প্রথম প্রকাশঃ E-INTERNATIONAL RELATIONS ২৬শে ফেব্রুয়ারী, ২০২০

বঙ্গানুবাদঃ জবরদখল পত্রিকা

জন এম. কার্ক কানাডার ডালহৌসি বিশ্ববিদ্যালয়ের লাতিন আমেরিকা বিষয়ক অধ্যাপক; তিনি কিউবার আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, ইতিহাস এবং সংস্কৃতি বিষয়ক প্রচুর সংখ্যক বইয়ের লেখক বা সম্পাদক, যার মধ্যে রয়েছে “কিউবা অ্যাট দা ক্রসরোডস” (২০২০), “কিউবা ফরেন পলিসিঃ ট্রান্সফর্মেশা আন্ডার রাউল ক্যাস্ট্রো” (২০১৮)” এবং “হেলথকেয়ার উইদাউট বর্ডারসঃ আন্ডারস্ট্যান্ডিং মেডিক্যাল ইন্টারন্যাশনালিজম” (২০১৫)। এছাড়াও তিনি প্রধান অনুবাদক হিসেবে কাজ করেছেন নোভা স্কোটিয়া জন স্যাভেজ, অ্যালেইদা গেভারা (চে কন্যা), অ্যাডলফো পারেজ ইস্কুইভেল (নোবেল শান্তি পুরস্কার প্রাপ্ত আর্জেন্টিনীয়), চিলির সঙ্গীত দল ইন্টি ইলিমানি ও ক্যুলাপ্যায়ুন এবং মেক্সিকান রাষ্ট্রপতি পদপ্রার্থী ক্যাটিমক কার্ডেনস-এর সঙ্গে রাষ্ট্রপতি ফিদেল কাস্ত্রোর বৈঠকের সময়ে।  

(১) আপনি আপনার গবেষণার পরিসরে কোথায় সবচাইতে বেশি উত্তেজিত গবেষণা/বিতর্ক দেখতে পাচ্ছেন?

দুটি অংশ সম্পর্কে গুরুত্ব দেওয়া দরকার। একটি হল কিউবা-ইউএস সম্পর্কে বর্তমান পরিস্থিতি এবং দ্বিতীয়টি হল কিউবার কোন ধরণের অর্থনৈতিক সংস্কার দরকার তা নিয়ে বিতর্ক। প্রথমটা কিউবার একটি অতি পুরানো ইস্যু যে কিউবা কিভাবে ট্রাম্প প্রশাসনের বাড়াতে থাকা বহুমাত্রিক চাপের মুখে টিকে থাকবে যখন এই বিপ্লবী সরকারের প্রতি তাদের অবস্থানই হল ‘বহু আঘাতের ফলে মৃত্যু’। ইউএস প্রশাসন উদ্দেশ্য প্রণোদিতভাবে পূর্বতন ওবামা প্রশাসনের সকল প্রকল্পকে বাতিল করে দিয়েছে।

দ্বিতীয় ইস্যুটি হল কোন ধরণের অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তগুলির প্রণয়ন দরকার কিউবাকে চাঙ্গা করতে যখন তারা ইউএস প্রশাসনের আগ্রাসন এবং নিজস্ব প্রশাসনের ভ্রান্তির সম্মুখীন হবে। যখন আয়ের প্রধান দুটি উৎস (প্রফেশনাল সার্ভিসের রপ্তানি এবং পর্যটন) চুপসে যাচ্ছে তখন ছোট ও মাঝারী উদ্যোগপতি এবং সমবায়গুলির জাতীয় অর্থনীতিতে বেশী যোগদান দরকারি হয়ে পড়ছে। একই সাথে এই প্রসঙ্গে কিউবার খাবারের ৭০%-এরই আমদানী নির্ভরশীল জোগান এবং কৃষকদের ফলন বাড়াতে অপর্যাপ্ত ভাতার ব্যাপারটাও লক্ষ্য রাখা দরকার।   

(২) আপনি যেভাবে পৃথিবীকে উপলব্ধি করেছেন তা সময়ের সঙ্গে কিভাবে পাল্টেছে এবং আপনার চিন্তাধারার পরিবর্তনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব কিসের বা কার?

দুটো প্রধান ইস্যু এই সময়ে দাঁড়িয়ে স্পষ্ট হচ্ছেঃ ১) জলবায়ুর সংকট যার মুখোমুখি হচ্ছে সমগ্র পৃথিবী; ২) পুরোনো রাজনৈতিক ব্যবস্থায় ফাটল৷ জলবায়ু সংকট প্রসঙ্গে যদি আসি, এটা স্পষ্ট যে আমাদের আজকের এই পৃথিবী ভয়াবহ পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে চলেছে যদি না আমাদের নেতারা (সারা বিশ্বে) আত্মরক্ষামূলক ভঙ্গি ও স্বার্থগুলিকে সরিয়ে রাখতে পারে এবং অতি শীঘ্রই কার্যকারী নীতিসমূহের প্রয়োগের মাধ্যমে জলবায়ু পরিবর্তনের ক্রমবর্ধমানতাকে কমাতে পারে। এটা খুবই কঠিন, বিশেষ করে যখন গোটা পৃথিবীর একমাত্র সুপার পাওয়ার এই চ্যালেঞ্জের কাঠিন্যকে উপলব্ধি করতে চাইছে না এবং যখন চীন ও ভারতের মত উদীয়মান সুপার পাওয়ারগুলির জনগণ আরও বেশী ক্রেতা অধিকার চাইছে। আন্তর্জাতিক রাজনীতির পরিবর্তনের মাঝে এটা লক্ষণীয় যে যখন ইউএস আন্তর্জাতিক রাজনীতির ময়দান থেকে নিজের পদধূলি কমানোর সিদ্ধান্ত নিচ্ছে এবং যখন উন্নয়নশীল দেশগুলির মধ্যে চীন এবং কিছু পরিমাণে রাশিয়ার রাজনৈতিক দখলদারি বাড়ছে, তখন একটা নতুন আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার পত্তন হতে দেখা যাচ্ছে। উভয় ক্ষেত্রেই, উন্নয়নশীল দেশগুলির নির্ধারিত গন্তব্য হয় শোষিত হওয়া নতুবা পিছনে পড়ে থাকা।

(৩) ২০১৯-এর এপ্রিলে কিউবায় যে নতুন সংবিধান প্রণীত হয়েছিল তাতে প্রচুর সংখ্যক রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং আইনগত সংস্কার যুক্ত হয়। ষাট বছর ধরে ক্ষমতাসীন বিপ্লবী সরকারের আমলে গৃহীত নতুন সংবিধান কতটা তাৎপর্যপূর্ণ এবং তা সাধারণ কিউবাবাসীর উপর কীভাবে প্রভাব  ফেলবে?

নতুন সংবিধান আধুনিকীকরণের সাথে সাথে বিপ্লবী সমাজতান্ত্রিক রাজনীতি-অর্থনীতির পরিকাঠামোগত ঐতিহ্যকে দৃঢ় করেছে। এটি কোনও অতিরিক্ত প্রভাব ফেলবে না কিউবায় বসবাসকারী সাধারণ মানুষজনদের উপর, যারা খাদ্য ও কাঁচামালের অপ্রতুলতার বাড়বাড়ন্ত নিয়ে অতিমাত্রায় চিন্তিত এবং আরো চিন্তিত ট্রাম্প প্রশাসনকে নিয়ে কারণ তারা বিপ্লবী কিউবার অর্থনীতির উপর নঞর্থক প্রভাব ফেলছে। গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হল যে কিউবার এখন একটি আধুনিক সংবিধান রয়েছে, বেশী আন্তর্জাতিক প্রবেশাধিকার হয়েছে এবং এমন নেতৃত্ব রয়েছে যারা কাস্ত্রো পরিবারের অন্তর্গত নয়।   

(৪) “পিঙ্ক টাইড”-এর অন্তর্গত বেশ কিছু বামপন্থী অথবা বামঘেঁষা সরকারের সঙ্গে কিউবা ২০০০ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত সম্পর্ক অনেক উন্নত করেছিল। কিউবার এই দেশগুলির সঙ্গে সম্পর্ক দক্ষিনপন্থী সরকারগুলির উত্থানের প্রেক্ষাপটে কি রূপ নিতে পারে? 

যে ‘পিঙ্ক টাইড’-এর দেশগুলিতে সমাজতান্ত্রিক কিংবা সোশ্যাল ডেমোক্র্যাট সরকার ছিল সেখানে এখন অতি রক্ষণশীল প্রশাসনের ‘নীল সমুদ্র’ বইছে। এক্ষেত্রে বিশেষ করে উল্লেখযোগ্য হল ব্রাজিলের প্রতিক্রিয়াশীল বলসেনেরো প্রশাসনের মেডিক্যাল সাহায্য প্রত্যাখ্যানের মধ্যে দিয়ে কিউবার উপর বিশাল প্রভাব যখন কিউবার আয়ের উৎস হিসেবে এই কাজ করে যাওয়াটা ছিল খুবই প্রয়োজনীয়। এই প্রকল্প তার বাস্তবায়নের চুড়ায় থাকাকালীন ১১,০০০ মেডিক্যাল পারসোনেল সেখানে কাজ করত সরকারী সুবিধা বঞ্চিত কমিউনিটিগুলির মধ্যে। এই চক্র পূর্ণ হয়েছে বলিভিয়ায় সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে (যাতে ইভো মোরালেসকে সরে যেতে হল) কারণ মেক্সিকো এবং আর্জেন্টিনা বাদে বাকি লাতিন আমেরিকাতেই ডানপন্থী সরকার ফিরে এসেছে। এবং অবশ্যই, কিউবার মাদুরো সরকারের প্রতি দ্বিধাহীন সমর্থন তাকে বাকি লাতিন দেশগুলির সাথে সংঘাতে নিয়ে গেছে যাদের অধিকাংশই ‘লিমা গ্রুপ’-এর অন্তর্গত হয়ে মাদুরোকে ক্ষমতাচ্যুত করে গুয়েইডোকে প্রেসিডেন্ট বানাতে চাইছে। 

ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষিতে কিউবা অবশ্যই বহু সহযোগীকে হারিয়েছে। ভেনেজুয়েলাকে কেন্দ্র করে এই ঝামেলা আশা করা যায় ২০২০-তে মিটবে যখন জাতীয় নির্বাচন স্থির করবে যে কিউবার রাজনৈতিক প্রভাব বাড়বে না কমবে। এত কিছু বলার পরেও এটা উল্লেখ্য যে কিউবা এখনও লাতিন অঞ্চলে মেডিক্যাল ও শিক্ষাগত সাহায্য করে চলেছে এবং তাদের পলিসির প্রতি সমর্থনের উদাহরণই হল ২০১৯ সালের নভেম্বরে রাষ্ট্রপুঞ্জে কিউবার উপর ইউএস-এর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে সকলের স্বতঃস্ফূর্ত নিন্দা। ইউএস ও ইজরায়েল ছাড়াও তিনটি দেশের মধ্যে ব্রাজিলও ছিল যারা বাদে কলোম্বিয়া এবং ইউক্রেন মত প্রকাশে বিরত থাকলে, বাকি সকল লাতিন এবং ক্যারিবিয়ান দেশগুলি নিন্দা প্রস্তাবে সমর্থন করেছিল। দুটি মতদানে বিরত থাকা দেশ বাদে নিন্দাসূচক ভোটের ফলাফল হয়েছিল ১৮৭-৩।   

(৫) ভেনেজুয়েলার বহুমুখী অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সংকটগুলির প্রতি কিউবান সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি কি এবং সেখানে প্রতিপক্ষ সরকার ক্ষমতায় আসার ধাক্কা সহ্য করতে কিউবান অর্থনীতি কতটা তৈরী?


ভেনেজুয়েলার অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সংকটে কিউবান সরকার বেশ জোরালো ভাবেই ভেনেজুয়েলার মাদুরো সরকারের পক্ষে দাঁড়িয়েছে এবং ভবিষ্যতেও দাঁড়াবার আশ্বাস দিয়েছে। ফিদেল কাস্ত্রো ও শাভেজ-এর ব্যক্তিগত সম্পর্কের দরুণই শাভেজ-এর সময় থেকেই এই দুই সরকারের সম্পর্ক দৃঢ় হতে থাকে। সেই সময়কালে দুই দেশের যৌথ সহায়তায় শতাধিক প্রজেক্টের পরিকল্পনা করা হয় এবং প্রায় দশ হাজার কিউবাবাসী ভেনেজুয়েলার ওইসব প্রজেক্টে একসাথে কাজ করতে থাকে। কিউবা ভেনেজুয়েলা থেকে জ্বালানী আমদানিতে নির্ভরশীল। কিউবা ভেনেজুয়েলার মাদুরো সরকারের প্রতি সমর্থন জারি রাখবে এবং সমকালীন সংকটের রাজনৈতিক সমাধানে ব্রতী হবে। তাৎপর্যপূর্ণভাবে “লিমা গ্রুপ” এই সমাধানের দিকেই ঝুঁকছে যদিও এর আগে তারা ওয়াশিংটনের পদ্ধতিরই কট্টর সমর্থক ছিল। ভেনেজুয়েলানদের রাজনৈতিক সমাধানের প্রচেষ্টাই একটি কাঙ্ক্ষিত সমাধানের পথ। ভেনেজুয়েলা থেকে জ্বালানী আমদানির পাশাপাশি কিউবা অন্যান্য বিকল্প উৎস (যেমন রাশিয়া, অ্যালজেরিয়া প্রভৃতি দেশ)-এর সাথেও উন্নত সম্পর্ক স্থাপন করছে, কারাকাসে সরকার পরিবর্তনের সম্ভাবনার কথা মাথায় রেখে। যদিও হাভানা মাদুরো পরিচালিত ভেনেজুয়েলার প্রশংসা করছে, এবং যদিও ওই দেশের সঙ্গে এই সম্পর্ক নষ্ট হওয়াটা কিউবাকে বিরাট ধাক্কা দেবে, কিন্তু তা কিউবার ভূ-রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্কগুলিতে বিশেষ নঞর্থক প্রভাব ফেলবে না। 

(৬) ইউএস এবং কিউবার মধ্যে ওবামার সরকারের শেষ সময়ে যে “স্বাভাবিকীকরণ”-এর পলিসি শুরু হয়েছিল, তা ট্রাম্পের সময়ে বিপরীত রূপ নেয়। এই স্বাভাবিকীকরণের পদ্ধতি কি এখনও অন্যভাবে কার্যকর রয়েছে বা কোনও সুদূর প্রসারী প্রভাব এর রয়েছে যা উচ্চ পর্যায়ের সরকারি পলিসি থেকে বুঝে ওঠা কঠিন?

  
ওবামার সময়কালীন স্থায়ীকরণের পলিসির কিউবান সমাজে অনেক সদর্থক প্রভাব পড়েছিল। ইউএস লগ্নি শুরু হয়, ব্যবসায়িক সম্পর্ক দৃঢ় হয়, কিউবান উদ্যোগপতিরা সাহস পায় (বিভিন্ন সংস্থার উন্নতিও চোখে পড়ে), কিউবায় ইউএস পর্যটকের সংখ্যা বাড়ে, সাংস্কৃতিক সম্পর্কের উন্নতি হয় এবং আদান-প্রদান বৃদ্ধি পায়। মনে হচ্ছে, ট্রাম্প প্রশাসন ইউএস ইলেক্টোরাল কলেজ ভিত্তিক ব্যবস্থায় ফ্লোরিডা আসনটি জয় করতে উদ্ধত হয়েই ওবামা আমলের সমস্ত পরিকল্পনাগুলি বন্ধ করে দেয়। স্বভাবতই এই দুই দেশের মধ্যেকার পলিসির আর অগ্রগতি ঘটে না যা মার্কিন এবং কিউবান উভয় জনতার পক্ষে খুবই দুঃখজনক। উড়ান যাত্রায় এবং বিলাস বহুল জাহাজে  সীমাবদ্ধতা আরোপ করার ফলে মার্কিন পর্যটকের সংখ্যা হ্রাস পেতে থাকে। মানুষে মানুষে যোগাযোগ বজায় থাকলেও অনেক কমে যায়। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, কিউবান নির্বাসিতদের চাপে কিছু কিউবান মিউজিক্যাল ব্যান্ড-এর প্রোগ্রাম ইউএসএ-তে বাতিল করা হয়। আক্ষরিক অর্থে ওবামার পরিকল্পনাগুলির যেটুকু রয়ে গেছে তা হল সম্ভাব্য সহযোগীতা এবং পারস্পরিক লাভজনক আদান-প্রদান, যদিও এর বাইরে আর প্রায় কিছুই নেই বললে চলে।   


(৭) ট্রাম্প প্রশাসন আরোপ করে যে ২০১৬ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে হাভানাতে নিযুক্ত কিছু কূটনীতিবিদদের “শ্রবণ আক্রমণ”-জনিত কারণে, স্বাস্থ্য সমস্যায় পড়তে হয়। এই আরোপ সম্পর্কে আপনার কি অভিমত? 

ওয়াশিংটন কিউবা সরকারের বিরোধীদের বিবেচ্য ও প্রাসঙ্গিক প্রমাণ করতে “শ্রবণ আক্রমণ”-এর প্রশ্ন সামনে এনেছে। এই অপবাদের প্রেক্ষাপটে কিউবানরা এফ.বি.আই এবং রয়্যাল কানাডিয়ান মাউন্টেইন পুলিশের প্রতিনিধিদের (যেহেতু কিছু ক্যানাডিয়ান কূটনীতিবীদদের আক্রান্ত হওয়ারও আরোপ করা হয়েছিল) তাদের দেশে এসে তদন্ত করতে দেয় প্রামাণ্য নথিপত্র খোঁজার জন্য। যদিও কোনও প্রমাণ পাওয়া যায়নি, ট্রাম্প সরকারের চিলেরা এই ঘটনা ঘটেছে বলে দাবী করে আসছে। মার্কিন বিজ্ঞানী বিরোধীরা এর বিভিন্ন ধরণের ব্যাখ্যা করেছে। ফ্লোরিডার বিশেষজ্ঞরা সরাসরি কূটনীতিকদের শ্রবণকে আক্রমণ করা হয়েছে বলে দাবী করেছে, পেনসিলভেনিয়া ইউনিভার্সিটির কিছু বিজ্ঞানী এটির কূটনীতিকদের মস্তিষ্কে স্নায়ু জনিত উৎসের কথা  বলেছেন। এদিকে কানাডার কিছু স্নায়ু বিশেষজ্ঞ প্রমাণ দেওয়ার চেষ্টা করেছেন যে আসলে মশার লার্ভা মারার টক্সিনের অত্যাধিক  প্রয়োগ কূটনীতিকদের মস্তিষ্কে প্রভাব ফেলেছে। কিন্তু দুঃখজনকভাবে ইউএস বিশেষজ্ঞরা কিউবানদের সাথে যৌথ তদন্তের আবেদন প্রত্যাখ্যান করেছে। যদিও কানাডিয়ানরা কিউবানদের আহ্বানে সাড়া দিয়ে যৌথ গবেষণা প্রকল্প চালু করেছে। ইতিহাসবীদরা এই অধ্যায়কে ঘটনাহীনতার পর্যায়ের রূপেই হয়তো অভিহিত করবেন কারণ মার্কিন রাজনীতিবীদরা কিউবানদের যৌথ তদন্তের আহ্বানে সাড়া না দিয়েই বিজ্ঞানের নৌকায় পা দিয়ে দিয়েছেন ওই “অ্যাট্যাক”-এর কোনও ঠোস প্রমাণ ছাড়াই। 

(৮) ৬০-৭০ দশকের কিউবা নিজেদের বৈপ্লবিক ও জাতীয় স্বাধীনতা আন্দোলনের সমর্থক রূপে প্রতিষ্ঠিত করেছিল। পরবর্তীকালে কিউবা বিভিন্ন “আন্তর্জাতিকতাবাদী” স্বাস্থ্য প্রকল্প এবং ‘মাল্টি পোলার’ বিশ্ব ব্যবস্থার পক্ষে দাঁড়িয়ে জোট নিরপেক্ষ দেশগুলিকে সমর্থন করেছিল। কিউবার বর্তমান বিদেশ নীতিকে আমরা কিভাবে দেখব? 

একবিংশ শতাব্দীতে কিউবার বিদেশ নীতির ভীত হলো রাজনীতি ও প্রয়োগবাদ। ২০১৯ সালের নভেম্বরের ভোটে রাষ্ট্রপুঞ্জের সাধারণ সভায় কিউবার উপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে নিন্দাসূচক ভোট (১৮৭টি দেশ কিউবার বক্তব্যকে সমর্থন করে, ৩টি দেশ বিরোধিতা করে এবং ২টি দেশ মতদানে বিরত থাকে) ওই দ্বীপটার প্রতি আন্তর্জাতিক সমর্থনের নিদর্শন। এই সমর্থনের একাংশ উন্নয়নশীল দেশগুলির থেকে এসেছে ওই দেশগুলিতে কিউবার ভূমিকার জন্য। আগের থেকে অনেক কমে গেলেও এখনও কিউবার প্রায় ৩০,০০০ মেডিকেল পার্সোনেল ৬৪টি দেশে কাজ করে চলেছে যা জি-৭ দেশগুলির মিলিত সংখ্যার থেকেও অধিক। চলতি বছরগুলিতে কিউবা-ইউএস সম্পর্কের দৃষ্টিকটু পরিবর্তন বেশ নজর কাড়ছে যখন অন্যদিকে কিউবার সাথে চীন ও রাশিয়ার সম্পর্ক আরো দৃঢ় হচ্ছে। চীন এখন কিউবার দ্বিতীয় ব্যবসায়িক সহযোগী (ভেনেজুয়েলার পরে), আর রাশিয়ার সাথে কিউবার ব্যবসায়িক সম্পর্ক বেড়েই চলেছে। বলা বাহুল্য, এই পরিস্থিতি খুবই অদ্ভূতভাবে ১৯৬০-এর দশকে কিউবার ইউএস এবং রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্কের কথা মনে করিয়ে দেয়।  


(৯) তরুণ শিক্ষার্থীদের কাছে কিউবার রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজনীতির ক্ষেত্রে কোনটি বেশি প্রয়োজনীয়?

কিউবা অনেকটাই জটিল, দ্বান্দ্বিক এবং অস্পষ্ট, কিন্তু কখনওই একঘেয়ে নয়। এই দেশটি বিশাল ইতিহাস সম্পন্ন এবং নিজের ঐতিহাসিক ভীতকে সে কখনও ভোলেনি। ১৮৯০ সালের স্বাধীনতা আন্দোলনের নেতা হোসে মার্তির সম্মানজনক পরিচিতি রয়েছে দ্বীপটিতে,  ১-পেসো নোটে তাঁর ছবি রয়েছে এবং প্রতিটা স্কুলেই তাঁর প্রতিকৃতির উজ্জ্বল উপস্থিতি আইনগতভাবে স্বীকৃত। কিউবা এমন একটি দেশ যে নিজস্ব উন্নয়ন মডেলের ভিত্তিতেই কাজ করছে কিন্তু তার অবস্থান ইউএস-এর ছায়াতে (মাত্র ৯০ মাইল দূরে); সেই ইউএস যে ২০০ বছর আগে দ্বীপটিকে কিনে নিতে চেয়েছিল, তাদের প্রধান লগ্নিকারক ও বাণিজ্যিক দোসর হয়ে ওঠে, বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধ অব্দি কিউবার অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও হস্তক্ষেপ করে এবং বিগত ৬০ বছর ধরে সেখানে সরকার পরিবর্তনের চেষ্টা চালিয়ে আসছে। কিউবা দু’রকম ভিন্ন সমাজের একটি দেশ; জনতার ১০ শতাংশ বিদেশে থাকে এবং বাকিরা যারা রয়ে গেছে তারা সমাজতান্ত্রিক মডেলের প্রতিই অনুরক্ত থেকেছে। উজ্জ্বল ইতিহাস, রাষ্ট্রীয় বিচ্ছিন্নতা, উন্নয়নের মডেলের খোঁজ এবং ইউএস-এর আগ্রাসী বিরোধিতার প্রেক্ষাপটে কিউবানদের মধ্যে সংকটপূর্ণ সময়ের ঐক্যবদ্ধতা এবং জাতীয়তাবাদের মিশ্রণ তৈরি হয়েছে। তারা দেশভক্ত, নিজেদের কৃতিত্বের প্রতি গর্বিত এবং ইউএস-এর প্রতি ভালোবাসা-ঘৃণা মিশ্রিত একটি সম্পর্ক রাখে। এই সবকিছুকে একযোগে দেখা একটা চ্যালেঞ্জ কিন্তু আমাদের সময় খরচের সুযোগ্য।   

[অধ্যাপকের মতামত নিতান্তই ব্যাক্তিগত। কিউবা প্রসঙ্গে রাজনৈতিক আলোচনার পরিসরের ব্যাপ্তির জন্যই এই অনুবাদ প্রকাশিত হল।]   

Similar Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *