কোনোদিন রঞ্জি ট্রফিতে সাদা পোশাকে ব্যাট হাতে নেমে পরতেন, আবার পরেরদিনই হাফপ্যান্ট পরে ফুটবল মাঠে। কেবল ক্রিকেট আর ফুটবলেই থেমে থাকেননি, টেনিসে হকিতেও তিনি ছিলেন সাবলীল। কলকাতা ময়দানের শো-কেজে রয়েছে তাঁর পায়ের জাদুতে তৈরী করা অসংখ্য ক্যানভাস। ক্রিকেটেও তিনি সমান ভাবে ভাস্বর। দু’দশকের ফুটবল জীবনের পাশাপাশি বাংলার হয়ে প্রায় দশবছর ক্রিকেট খেলেন রীতিমতো পেশাদারিত্বের সাথে। বার্ধ্যক্যজনিত রোগের কারণে আজ বিকেলে প্রয়াত হলেন কিংবদন্তী চুনী গোস্বামী।

 তাঁর পোশাকি নাম ছিল সুবিমল কিন্তু ভারত তথা বিশ্বের সমস্ত ক্রীড়ামোদি মানুষের কাছে তিনি ছিলেন চুনী গোস্বামী। ভারতীয় ফুটবলের ইতিহাসে কিংবদন্তী চুনী-পিকে-বলরামের অবদান অম্লান ও স্বমহিমায় ভাস্বর। ভারতীয় ফুটবলের ইতিহাসে এতাবৎ শ্রেষ্ঠ কৃতিত্ব অর্জন করা (১৯৫৬-এর মেলবোর্ন অলিম্পিকে তৃতীয় হওয়া) ভারতীয় ফুটবল দলের মধ্যমণি ছিলেন চুনী গোস্বামী, প্রদীপ বন্দ্যোপাধ্যায় ও তুলসীদাস বলরাম।

(বাম দিক থেকে) চুনী গোস্বামী, পিকে ব্যানার্জী, তুলসীদাস বলরাম

চুনী গোস্বামীর জন্ম ১৯৩৮ সালে তৎকালীন অবিভক্ত বাংলার কিশোরগঞ্জে। কলকাতা ময়দানে মোহনবাগান-ইস্টবেঙ্গলের ঘটি-বাঙাল দ্বন্দ্ব বিশ্বশ্রুত। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় চুনী গোস্বামী নিজে বাঙাল হয়েও আজীবন খেলেছেন মোহনবাগানে। ২০ বছরের কেরিয়ারে তিনি এবং মোহনবাগান জার্সি ছিল সমার্থক। ফুটবলে তাঁর আত্মপ্রকাশ হয় মোহনবাগানের বয়সভিত্তিক  দলে ১৯৪৬ সালে। প্রায় ১০ বছর বয়সভিত্তিক দলে তিনি খেলার পর প্রধান দলে তিনি আত্মপ্রকাশ করেন ১৯৪৬ সালে। ১৯৬০-’৬৪ পর্যন্ত ছিলেন মোহনবাগান অধিনায়ক।

আন্তর্জাতিক কেরিয়ারেও তিনি সমান উজ্জ্বল। ফিফা তাকে এশিয়ার সেরা স্ট্রাইকার খেতাব দেয় ১৯৬২-তে। ১৯৫৬-’৬৪ পর্যন্ত ভারতীয় দলের জার্সি গায়ে তিনি ৪৩ টি গোল করেছেন। ভারতীয় ফুটবলের সমকালীন অন্য দুই মহারথীর (পিকে ও বলরাম)কিছুদিন পরে ভারতীয় দলের হয়ে অভিষেক হয় চুনীর। আর আবির্ভাবের অপরাপর পরেই হিট হয়ে যান ত্রয়ী- সৌজন্যে মেলবোর্ন অলিম্পিক ১৯৫৬। ১৯৬৩-এর এশিয়াডে সোনাজয়ী দলের সদস্য ছিলেন চুনী।  

চুনী গোস্বামী ছিলেন মোহনবাগান অন্ত প্রাণ, আজ যখন ইউরোপের তৃতীয় বা চতুর্থ ডিভিশনের কোনো ক্লাব থেকে এক-আধজন খেলোয়াড় ট্রায়ালের ডাক পেলে দৌড়োন তখন কেরিয়ারের মধ্যগগণে থাকার সময় ইংল্যাণ্ডের টটেনহ্যাম হটস্পারের মতো ক্লাব থেকে ডাক পেয়েও ফিরিয়ে দিয়েছিলেন চুনী গোস্বামী।

পেলের সাথে চুনী গোস্বামী

শুধুমাত্র শখের ক্রিকেট খেলতেন না চুনী, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইউনিভার্সিটি ব্লু ছিলেন ফুটবল, ক্রিকেট ও টেনিসে। রঞ্জি ট্রফিতে বাংলার হয়ে খেলেন ৪৬টি ম্যাচ খেলে ১,৫৯২  রান এবং ৪৭টি উইকেট্ পেয়েছিলেন তিনি। ডান হাতি ব্যাটসম্যান এবং মিডিয়াম পেসার চুনী ক্রিকেটে ছিলেন অলরাউন্ডার।

চুণি গোস্বামী তার ফুটবল জীবনের ইতি করেন ১৯৬৮-তে । অবসরের পর ১৯৮৬ থেকে ১৯৮৯ পর্যন্ত ফুটবল অ্যাকাডেমির টেকনিকাল ডিরেক্টর ছিলেন তিনি। টাটা একাডেমি একসময় প্রায় ভারতীয় ফুটবলের সাপ্লাই লাইনে পরিণত হয়েছিল । জাতীয় দলের ম্যানেজার হয়েছিলেন এক বছরের জন্য (১৯৯১- ‘৯২)।

ফুটবলার হিসেবে একের পর কৃতিত্বের জন্য তিনি ১৯৬৩ সালে পেয়েছেন অর্জুন পুরস্কার। খেলোয়াড় জীবনের অসামান্য অবদানের জন্য ১৯৮৩-তে পদ্মশ্রী খেতাব পান চুনী।২০০৫-এ তাঁর প্রিয় ক্লাব তাকে দেয় মোহনবাগান রত্ন।  কলকাতা পৌরসংস্থার সাম্মানিক ‘শেরিফ’ও হয়েছিলেন তিনি।

আজীবন চুনী ছিলেন খেলা অন্ত প্রাণ। মোহনবাগানের হয়ে হকি স্টিক হাতেও নামতে দেখা গেছিল তাকে।  ক্রীড়া বিশ্লেষকের ভূমিকাতেও দেখা গেছে তাকে। সাউথ্ ক্লাবে টেনিস খেলতেন অবসরে। শুধুমাত্র সবুজ মাঠেই নয় , রুপোলি পর্দাতেও তিনি ছিলেন স্বচ্ছন্দ্য। ‘প্রথম প্রেম’ নামে একটি ছবিতে অভিনয় করেছিলেন ।

আজ ভারতীয় ফুটবল কর্পোরেটদের হাত ধরে ক্রিকেটের মতো ফুটবলকে গ্ল্যামারাস করে তোলার দিবাস্বপ্নে মগ্ন। ক্রিকেট থেকে ফুটবল সবেতেই এসেছে চাকচিক্য কিন্তু একদা স্পনসর বিহীনদল নিয়ে স্রেফ ফুটবলের উৎকর্ষতার গুণে বছরের পর বছর মোহনবাগান জার্সি গায়ে ম,আঠ ভরিয়েছেন হাসিয়েছেন কাঁদিয়েছেন চুনী গোস্বামী। আই.এস.এল-এর নিয়ে কিছু ব্যাতিক্রমী মানুষ ছাড়া আজ গোটা ভারতীয় ফুটবলই আই.এম.জির কাছে আত্মসমর্পনে ব্যাস্ত। আর একধাপ এগিয়ে চুনীর প্রিয় ক্লাব মোহনবাগান তো প্রায় মাথা মুন্ডন করে বসেছে এটিকের কাছে। কিন্তু আই.এফ.এ-এ.আই.এফ.এফ বাবুরা তো বুঝবেন না যে ‘স্পনসরশিপের গল্প ছড়িয়ে কি ফুটবলার তৈরি করা যায় না।’

Similar Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *