২০১৪-তে দিল্লীর গদিতে বসার পর থেকেই রাষ্ট্রায়ত্ত্ব সংস্থাগুলির বেসরকারিকরণ এবং বেশ কিছু ক্ষেত্রে বিলুপ্তিকরণের পথে সবেগে ছুটছে মোদী সরকার। কেন্দ্রে ক্ষমতায় আসার প্রায় প্রথম লগ্ন থেকেই তার এক ব্যপক প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে কর্পোরেটদের অন্নপুষ্ট ভারতীয় জনতা পার্টি। দ্বিতীয়বার ক্ষমতায় আসার পর তা যেন চরম গতি ও উগ্রমাত্রা ধারণ করেছে। আর তাতে অনুঘটকের কাজ করেছে ভারতবর্ষের উদীয়মান অর্থনৈতিক সংকট।

বেসরকারীকরনের খাঁড়া যে সব রাষ্ট্রায়াত্ত্ব সংস্থাগুলির উপর আসতে চলেছে সেই সারিতে একেবারে প্রথম দিকেই আসে ভারত সরকার অধিগৃহীত টেলিকম সংস্থা বিএসএনএল (ভারত সঞ্চার নিগম লিমিটেড)। ২০১৯ এর লোকসভা নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার আগে থেকেই ৪৫টি সরকারি ও আধাসরকারি সংস্থার বেসরকারিকরণের যে গুঞ্জন শোনা যাচ্ছিল তার মধ্যে বিএসএনএল একটি। সরকারিভাবে কোনো ঘোষণা না হলেও এই খবর ছড়িয়ে পড়ে সরকারি দপ্তরের ভেতর থেকেই।

২০১২-২০১৩ আর্থিক বছরে বিএসএনএল  এর আয় হয় ২৭,১২৮ কোটি টাকা, যেখানে ব্যয়ের অঙ্ক ছিল ৩৪,৯০০ কোটি। ২০১৩- ২০১৪ আর্থিক বছরে আয় ও ব্যয়ের হিসেব ছিল যথাক্রমে ২৮,৩২৫ ও ৩৫,৩৮০ কোটি। অর্থাৎ, পরপর ৭,৮৮৪ ও ৭,০৮৪ কোটি টাকার ক্ষতির সম্মুখীন  হতে হয় বিএসএনএল-কে। বাড়ন্ত প্রতিযোগিতার বাজারে এবং ৩জি পরিষেবা লাগু হওয়ার ক্ষেত্রে কিছুটা পিছিয়ে থাকায় এই ক্ষতি যে সংস্থার কাছে একেবারেই অপ্রত্যাশিত ছিল, তা নয়। কিন্তু একাধিক রাষ্ট্রায়ত্ত ও বেসরকারি ব্যাঙ্ক থেকে প্রাপ্ত ঋণ এবং বিএসএনএল-এর নিজস্ব জমা পুঁজির প্রায় ৭৮% ব্যয় করার ফলে সেই ক্ষতিকে কিছুটা সামাল দিতে সক্ষম হয় কোম্পানি। তবে এখান থেকেই পরবর্তী সংকটের মেঘ ঘনাতে শুরু করে। তবে সেই সংকটের মুখে দাঁড়িয়েও ২০১৫-২০১৬ আর্থিক বছরে লক্ষ্যায়িত আয় (targeted revenue) এবং বাস্তবায়িত আয়ের (realised revenue) ভারসাম্য বজায় রাখতে সক্ষম হয় বিএসএনএল (১৫,১৩৩.৪৮ কোটি)। যদিও এই আর্থিক বছরেও ব্যয়ের অংক ছিল প্রায় ১৯৯৯২.৫ কোটি, ফলে প্রায় ৪৮৫৯ কোটি টাকার ক্ষতি আছড়ে পড়ে।

ফাটকা কারবারের এই জমানায় ক্ষতির হিসেবের পাশাপাশি লক্ষ্যায়িত আয় ও বাস্তবায়িত আয়ের অনুপাতে নজর দেওয়াটা অনেক বেশি গুরুত্বপুর্ণ, কারণ তার ভিত্তিতেই আর্থিক ফাঁপর এবং অন্যান্য অর্থনৈতিক সম্পর্কগুলি নির্ধারিত হয়। একনজরে সেই হিসেব দেখে নেওয়া যাক।

সুতরাং, দেখা যাচ্ছে, লক্ষ্য আয় এবং বাস্তবায়িত আয়ের অন্তর ক্ষতির খাদের গভীরতা বাড়িয়েছে বছর বছর। সেই খাদেই আছড়ে পড়েছে সংস্থার ভবিষ্যৎ, যা থেকে রেহাই পেতে কর্পোরেটি দানব মুকেশ অম্বানীর সংস্থা রিলায়েন্স জিও-র হাতে নিজের রসদ (resource), টাওয়ার, বাজার- সমস্তকিছু তুলে দেওয়ার পাশাপাশি একের পর এক কর্মীস্বার্থবিরোধী পদক্ষেপ নিয়ে চলেছে বিএসএনএল ।

বিপুল ক্ষতি সামাল দিতে ২০১৪ থেকেই বিভিন্ন সংস্থাকে নিজেদের টাওয়ার ভাড়া দিতে থাকে বিএসএনএল । ২০১৯-এ এসে তা ব্যপক রূপ নেয়। বিএসএনএল  ৪০০০টি টাওয়ার (গ্রাউন্ড টাওয়ার মাসিক ৩৮,০০০ টাকায় এবং ছাদ টাওয়ার মাসিক ২৪,৯০০ টাকায়) রিলায়েন্স জিও-কে ভাড়া দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় এর সাথে বিশেষ শর্তে বিশেষ ছাড়ও ঘোষণা করে। বিএসএনএল  পরিচালক অনুপম শ্রীবাস্তব বলেন, “রিলায়েন্স জিও প্রথম বছরে ১,৫০০ টি টাওয়ার লিজ নিলে গ্রাউন্ড টাওয়ারের জন্য প্রতি মাসে ৩৫,০০০ টাকা এবং ছাদ টাওয়ারের জন্য প্রতি মাসে ২১,০০০ টাকা ভাড়া বরাদ্দ হবে।”

অন্যদিকে এই বিপুল ক্ষতির ফলে বলির পাঁঠা হতে হচ্ছে কর্মীদের, বিএসএনএল-এর কর্মীদের বেতন বাবদ বরাদ্দ সংস্থার মোট আয়ের ৭৫.০৬ শতাংশ। আয়ের পরিমাণ কমে যাওয়ায় তাই কর্মীদের বেতন দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রায় গত পাঁচ বছর থেকে ধারাবাহিকভাবে ক্রমবর্ধমান সমস্যা চলছে। এমনকি কর্মীসংখ্যা কমানোর জন্যে কর্মীদের অবসরের বয়স কমিয়ে ৫০ করারও পরিকল্পনা হয়েছিল। কিন্তু, নির্বাচনের মুখে একটি সরকার অধিগৃহীত সংস্থার এমন সিদ্ধান্ত ভোটবাক্সে ক্ষতিকর প্রভাব ফেলতে পারে, এই আশঙ্কাতেই সেই সিদ্ধান্ত কার্যকর করা হয়নি। এই সিদ্ধান্ত গৃহীত হলে প্রায় ৫৪,০০০ কর্মী রাতারাতি কর্মহীন হতেন।

এই সিদ্ধান্ত লাগু না হলেও, বেতনের সমস্যার ফলে দীর্ঘদিন ধরে রীতিমতো অনিশ্চিত জীবনযাপন করছেন প্রায় ১.৭৫ লক্ষ কর্মী। বেতনে বিলম্বের জেরে বহুবার আন্দোলন-ধর্না তথা ধর্মঘটে সামিল হয়েছেন কর্মীরা। তবে গত এক বছরে এই বিলম্ব চরম মাত্রায় পৌঁছোয় এবং এমনকি গত জুন মাসের বেতন দিতে অপারগ বলে ঘোষণা করে সংস্থা। কার্যত তার জেরেই সারা দেশজুড়ে বিএসএনএল-এর কর্মীরা সংস্থার ভেতরে এবং কোথাও কোথাও বাইরে লাগাতার আন্দোলন-ধর্না শুরু করেন। গত ১৬ই জুলাই ভারতব্যাপী বিএসএনএল-এর কর্মীরা ধর্নায় অংশ নেন।

এই অচলাবস্থা কাটাতে নুন্যতম ১২,০০০ কোটি টাকার ঋণ প্রয়োজন বলে জানায় বিএসএনএল কর্তৃপক্ষ এবং বিভিন্ন রাষ্ট্রায়ত্ত ও বেসরকারি ব্যাংকের কাছে ঋণের আবেদনও জানায়, কিন্তু কোনো ব্যাংকই ঋণ দিতে রাজি হয়নি।

কেন এই পরিস্থিতি? আজ ৫জি-তে পা দিতে চলা নেটওয়ার্কিং ব্যবস্থায় বেসরকারি সংস্থার হাতে উৎপাদনের উৎস থেকে শুরু করে বাজার অবধি সমস্তটা তুলে দেওয়াই কি আসলে কেন্দ্র সরকারের মূল উদ্দেশ্য ? তাই প্রতি বছরের বার্ষিক আর্থিক খতিয়ানে এই বিপুল ক্ষতির উল্লেখ থাকলেও তাকে পূরণ করার ন্যুনতম চেষ্টাও করেনি সরকার। একটি সরকারি প্রতিষ্ঠান এবং টেলিকম বিভাগের একমাত্র সরকারি প্রতিষ্ঠান এমন অর্থসংকটে ভুগছে যার ঋণের পরিমাণ গত দশ বছরে মোট প্রায় ৯০০০০ কোটি, তার জন্য বরাদ্দ করা হয় গড়ে মোট বাজেটের মাত্র ১.৭৫%। ক্ষতির অজুহাতে বেতনে বিলম্ব ও বেতন বৃদ্ধির হার কমাতে কমাতে কর্মীদেরকে কর্মীদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত করে ফেলা এবং একই সাথে সংস্থার ক্ষতি মোকাবিলার অজুহাতে টাওয়ার অন্য টেলিকম সংস্থাকে লিজ দেওয়ার মাধ্যমে পরিষেবার মানকে তলানীতে নিয়ে এসেছে সরকার ও সংস্থার মাথায় বসে থাকে শিরোমণিরা।

স্বাভাবিকভাবেই বাজারের সবচেয়ে সস্তা টেলিকম পরিষেবাকে ছেড়ে অপেক্ষাকৃত অনেক বেশি দামী বেসরকারি পরিষেবা গ্রহণে বাধ্য হচ্ছে উপভোক্তামহল। রিলায়েন্স জিও-র আগমনের পর বিএসএনএল থেকে কার্যত দু’হাত তুলে নিয়ে আম্বানির মুনাফার পাহাড়ের ওপর ব্র্যান্ড আম্বাস্যাডরের গদিতে নিজের আসীন করেছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী। এমনকি ১৬ তারিখের ধর্নার পর অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারমন ও যোগাযোগমন্ত্রী রবিশংকর প্রসাদ বিএসএনএল-এর আধিকারিকদের সাথে বৈঠক করে সংস্থার জন্য মাত্র ২,৫০০ কোটি টাকার ঋণের আর্জি জানান ব্যাঙ্কগুলির কাছে। একটি সরকারি সংস্থা যা গত দশ বছরে কিনা মোট ৯০,০০০কোটি টাকার ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে এবং বিপুল অর্থসংকটে ধুঁকছে, তার জন্যে সরকারের মন্ত্রী মাত্র ২,৫০০ কোটি টাকা ঋণের আবেদন করে। এ থেকেই কেন্দ্র-সরকারের উদ্দেশ্য সম্পর্কে সন্দিহান হতে হয়য় সে আদৌ একমাত্র সরকারী টেলিকম সংস্থাকে টিকিয়ে রাখতে আদতে কতটা আগ্রহী। সংস্থার কর্মীদের প্রতি তাদের যে নুন্যতম দায়বদ্ধতাও নেই এই সিদ্ধান্তই তা স্পষ্ট করে।

সরকারের এহেন ঔদাসিন্য শুধু টেলিকম ক্ষেত্রে নয়, শিক্ষা-স্বাস্থ্য-যাতায়াত থেকে শুরু করে সমস্ত প্রাকৃতিক ও কৃত্রিম পরিষেবার উৎস ও বাজার থেকে সরকারি নিয়ন্ত্রণ ও দায়বদ্ধতা একেবারে অবলুপ্ত করে ব্যক্তিমালিকানাধীন ও কর্পোরেটি হাঙরদের হাতে তুলে দিতে কেন্দ্রের বিজেপি সরকার উদগ্রিব। সমস্ত সরকারি পরিষেবার মানকে দিনের পর দিন কদর্যতম করে তুলছে কেন্দ্র-রাজ্যগুলিতে আসীন প্রতিটি সরকার। বেসরকারিকরণের নীতিগুলিকে ঢেকে রাখতে সরকার লাভক্ষতির কিছু জটিল অঙ্ককে তুলে ধরছে সাধারণ মানুষের সামনে। অথচ একটি রাষ্ট্রায়াত্ত্ব সংস্থার ভালোমন্দের দায় বর্তায় সম্পূর্ণভাবে সরকারের ওপর, কিন্তু অবস্থা পুনরুদ্ধারে কোনোরকম কোনো ব্যবস্থা গ্রহণেই অনীহা দেখাচ্ছে নরেন্দ্র মোদীর সরকার। প্রতিটি ক্ষেত্রে এই একই অবস্থা বহাল রয়েছে এবং ভোটবাজ প্রতিটি রাজনৈতিক দল এই নীতির বিষয়ে মৌনব্রত পালন করে চলেছে বছরের পর বছর।

এমতাবস্থায় বেসরকারিকরণের এই নীতির বিরুদ্ধে এক সোচ্চার না হলে অচিরেই বিএসএনএলের মতো আরো রাষ্ট্রায়াত্ত্ব সংস্থাগুলি চোখের নিমেষে চলে যেতে থাকবে কর্পোরেটি হাঙরদের গ্রাসে। পশ্চিমবঙ্গের বেঙ্গল কেমিক্যাল বিক্রির সিদ্ধান্ত এর সর্বশেষতম উদাহরণ। .

Similar Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *