অর্থনীতি কার্যত কোমায়, ভারতে বেকারত্বের হার পাঁচ বছরে সর্বোচ্চ। গাড়ি শিল্প থেকে রেল, প্রতিরক্ষা ছাটাই-এর খাঁড়া ঝুলছে ভারতের সমস্ত কর্মক্ষেত্রেই। কিন্তু মার্কিন প্রবাসী ভারতীয়দের ‘হাউডি মোদি?’-প্রশ্নের উত্তরে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির মন্তব্য ‘এভ্রিথিং ইজ ফাইন ইন ইন্ডিয়া।’ গত ২২-শে সেপ্টেম্বর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস প্রদেশের হিউস্টনের এনআরসি স্টেডিয়ামে মার্কিন প্রবাসী ভারতীয়দের উদ্যোগে আয়োজিত সভায় এভাবেই ভারতের বর্তমান অবস্থাকে ‘বর্ণনা’ করলেন নরেন্দ্র মোদি। অনুষ্ঠানের মঞ্চ থেকেই নরেন্দ্র মোদি বিজেপির ২০১৪ লোকসভা নির্বাচনের শ্লোগানের তর্জমা করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সমর্থনে বলেন, ‘আপ কি বার ট্রাম্প সরকার।’ ট্রাম্পের সাথে তার হৃদ্যতা বোঝাতে তিনি এখানেই ক্ষান্ত হননি। ‘হাউডি মোদি?’ অনুষ্ঠানের শেষে এই সভার গুরুত্ব ভারত ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে যে কত গুরুত্বপূর্ন তা বোঝাতে প্রধানমন্ত্রী ট্যুইট করেন, “প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প, হিউস্টনে আপনার উপস্থিত ভারত-আমেরিকা সম্পর্কে একটি মাইলফলক। ক্ষমতায় আসার পর থেকে ভারত এবং ভারতীয় বংশোদ্ভূতদের সঙ্গে ধারাবাহিক ভাবে মৈত্রী বজায় রাখার পথে চলেছেন আপনি। গত কালের অনুষ্ঠানে আপনার উপস্থিতিই প্রমাণ করে দেয় ভারতীয় বংশোদ্ভূতদের প্রতি আপনার শ্রদ্ধা রয়েছে।” অন্যদিকে মার্কিন রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্পও কৃতজ্ঞতার অবধি রাখেননি মোদির দেখানো ‘ভালোবাসার’ প্রত্যুত্তরে। বিশ্ব-রাজনীতিতে ভারতকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ১ নং ‘পার্টনার’ হিসেবে দেখতে চেয়ে তিনি মুম্বইতে অনুষ্ঠিত হতে চলা বাস্কেটবল ম্যাচের আমন্ত্রনও চেয়ে নেন মোদির কাছ থেকে।
কিন্তু মোদি-ট্রাম্প হরিহরাত্মা সম্পর্কের নেপথ্যে কী আছে? ভারতের অর্থনীতি যখন গভীর সংকটে ডুবে তখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের হাত ধরাধরি করে কী নতুন ঘুঁটি সাজাচ্ছেন মোদি? খাদের কিনারে থাকা ভারতীয় অর্থনীতিকে টেনে তুলতে একের পর এক ব্যাঙ্ক সংযুক্তিকরণ, ধুঁকতে থাকা বিভিন্ন শিল্পক্ষেত্রগুলিকে ‘প্যাকেজ’ ঘোষণা-সহ বিভিন্ন পদক্ষেপ নেবার পরেও যখন পরিস্থিতি ক্রমাবনতির দিকে যাচ্ছে তখন ভারতে সবকিছু ‘ঠিক আছে’ বলার নেপথ্যে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির উদ্দেশ্য কী? শুধুমাত্র কি আবাসী ও অনাবাসী ভারতীয়দের চোখে দুর্দশা ঢাকতে কালো পট্টি বাঁধা, নাকি এর পিছনে রয়েছে গুরুতর কোনো অভিসন্ধি।
মোদি-ট্রাম্প ‘পার্টনারশিপ’-এর এই আবহ কিন্তু মাসখানেক আগেও ছিল না। গত জুন মাসে ওসাকায় জি-২০ বৈঠকের আগেও ভারতে আমদানিকৃত মার্কিন পণ্যের উপর ভারতের উচ্চহারে শুল্ক বসানোর বিরোধিতা করে ট্যুইট করেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। এর আগে আমেরিকা থেকে ইস্পাত, এলুমিনিয়ামের মত কয়েকটি পণ্য আমদানিতে ভারতের ক্ষেত্রে যে ছাড় মিলত তা তুলে নেয় আমেরিকা। পাল্টা ভারত ও শুল্ক বসায় আমদানিকৃত মার্কিন পণ্যাদির উপর। দু’দেশের এই শুল্কযুদ্ধের আবহে যথেষ্ট গরম ছিল দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক। কিন্তু দু’দেশের এই শুল্কযুদ্ধ যে তাৎক্ষণিক তার প্রমাণ পাওয়া গেছিল ওসাকার জি-২০ বৈঠকের শেষেই। আসলে চীনকে কোনঠাসা করতে যে ভারতের সাথে বন্ধুত্বপূর্ন সম্পর্ক রাখা আবশ্যক তা ক্রমেই অনুভব করতে থাকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। অন্যদিক পাকিস্তানকে কোনঠাসা করতে আমেরিকার সাথে বৈরিতা আখেরে বিপদের লক্ষণ তাও বুঝতে শুরু করে ভারত সরকার।
মোদি-ট্রাম্প ‘পার্টনারশিপ’-এর আরো এক স্তম্ভ হলো সাম্প্রতিককালের কাশ্মীর পরিস্থিতি। গত ৫ই অগাস্ট কাশ্মীরের উপর থেকে ৩৭০ ও ৩৫-এ ধারা তুলে নেওয়ার পর ভারতকে আন্তর্জাতিক মহলে কোনঠাসা করতে উদ্যত হন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান। এই আবহে বিজেপি-সরকারের রক্তচাপ বাড়িয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইমরানকে পাশে বসিয়ে ভারত-পাক সম্পর্কের মধ্যস্থতাকারী হতে চান। এই ঘটনার পরে ট্রাম্পের মন্তব্যের বিরোধিতা করলেও আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি যে বেগতিক তা বুঝতে শুরু করে ভারত সরকার। ধুঁকতে থাকা অর্থনীতি এবং পাকিস্তানী ‘জুজু’ এই দু’য়ের গুঁতোয় ভারত-মার্কিন দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক মজবুত করাই মুখ্য উদ্দেশ্য হয়ে ওঠে মোদির। অন্যদিকে ‘চীনা-ড্রাগন’-কে রোখার জন্য মোদি যে অত্যাবশ্যক, তাও ক্রমে উপলব্ধি করেন ট্রাম্প। বলা ভাল প্যাঁচে পরেই দুই ‘পার্টনার’ হিউস্টনের এনআরসি স্টেডিয়ামে হাত ধরাধরি, গলা জড়াজড়ি করলেন, যার ছবি ট্যুইটারে ফলাও করে প্রকাশ করেছেন নরেন্দ্র মোদি। তাই ভারসান্য রাখতেই মোদির সুরে সুর মিলিয়ে পাকিস্তানকে বিঁধে ট্রাম্পকে শেষমেষ বলতে শোনা যায় যে, ইসলামী সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে লড়াই করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ভারত ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র উভয়েই।
দক্ষিণ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ‘হাউ ডু ইউ ডু?’-কে সংক্ষেপে বলা হয় ‘হাউডি?’ সেখান থেকেই মোদি-ট্রাম্পের সভার এহেন নামকরণ করে আয়োজক ‘টেক্সাস ইন্ডিয়া ফোরাম’। টেক্সাসের ভারতীয়দের তৈরি করা ‘টেক্সাস ইন্ডিয়া ফোরাম’ একটি অলাভজনক সংস্থা। কিন্তু এই মেগা ইভেন্ট আয়োজনের পিছনে অর্থ এলো কোত্থেকে। সংগঠনের তরফ থেকে জানা গেছে তিন বৃহৎ কর্পোরেট ‘ওয়ো’, ‘ওয়ালমার্ট’ এবং ‘টেলুরিয়ন’ মোদির এই সভাটির স্পনসর করেছে। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য ২০১২-তে খুচরো ব্যবসায় প্রত্যক্ষ বিদেশী বিনিয়োগে স্বিকৃতি দেবার পর থেকেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তথা বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম ‘রিটেল জায়ান্ট’ ‘ওয়ালমার্ট’ ভারতে ব্যবসা বাড়াচ্ছে। অন্যদিকে বিগত কয়েকবছরে ভারতে হোটেল ব্যবসায় ধূমকেতুর মতো উত্থান ঘটিয়েছে ‘ওয়ো’।
দক্ষিণ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস প্রদেশে বসবাস প্রায় ৫ লক্ষ ভারতীয় বংশোদ্ভূতের। তাদের মধ্যে ১ লক্ষ ৩০ হাজার থাকেন হিউস্টন শহরেই। মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে গুরুত্বপুর্ন ফ্যাক্টর হয়ে ওঠেন এই প্রবাসী ভারতীয়েরা। কারণ মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে খুব সামান্য আসনের ব্যবধানের জন্যও ‘ইলেকটোরাল কলেজ’ হাতছাড়া হয়ে যেতে পারে, সেখানে টেক্সাসের মতো বৃহৎ প্রদেশের ইলেকটোরাল কলেজ জয়ের জন্য এই প্রবাসী ভারতীয়দের ভোট গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে ট্রাম্পের কাছে। তাছাড়া ট্রাম্প-সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকেই তার অভিবাসন নীতির কারণে এশিয়-বংশদ্ভূতরা তার উপর যারাপনাই ক্ষুব্ধ। বিশেষত এইচ১বি১ ভিসা বাতিলের বিরোধী আন্দোলনের মুখেও পরতে হয় ট্রাম্প-প্রশাসনকে। মেক্সিকো ও অন্যান্য স্পেনীয় ভাষাভাষী দেশ থেকে আগত অভিবাসীদের উপরে চাপানো দমননীতিও ট্রাম্পকে ক্ষোভের মুখে ফেলেছে। তাই মোদিকে দিয়ে ‘আপ কি বার ট্রাম্প সরকার’ বলিয়ে ২০২০ প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের রাস্তা থেকে অভিবাসী কাঁটা সরাতে মরিয়া চেষ্টা করলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প।
হিউস্টনে যেভাবে মোদি ট্রাম্পকে পাশে দাঁড় করিয়ে সামনের বছর ট্রাম্পের হয়ে নির্বাচনের শ্লোগান বেঁধে দিলেন তাতে সমালোচনা করেছে কংগ্রেস-বামফ্রন্ট-সহ বিরোধী দলগুলি। তাদের বক্তব্য নরেন্দ্র মোদি ভারতের বিদেশনীতির প্রোটোকল ভেঙে সরাসরি অন্য দেশে গিয়ে ভোট প্রচার করেছেন, সামনের বছর ট্রাম্প না জিততে পারলে সরাসরি প্রভাব পড়বে ভারত-মার্কিন দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে। নরেন্দ্র মোদিকে ভিন দেশের তারকা প্রচারক বলেও কটাক্ষ করেছেন কংগ্রেস নেতা আনন্দ শর্মা। যদিও প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিয়মের তোয়াক্কা করেছেন কবে আর করেছেন নরেন্দ্র মোদি। রিলায়েন্স জিও-এর ব্রান্ড এম্ব্রাসডর হওয়া থেকে হালফিলে পুলওয়ামা ঘটনার দিনে একটি বিদেশী চ্যানেলের অনুষ্ঠানের শ্যুটিং-এ ব্যস্ত থাকা; সবই তার ৫৬ ইঞ্চি বুকের ছাতির কামাল।
নরেন্দ্র মোদির ‘হাউডি মোদি?’ সম্প্রচারিত হবার পর থেকেই বিজেপি নেতারা উচ্ছ্বসিত হতে থাকেন। বিজেপি নেতাদের মোদিকে অভিনন্দনের বন্যায় ভেসে যেতে থাকে ট্যুইটার। অভিনন্দনের পাশাপাশি ‘হাউডি মোদি’ মারফৎ পাকিস্তানকে সায়েস্তা করা গেছে বলে মিডিয়া ও সোশ্যাল মিডিয়ায় দাবি করতে থাকেন বিজেপি নেতৃবৃন্দ। একইদিনে পাক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে উপস্থিত থাকলেও যেভাবে ট্রাম্প মোদির প্রতি ‘হৃদ্যতা’ দেখিয়েছেন সেই স্বপ্নেই বুঁদ বিজেপি।
হিউস্টনের সভায় বক্তৃতা দিতে উঠে বিভিন্ন ভারতীয় ভাষায় উপস্থিত প্রবাসীদের সম্বোধন করতে থাকেন নরেন্দ্র মোদি। বক্তৃতায় তিনি এর ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে উল্লেখ করেন ভারতের ‘বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্যে’-এর অন্যতম মাণদণ্ড হলো ভারতের বিভিন্ন ভাষাগুলি। অথচ গত কয়েকদিন আগেই কেন্দ্র সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অথা বিজেপির ‘সেকেন্ড ম্যান’ অমিত শাহ বিশ্বদরবারে দেশের ‘পরিচিতি’ তৈরির জন্য একটিমাত্র ভাষার প্রয়োজন বলে জল্পনা উস্কে দেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এহেন মন্তব্যের পর অ-হিন্দিভাষী রাজ্যগুলি থেকে ঝর ওঠে প্রতিবাদের। সেই ক্ষতে মলম দেবার জন্যই মোদি হিউস্টনের মঞ্চকে বেছে নিলেন। কিন্তু ‘শিক্ষা-বিল’-সহ একের পর এক পদক্ষেপে যেভাবে মোদি সরকার হিন্দি চাপানোর চেষ্টা করছে তাতে প্রবাসভূমে মোদির ‘বহুত্ববাদী’ সংস্কৃতির পক্ষে সওয়ালকে কুম্ভীরাশ্রু বলে ব্যাঙ্গ করছেন বিরোধীরা।
দীর্ঘ বক্তৃতায় মোদি তুলে আনেন তার সময়ে ৫ বছরে ভারত কীভাবে ‘নতুন ভারত’-এ পরিণত হয়েছে। তার খতিয়ান হিসেবে তিনি তুলে ধরেন, এই পাঁচ বছরে এফডিআই ‘ইনফ্লো’ বেড়েছে প্রায় দ্বিগুণ, কয়লা খনিতে ১০০% এফডিআই-এর ছাড়পত্র দিয়েছে তার সরকার। ৩০ কোটি মানুষকে তার সরকার দারিদ্রসীমার থেকে উপরে তুলে এনেছে, একই সাথে তিনি স্মরণ করিয়ে দেন ভারতকে ৫ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি করার স্বপ্নের কথা। কিন্তু কেন্দ্রীয় সরকারের সংস্থার পরিসংখ্যানই বলছে যে দেশে দৈনিক মাথাপিছু ৫০ টাকা খরচ করার ক্ষমতা নেই ৮০% ভারতীয়ের। অন্যদিকে এফডিআই ইনফ্লো বাড়লেও চাকরির সুযোগ উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে, চলতি বছর ভারতে বেকারত্বের হার ৫%-এর বেশী। ছদ্ম-বেকারত্বের সংখ্য ধরলে তার সংখ্যা প্রায় আরো বেশী।
পাশাপাশি রাখা মার্কিন ও ভারত পতাকা, এলসিডি স্ক্রিনে মোদি ও ট্রাম্পের হাসিমুখ, ফ্ল্যাশ বাল্বের ঝলকানির পেছনে দু’পক্ষই আসলে বুঝিয়ে দিল অর্থনৈতিক সংকট থেকে বাঁচার তাগিদে একে অন্যের প্রয়োজন, তাই বাণিজ্য যুদ্ধ অতীত। এখন দুপক্ষকেই দরকার একে অন্যকে। কিন্তু জলে ডুবতে থাকা একজন বাঁচার জন্য অপর একজনকে জড়িয়ে ধরে তাহলে তাদের যা পরিনতি ঘটে, ভারত-মার্কিন সম্পর্কের ক্ষেত্রেও একই দৃশ্যপট দেখা যাবে কী না তার উত্তর সময়েই দেবে।

Similar Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *