সেনা-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে বলিভিয়ার রাষ্ট্রনেতা ইভো মোরালেসের অপসারণ এবং দক্ষিণপন্থী সেনেটর জেনাইন এনেজের ক্ষমতাদখল পর্ব দু’মাস অতিক্রান্ত। কিন্তু কোন সমীকরণে বাম- ঘেঁষা এই নেতাকে ক্ষমতা থেকে সরানো হলো? নেপথ্যে কি ছিল সাম্রাজ্যবাদী শক্তির কোনো লোলুপ থাবা নাকি ক্ষমতা নিয়ে অন্তর্দ্বন্দ্ব?

২০০৩-এ লা-পাজ-এ ক্ষমতা পাবার পর থেকেই দেশের এই প্রথম উপজাতি রাষ্ট্রনেতার জনপ্রিয়তা গগণচুম্বী। বলিভিয়ার প্রবাদপ্রতীম নেতা সাইমন বলিভারের নেতৃত্বে স্পেন থেকে স্বাধীন হবার পরেও সেনা-শাসনের কবলে পড়তে হয়েছে এই দেশকে। ‘রেভলিউশনারি ন্যাশনালিস্ট মুভমেন্ট’-এর নেতা ভিক্টর পাজ এস্তেনোসোরোর নেতৃত্বে ১৯৫২-তে ঐতিহাসিক ক্ষমতার পালাবদল হয় বলিভিয়ায়। বামপন্থী চিন্তার এস্তেনোসোরো ক্ষমতায় এসে প্রান্তিক মানুষের উন্নয়নের জন্য বিভিন্ন প্রকল্প গ্রহণ করেন। বৃহদায়তন খণিগুলির জাতীয়করণের মধ্যে দিয়ে কাজ করতে থাকলে তা গাত্রদাহের কারণ হয়ে দাঁড়ায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের। মার্কিন সংস্থা সিআইএ গোপনে বলভিয়ায় সরকার বিরোধী অভ্যুত্থানকে মদত দিতে থাকে। ১৯৬৪-তে এস্তোনোসোরোকে পদচ্যুত করা হয় এবং প্রায় একই সঙ্গে শুরু হয় কমিউনিস্টদের সাথে বলিভিয়ার মার্কিন মদতপুষ্ট সরকারের গেরিলা যুদ্ধ, যার পুরোভাগে ছিলেন কমিউনিস্ট বিপ্লবী চে গ্যেভারা। ১৯৬৭-তে চে-কে গ্রেফতার এবং হত্যা করে সিআইএ। এরপর দীর্ঘদিন বলিভিয়া ছিল সেনা-শাসনে। ১৯৭১-এ প্রেসিডেন্ট তোরেসকে ক্ষমতা থেকে সরাবার পর থেকে একটানা প্রায় দু-দশক একচ্ছত্র ক্ষমতায় ছিলেন হুগো বাঞ্জের স্যুয়ারেজ। ১৯৯৩-এর পরে বাঞ্জেরের নিয়ন্ত্রণাধীনে থেকেই গণতন্ত্র ‘ফেরানোর’ প্রক্রিয়া শুরু হয় বলিভিয়ায় কিন্তু দেশের সর্বোচ্চ পদে ছিলেন হুগো বাঞ্জের স্যুয়ারেজ। কিন্তু হিসেবে ওলটপালট করে দেয় ২০০৩-এর ‘বলিভিয়ান গ্যাস কনফ্লিক্ট’। যার প্রেক্ষিতে ক্ষমতায় আসেন উপজাতি নেতা ইভো মোরামেস।

ইভো মোরালেসকে ক্ষমতা থেকে সরানোর নেপথ্যে আসল কারন কি? কেবলই আভ্যন্তরীন ক্ষমতার দ্বন্দ্ব নাকি রয়েছে সাম্রাজ্যবাদী শক্তির হস্তক্ষেপ। কারণ মোরালেস-জমানার অবসানের পর যে জেনাইন এনেজ অস্থায়ী প্রেসিডেন্ট হয়ে  ক্ষমতায় এসেছেন, তিনি বলিভিয়ার রাজনীতিতে পরিচিত মোরালেস-বিরোধী দক্ষিণপন্থী মুখ হিসেবে। যে বলিভিয়ার ৪১% মানুষ উপজাতি সম্প্রদায়ভুক্ত সেখানে তিনি বলেন ‘উপজাতিরা জুতো পরার যোগ্য নন’! কেবল এখানেই থেমে না থেকে এর পরেও একের পর এক মন্তব্য করে গেছেন এস্পানোলের প্রতি উগ্র সমর্থন ও উপজাতিদের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করে। 

রাজনৈতিক বিশ্লেষক থেকে থেকে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশারদগণ, সকলেই ইভোকে ক্ষমতা থেকে সরানোর সঙ্গে সাযুজ্য পাচ্ছেন তাঁরই পূর্বসূরী এস্তোনোসোরোর। কারণ এস্তোনেসোরো যে পদক্ষেপগুলি নিয়েছিলেন কার্যক্ষেত্রে অনেকটা সেপথেই হেঁটেছিলেন ইভো। নিয়েছিলেন একের পর এক জণকল্যানমূলক প্রকল্প। প্রাকৃতিক সম্পদ থেকে দেশের রাজস্ব বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে নিয়েছিলেন বিভিন্ন ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অর্থনৈতিক পদক্ষেপ। উপজাতি ও পিছিয়ে পরা সম্প্রদায়ের জন্য পরিকাঠামো উন্নয়নের খাতে ৫০০০ প্রকল্পের মাধ্যমে ১ বিলিয়ন ডলার খরচ করেন। ২০০৫-এ বলিভিয়ায় দারিদ্রসীমার নীচে বসবাসকারীর সংখ্যা ছিল মোট জনসংখ্যার ৩৮.২%, ২০১২-তে এসে তা কমে হয় ২১.৬%।  ইভোর আমলে প্রকৃত ন্যুনতম মজুরি বৃদ্ধি পেয়েছে ১০৪%। ১৯৮৯-তে বলিভিয়ার শিশুমৃত্যুর হার ছিল ৪১.৭% সেখানে ২০১২-তে এসে তা হয় ১৮.৫%। সর্বোপরি বলিভিয়ায় ২০০৫-এর তুলনায় ২০১৩-তে  বলিভিয়ার জিডিপি বেড়েছে প্রায় তিনগুণ। 

কিন্তু এতদসত্ত্বেও তাকে অভ্যুত্থানে উচ্ছেদ কেন? আর কেনই বা ইভোর মত এক জনপ্রিয় নেতাকে উচ্ছেদ করার পরিস্থিতি তৈরি করতে পারল দেশের সেনাবাহিনী? এর ব্যাখ্যা করলে স্পষ্টতই দেখা যাবে ২০০৫-এ ক্ষমতায় আসার পর থেকে খণি জাতীয়করণ থেকে প্রাকৃতিক সম্পদের মাধ্যমে দেশের আয়-বৃদ্ধির পদক্ষেপ নিয়ে মৌচাকে ঢিল মারার দুঃসাহস দেখিয়েছিলেন ইভো। যার ফলে কোপ পড়ে বহুজাতিক খণি সংস্থাগুলির মুনাফার অঙ্কে। আন্দিজ পর্বতের কোলে অবস্থিত বলিভিয়া বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম লিথিয়াম ও টিন-এর ভাণ্ডার। বর্তমানে টিন-এর ব্যবহার কমলেও তার সাথে ব্যস্তানুপাতিক হারে বেড়েছে লিথিয়ামের ব্যবহার। ব্যাটারী চালিত গাড়ির প্রচলনের সাথে সাথে ক্রমেই দুর্মূল্য হতে চলেছে এই খণিজটি। এছাড়াও মোবাইল থেকে শুরু করে যে কোনো ইলেকট্রনিক গ্যাজেটেও এর ব্যবহার আবশ্যিক। তাই ইভোর বাম- ঘেঁষা অর্থনৈতিক নীতি ক্রমেই গাত্রদাহের কারণ হতে থাকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের। এর সাথে যুক্ত হয় ২০০৫ পরবর্তী ইভো মোরালেসের শিল্পনীতি; বিশেষত পরিবহন ও শক্তি উৎপাদনে। এই নীতির ফলে বলিভিয়া ক্রমে লাতিন আমেরিকার দেশগুলির মধ্যে ক্রমে ‘এনার্জি হাব’-এ পরিণত হয়। 

১৯৫৮-এর গামাল আবদেলনাসের থেকে ২০১৯-এর ইভো মোরালেস, সাম্রাজ্যবাদী শক্তির মুখের গ্রাসের দিকে যখনই তথাকথিত ‘তৃতীয় বিশ্বের’ কোনো শক্তিশালী নেতা হাত বাড়িয়েছে তখন গুপ্তচর থেকে গুপ্তঘাতক হয়ে সেনা-অভ্যুত্থান, সর্বশক্তি দিয়ে সাম্রাজ্যবাদী শক্তি নখদন্ত বের করে আক্রমণ করেছে তাদের। সে সুয়েজ খাল, পেট্রোপণ্য থেকে লিথিয়াম, সবেতেই সত্য। একচেটিয়ার সাম্রাজ্যবাদ তার প্রতি কোনো চ্যালেঞ্জকে এভাবেই উখরে ফেলতে চায়, কখনও তা ফ্যাসিবাদী আগ্রাসন দিয়ে, আবার কখনও গৃহযুদ্ধ লেলিয়ে।

Similar Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *