আজকের মরচে ধরা সমাজের এই রুক্ষ ভূমিতে দাঁড়িয়ে শুধু বড় পর্দার কোণি একা নয়, ফাইট করতে হচ্ছে বাস্তবের হাজার হাজার কোণিদেরকে। পুরুষতান্ত্রিক সমাজ এবং ততোধিক পুরুষতাত্রিক ক্রীড়াজগতে প্রতিষ্ঠা পাবার লড়াইতে প্রতিদিন হারিয়ে যাচ্ছে হাজার হাজার কোণি। আর সেখানে দাঁড়িয়ে মহিলা ক্রীড়াবিদ হবার সম্মান? সে তো সোনার পাথরবাটি। ভারতীয় মহিলা ক্রীরাবিদরা তাদের খেলার জন্য যতটা না খবরের শিরোনামে আসেন তার থেকে ঢের বেশী লাইমলাইটে আসেন দৈহিক সৌন্দর্যের জন্য, তাদের পোশাকের জন্য বা কোনো সেলেব্রিটির স্ত্রী পরিচয়ের জন্য। ভারতের পুরুষ ক্রিকেট দল নিয়ে চারিদিকে যখন পোস্টার, টিক্টিটের জন্য হাহাকার। টিভির বিজ্ঞাপনে ক্রিকেটর দের মুখের ভিড়? তখন মহিলা ক্রিকেটকে ফার্স্ট ক্লাস ক্রিকেটের ও মর্যাদা দেওয়া হয় না এদেশে। আর অন্য খেলাগুলোর অবস্থা তো আরো শোচনীয়। ভারতের  ক্রীড়ামঞ্চে তাদের প্রতি ব্যবহার করা হয়য় ভিনদেশী তারার মতোই। কর্ণম মালেশ্বরী, অঞ্জু ববি জর্জ, সোমা বিশ্বাস থেকে এখনকার দীপা কর্মকার, পি ভি সিন্ধুরা।

ক্রীড়াক্ষেত্রে সরকারের বাজেটে বরাদ্দ ২০০০ কোটি টাকার ওপরে। কিন্তু গর্তের ভেতরে নাক রাখলে পাওয়া যাচ্ছে বিষধর কেউটের ফোঁসফোঁসানি। লবিবাজি থেকে যৌন হেনস্থার শিকার হওয়া যেন অভ্যাস করে ফেলেছেন মহিলা ক্রীড়াবিদরা। অতি সম্প্রতি গোয়া সুইমিং এসোসিয়েশনের কোচ সুরজিত গাঙ্গুলির বিরুদ্ধে ভিডিও পোস্ট করে যৌন হেনস্থার অভিযোগ আনেন তার ১৫ বছরের বাঙালী ছাত্রী। এ ইতিহাস অবশ্য সব খেলার ক্ষেত্রেই শ্বাশত। ১৯৯৬-তে  ভারতীয় মহিলা দলের অধিনায়ক সোনা চৌধুরি তার জীবনীতে লিখছেন সেই কেউটের গর্তের কিছু পোড়া গন্ধের কথা।  তিনি লিখেছেন যে দলে তার স্থান পাকা করার জন্য তাকে যৌন হেনস্থার শিকার হতে হয়েছে বারংবার। রাজ্যস্তর থেকেই এর সূত্রপাত। বিভিন্ন মহল থেকে তাকে প্রলোভন দেওয়া হতো যৌন-সংসর্গের যার বদলে দলে সুযোগ পাবার।

কয়েকটি ‘এলিট’ খেলা বাদ দিলে ব্যক্তিগত এবং দলভিত্তিক মহিলা ক্রীড়াবিদদের অনুশীলনের উপযুক্ত পরিকাঠামোই নেই এদেশে। সঠিক ড্রেসিংরুম থেকে সুষম খাদ্য সবেরই অমিল। অথচ সরকারের বাজেটে বরাদ্দ দেখানো হচ্ছে কোটি কোটি টাকা। তাহলে প্রশ্ন হলো তা যাচ্ছে কোথায়? প্রান্তিক ‘রংচঙ-বিহীন’ খেলাগুলির বদলে কী অর্থের বেশীরভাগটাই যাচ্ছে পুরুষদের ক্রিকেটের এনডোর্সমেন্টে? কারন দেশের ক্রীড়াক্ষেত্রের অর্থনীতি থেকে শেয়ার বাজারের ফাটকা ও জুয়ার বেশীরভাগ লেনদেনই হয় দেশের সরকার নির্দেশিত ‘সান্ধ্য-সাংস্কৃতিক বিনোদন’-এর মাধ্যমে। যেখানে প্রতিটা ছয়-চার এমনকি প্রতি বলে বাজি ধরার দায়ে জেলে যেতে হয় সর্বোচ্চ ক্রীড়া প্রশাসকের আত্মীয়দের। আর প্রচার-বিহীন হতে হতে ধুঁকে ধুঁকে মরতে বসেছে মহিলা-ক্রিকেট।

প্রতি চার বছর অন্তর চায়ের দোকানে তর্কের তুফান ওঠে কেন আমাদের দেশে অলিম্পিকে পদক নেই, এই প্রশ্নে। যদিও বা একতা দলগত বিভাগে সোনা পাওয়া যেত, সেই হকিও আজ অস্তাচলে। কিন্তু দেশের ক্রীড়াক্ষেত্রের পরিকাঠামো নিয়ে প্রশ্ন ওঠে না।  প্রশ্ন ওঠেনা অলিম্পিকের মত ইভেন্টের আগে হিমা, দীপারা কী সুবিধা পেত সেই নিয়ে। দাঁতে দাঁত চেপে লড়াইয়ের দিনে ক্রীড়াবিদদের কী সুযোগ দেয় ক্রীড়া দফতর সেই নিয়ে। পরিকাঠামো যে এখন কতটা বিশ্বমানের তা বোঝার জন্য এথলেটিক ক্লাবগুলিতে বা রাজ্য ক্রীড়া সংস্থাগুলিতে গেলেই বোঝা যায়।

ভাল আবাসন , ভাতা কিংবা পেনশনের মত সুবিধা পাঁচ বছরের জন্য ভোটে জেতা মন্ত্রীরা সারা জীবন পেয়ে থাকেন কিন্তু বুকে তিরঙ্গা লাগিয়ে সারা জীবন রোদে-ঝড়ে-জলে লড়াই করে দেশের জন্য মেডেল নিয়ে আসা মেয়েগুলো পায় না। মেডেল কাপগুলোর দিকে দিনের শেষে  এসেই তাকাতে পারেন তারা। কারণ সারাটা দিন তাদের যে কেটে যায় হাড়ভাঙা পরিশ্রমে; কখনো ইটভাটায় কখনো অন্যের বাড়িতে কাজ করে। নেই বিজ্ঞাপণও । কারণ ‘রোদে-পোড়া’ ‘কুচ্ছিত’ মেয়েগুলোর মুখ কেন দেখবে মানুষ? আর তাতে তো পকেট টা ভরবে না ‘মার্কেট-বিশারদ’ ইনভেস্টরদের। দেশপ্রেম দেখিয়ে সোশ্যাল মিডিয়া উত্তাল করা মানুষগুলো প্রশ্ন করেনা কেন এই মেয়েগুলোর ঘাম-রক্ত-দেশপ্রেম মাটিতে লুটিয়ে যায়। উত্তর একটাই ‘মার্কেটে খায় না।’

চিত্র সূত্র : http://www.newindianexpress.com

Similar Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *