সার্স কোভিড-২ করোনা ভাইরাস নিয়ে গোটা বিশ্ব এখন থরহরিকম্প। প্রায় দিন দশেক আগে প্রথম কোভিড-১৯ বা করোনা আক্রান্ত রোগীর সন্ধান এদেশে মেলার পর থেকেই, প্রমাদ গুনতে থাকে আসমুদ্রহিমাচল ভারতীয়রা। আর মার্চের এই তৃতীয় সপ্তাহে এসে করোনার মুকুটে নিত্যদিন যুক্ত হচ্ছে নতুন নতুন পালক। ইতিমধ্যেই করোনা বিশ্বে মহামারী সৃষ্টিকারী রোগের তকমা পেয়ে গেছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো মহামারি সৃষ্টিকারী করোনা প্রতিরোধে কেবল সতর্কতাই কি একমাত্র অস্ত্র? চিকিৎসাবিজ্ঞান কি অসহায় আত্মসমর্পন করবে কোভিড-১৯ এর কাছে? এখানেই কোভিড-১৯-এর চ্যালেঞ্জ গ্রহন করে করোনার বিরুদ্ধে যুদ্ধে প্রথমার্ধে এগিয়ে রয়েছে লাতিন আমেরিকার দেশ কিউবা। সম্প্রতি এরকমই দাবি ক’রে কিউবার কমিউনিস্ট পার্টির মুখপত্র ‘গ্রানমা’ দাবি করেছে যে, করোনা প্রতিরোধের বাণ কিউবা নির্মানভ ক’রে ফেলেছে; এবার কেবল ছোঁড়ার অপেক্ষা।   

চীনের উহান প্রদেশে যখন করোনা সংক্রমণ শুরু হয়েছিল তখন থেকেই শোনা যাচ্ছিল এই ভাইরাসটি সংক্রমণের কোনো এন্টিভাইরাস বা প্রতিকার নেই, গ্রহণ করা যেতে পারে কিছু সতর্কতামূলক পদক্ষেপ। মানুষের সংস্পর্শে দ্রুত ছড়ায় এই ভাইরাস। সেজন্যই চীনে গ্রহণ করা হয়েছিল আইসোলেশন থেকে কোয়ারান্টিনের মত পদক্ষেপ— চীনে কর্মরত ও ভ্রমণরত বিদেশীদের আঁটকে রাখা হয়েছিল, যাতে গোটা বিশ্বে করোনা ছড়ানো প্রতিহত করা যায়। প্রায় মাস-দেড়েকের চেষ্টায় চীনে যখন করোনা আয়ত্তে এলো, তখন করোনা বিশ্বজনীন চেহারা লাভ করেছে। বিশ্বজুড়ে একের পর এক দেশে লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে এই রোগে আক্রান্তের সংখ্যা, যাদের মধ্যে সবথেকে সংকটে ইরান, স্পেন ও ইতালি। ইতালিতে আক্রান্তের সংখ্যা কম হলেও মৃত্যুর হারে তা চীনকে ছাড়িয়ে গেছে।  

মারণ করোনার রক্তচক্ষুকে শান্ত করার উদ্দেশ্যে বায়োকিউবা ফার্মার ডিরেক্টর ড. এডুয়ার্ডো মার্তিনেজ দিয়াজ জানিয়েছেন যে, করোনা প্রতিরোধে ইন্টারফেরন নামে এক ড্রাগ তৈরি করে ফেলেছে কিউবা, যা এখন ব্যবহারের জন্য প্রস্তুত। আরেকদিকে, কিউবার সিআইজিবি-এর ডিরেক্টর জেনেরাল ড. ইউলোগিও পিমেন্টাল ভাসকুয়েজ জানিয়েছেন যে, কিউবার হাতে এখন পর্যাপ্ত পরিমাণেই এই ড্রাগ রয়েছে, যা দ্বারা চীনে যতজন রোগী করোনা আক্রান্ত হয়েছিলেন তার প্রায় সমান সংখ্যক করোনা আক্রান্তের চিকিৎসা করা সম্ভব।

কমরেড ফিদেল্ কাস্ত্রোর আমল থেকেই কিউবার গণ-চিকিৎসা পরিসেবা প্রায় কিংবদন্তীর পর্যায়ে পৌঁছেছে। ক্যান্সারের গবেষণা থেকে বর্তমানে কোভিড-১৯— চিকিৎসার যে ক্ষেত্রেই কিউবা হাত দিয়েছে, সোনা ফলেছে সেখানেই। ন্যুনতম মূল্যে জনসাধারণকে চিকিৎসা পরিসেবা প্রদানে কিউবা আজ বিশ্বে শীর্ষস্থানীয় নাম। আর এই করোনা বিপর্যয়ের সময় নিজেদের উন্নত চিকিৎসা-ব্যবস্থার সুফল কিউবা কেবল নিজের দেশের নাগরিকদের জন্যই আটকে রাখেনি। ব্রিটিশ ক্রুজ জাহাজ এম.এস. ব্রায়েমারের কয়েকজন যাত্রীর শরীরে যখন করোনা সংক্রমণ ধরা পড়ে, তখন আটলান্টিকের বিভিন্ন দেশ-সহ ব্রিটিশ দ্বীপপুঞ্জের ব্রিটিশ যুক্তরাজ্য এবং উত্তর আয়ারল্যান্ড, সবাই-ই জাহাজটিকে নিজেদের দেশে নোঙর করাতে এবং যাত্রীদের চিকিৎসার দায়িত্ব নিতে অস্বীকার করে। ১৩-ই মার্চ থেকে বিভিন্ন দেশে নোঙর প্রত্যাশী জাহাজটির আক্রান্ত যাত্রীদের শারীরিক অবস্থার অবনতি হতে থাকলে, কিউবা তাদের আবেদনে সাড়া দিয়ে কিউবার উপকূলে নোঙর করার অনুমতি দেয়। কিউবার প্রেস কমিউনিকেশন বিভাগের ডিরেক্টর জেনেরাল আন্তোনিও ফেরনান্দেজ প্যালেসিয়াস জানান, “১৮ই মার্চে কিউবার ম্যারিয়েল বন্দরে ওলসেন লাইন ধ’রে এসে এম.এস. ব্রায়েমারকে নোঙরের অনুমতি দেওয়া হয়েছে, এবং আক্রান্ত যাত্রীদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়েছে।” এর সাথে কিউবা আরো জানিয়েছে তাদের চিকিৎসা শেষ ক’রে, যত শীঘ্র সম্ভব যাত্রীদের নিজের দেশে পাঠিয়ে দেবে কিউবা প্রশাসন।  

করোনার প্রতিষেধক নিয়ে গবেষণায় কিউবার এহেন সাফল্যের নেপথ্যে কী? কিউবার জেনেরিক ইঞ্জিনিয়ারিং এন্ড বায়োটেকনলজির সূত্রে জানা গেছে যে, এর আগেও যখন ২০০২ সালে সার্স এবং ২০১২-তে মার্স নামে দুটি ভাইরাস ছড়িয়ে পড়েছিল, তখনও ইন্টারফেরন ড্রাগটি ব্যবহার করা হয়েছিল এগুলোর মোকাবিলায়। চীনের উহানে করোনা ছড়িয়ে পড়ার পর থেকেই, কিউবার চিকিৎসা-বিজ্ঞানীরা চীনের সাথে যৌথভাবে চীনের জিলিন শহরে ইন্টারফেরন নিয়ে গবেষণা শুরু করেন। ইন্টারফেরনের কার্যকারিতা প্রসঙ্গে কিউবার জেনেরিক ইঞ্জিনিয়ারিং এন্ড বায়োটেকনলজির ডেপুটি ডিরেক্টর মার্তা আয়ালা আভিলা জানিয়েছেন, কিউবার জনস্বাস্থ্য মন্ত্রকের (মিনস্যাপ) সবুজ সংকেতের অপেক্ষায় থাকা ইন্টারফেরন, করোনা সংক্রমণের প্রাথমিক পর্বের প্রতিরোধে ইতিমধ্যেই ব্যবহৃত হচ্ছে । একইসাথে এর কার্যকারিতা বাড়ানোর গবেষনা চালাচ্ছেন বিজ্ঞানীরা।

যাদের সাথে যৌথ অভিযানে কিউবার এই সাফল্য, সেই চীনে করোনা পরিস্থিতি এখনো অনেকটাই আয়ত্তে। সেজন্য করোনা বিধ্বস্ত চীন তাদের পরিকাঠামো দিয়ে সাহায্য করছে ইতালি ও ইরানকে। একইসাথে চীনের উহান বিশ্ববিদ্যালয়ের তত্ত্বাবধানে, করোনা মোকাবিলায় ফ্যাভিপিরাভি ড্রাগ নামে আরো একটি ড্রাগ তৈরি সম্ভব হয়েছে ব’লে উহান বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে। পরীক্ষামূলক ভাবে চীনে আক্রান্তদের উপর তা প্রয়োগ করারও প্রক্রিয়া চলছে।

জনঘনত্বের কারনেই করোনা নিয়ে ভারতের চিন্তার কারণ প্রথম বিশ্বের দেশগুলির থেকে অনেকটাই বেশী। ঢাক-ঢোল পিটিয়ে মহামারী করোনা প্রতিরোধে হরেক কিসিমের ব্যবস্থা ভারতের স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রক নিয়েছে। মোবাইল ফোনের কলার টিউনের সতর্কবানী থেকে দেশের শাসক রাজনৈতিক দলের নেতা-নেত্রীদের বিভিন্ন টোটকা। কিউবা যখন করোনা মোকাবিলায় প্রতিষেধক তৈরি করে ফেলেছে তখন দেশের শাসক দলের নেতারা সাংবাদিক সম্মেলনে বসে বলছেন গোমূত্রে করোনা প্রতিরোধ সম্ভব। আবার কেউ একধাপ এগিয়ে ভাইরাসের সাইজ বড় বলে মাস্কের বিকল্প হিসেবে ‘শুদ্ধ’ কাপড় কেটে মাস্ক বানানোর পরামর্শ দিয়েছেন। করোনার মোকাবিলায় প্রায় জরুরী অবস্থা জারী হবার উপক্রম, সেখানে নিয়মের ফাঁক গ’লে প্রভাবশালী এক আমলার ছেলে করোনা সংক্রমণের লক্ষণ থাকা সত্ত্বেও ‘মহামারী আইন’-কে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে সারা শহর ঘুরে বেড়ান। অবশ্য যেখানে দেশের প্রধানমন্ত্রী করোনা প্রতিরোধে ঘন্টা বাজাতে এবং আমাদের রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী কনুই দিয়ে মুখ ঢাকতে বলেন, সেখানে রাজ্য বা কেন্দ্রের সরকারের মন্ত্রী বা আমলাদের অন্যায় কোথায়! হবুচন্দ্র রাজার গোবুচন্দ্র মন্ত্রীই তো হয়ে থাকে। তবে ভরসা একটাই, বৈজ্ঞানিকরা বলছেন ভারতে দূষণের কারণে প্রথম বিশ্বের দেশগুলির তুলনায় ভারতীয়দের রোগ-প্রতিরোধ ক্ষমতা কিছু হলেও বেশী। কিন্তু প্রকোপ যদি বাড়তে থাকে, তবে বেহালস্য বেহাল স্বাস্থ্য পরিকাঠামো দিয়ে তার প্রতিকার করা হয়ে উঠবে কঠিনতর; পরিস্থিতি হাতের বাইরে যেতে সময় লাগবে না বিশেষ।     

Similar Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *