an Arab woman of color and we come in all shades of anger.

All my grandfather ever wanted to do was wake up at dawn and watch my grandmother kneel and pray in a village hidden between Jaffa and Haifa,

My mother was born under an olive oil tree on a soil they say is no longer mine,

But I will cross their barriers, their check points, their damn apartheid walls and return to my homeland.

I am an Arab woman of color and we come in all shades of anger.”… 

Similar Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *