১৯১৯ সালে ‘রাউলপিন্ডি’ সন্ধির মাধ্যমে আফগানিস্তান ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ছায়া থেকে বেরিয়ে এসে রাজা আমানুল্লাহ খানের নেতৃত্বে একটি স্বাধীন দেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। এই নতুন যুগে অনেক সংস্কারের পথে হাঁটতে থাকে এই দেশ। যেমন- ‘বোর্খা’ পড়ার ধর্মীয় নির্দেশ তুলে নেওয়া হয়, সংবিধানে মহিলাদের সমানাধিকার স্বীকৃতি লাভ করে, প্রাথমিক শিক্ষাও বাধ্যতামূলক করে দেওয়া হয়। ১৯৭৩ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মহম্মদ দাউদ খান রাজা জাহির শাহকে সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতাচ্যুত করে নিজেকে দেশের রাষ্ট্রপতি হিসেবে ঘোষণা করেন। ঠাণ্ডা যুদ্ধের আবহে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত রাশিয়া- উভয় দেশই আফগানিস্তানের ভৌগোলিক গুরুত্বের কথা মাথায় রেখে আর্থিক অনুদানের মাধ্যমে দেশটির রাজনীতি নিজেদের পরিসরে নিয়ে আসার চেষ্টা করতে থাকে। আফগানিস্তান সমস্ত দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার প্রবেশদ্বার এবং একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য সড়ক। মার্কিনীরা শুরু থেকেই তেমন সুবিধা করে উঠতে পারেনি কিন্তু দাউদ প্রথমদিকে সোভিয়েতের দিকে হেলে থাকলেও পরবর্তীকালে স্বাধীনভাবেই নবগঠিত রাষ্ট্রের পরিচালনা করার চেষ্টা করেন। রাজতন্ত্র অবসানের ৫ বছর পর অর্থাৎ ১৯৭৮ সালে সোভিয়েত মদতে বলীয়ান হয়ে বামপন্থী ‘পিপলস ডেমোক্র্যাটিক পার্টি অফ আফগানিস্তান’ দাউদকে ক্ষমতাচ্যুত করে গণপ্রজাতান্ত্রিক আফগানিস্তানের সূচনা করে। দেশের এই রাজনৈতিক পরিবর্তনকে ‘সাউর বিপ্লব’ নামে অবিহিত করা হয়। ‘পিপলস ডেমোক্র্যাটিক পার্টি অফ আফগানিস্তান’-এর মধ্যে ‘খাল্কি’ (জনগণ) ও ‘পর্ছমি’ (পতাকা) গোষ্ঠীর প্রভাব ছিল সবচেয়ে বেশি। আদিবাসীরা মূলত ‘খাল্কি’ গোষ্ঠীভুক্ত ছিল এবং শহুরে মধ্যবিত্তরা ‘পর্ছমি’ গোষ্ঠীর নেতৃত্বে ছিল। ‘সাউর বিপ্লব’ পরবর্তী আফগানিস্তানে ‘খাল্কি’ গোষ্ঠীর নেতা নূর মহম্মদ তারিকি রাষ্ট্রপতি পদে অভিষিক্ত হন। শুরু হয় দেশের সংবিধানে নতুন কিছু সংস্কার অন্তর্ভুক্তির কাজ। রাষ্ট্রের বিধর্মীকরণের সঙ্গে সঙ্গে মহিলাদের অধিকারের প্রশ্নেও বেশ কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হয়। ফলে বোঝাই যাচ্ছে যে ঐতিহাসিকভাবেই আফগানিস্তানের প্রগতিশীলতার পথে হাঁটার অভ্যাস রয়েছে। ‘খাল্কি’-রা লেনিনবাদী পথ অনুসরণ করে দেশে সর্বহারার একনায়কতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পক্ষে সওয়াল করতে থাকে। অন্যদিকে ‘পর্ছমি’-রা মনে করে দেশে আগে সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক মঞ্চ প্রতিষ্ঠা করা দরকার সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের ভিত শক্ত করার জন্য। ফলে শুরু হয় ‘খাল্কি’-‘পর্ছমি’ গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব। ‘পর্ছমি’-দের যুদ্ধে পরাজিত করে নরমপন্থী তারিকিকে ক্ষমতাচ্যুত করে আরেক ‘খাল্কি’ নেতা হাফিজুল্লাহ আমিন রাষ্ট্রপতি ঘোষিত হন। সোভিয়েত রাশিয়ার আমিন বিরোধী অবস্থানের ফলে আমিনকে শীঘ্রই সরে দাঁড়াতে হয়। ‘পর্ছমি’ নেতা বাব্রাক কর্মল ক্ষমতায় আসেন। ১৯৭৯ সাল থেকেই সৌদি আরবের আর্থিক অনুদান এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সি.আই.এ ও পাকিস্তানের আই.এস.আই-এর মদতে (অপারেশান ‘সাইক্লোন’) বলীয়ান হয়ে কট্টর ইসলামপন্থী জঙ্গি গোষ্ঠী ‘মুজাহিদিন’ বামপন্থী সরকারের বিরুদ্ধে লড়াই করতে থাকে। শুরু হয় যুদ্ধ যা ১৯৯২ সাল অবধি চলতে থাকে। ১৯৭৯ সালে রুশ নেতা ব্রেজনেভের নির্দেশে সোভিয়েতের লাল ফৌজ আফগানিস্তানের যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়।১৯৮৪ সালে সৌদি ব্যবসায়ী ওসামা বিন লাদেন ‘মাক্তাব আল খিদমত’ নামে একটি চিট ফান্ডের প্রতিষ্ঠা করেন যার মাধ্যমে আফগানিস্তানে টাকা পাঠানো শুরু হয় কিন্তু এই যুদ্ধে সৌদি সৈন্যের অধিকারের প্রশ্নে তাঁর কট্টরপন্থী মনোভাব তাঁকে ‘আল কায়েদা’ (ভিত্তিপ্রস্তর) সৃষ্টি করতে বাধ্য করে। ১৯৯০ সালে ইরাক কুয়েত আক্রমণ করলে সৌদি আরব মার্কিন সৈন্যের আহ্বান করে। তথাকথিত কাফের সেনার পদার্পণ জিহাদীরা কট্টরভাবে বিরোধিতা করতে থাকে। লাদেনের সংগঠন এর প্রতিবাদে আরব দেশে সন্ত্রাসবাদী হামলা চালাতে শুরু করে। মুজাহিদিনের কাছে বারংবার পরাজিত হয়ে ১৯৮৯ সালে সোভিয়েতের ফৌজ পিছু হঠতে বাধ্য হয়। সূচিত হয় ইসলামী রাজনীতির যুগ। আরব দেশগুলির ইসলাম বিচ্যুতির জন্য দায়ী করা হয় মার্কিনীদের। ব্যুমেরাং হয়ে যায় ওয়াশিংটনের কূটনৈতিক পদক্ষেপগুলি। জিহাদীদের মার্কিন বিদ্বেষ ২০০১ সালে আল-কায়েদার মদতে ১১ই সেপ্টেম্বর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ‘ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার’ ও ‘পেন্টাগন’-এর উপর বিমান হানার ঘটনার মাধ্যমে পরিলক্ষিত হয়। অন্যদিকে ‘পর্ছমি’ নেতা নাজিমুল্লাহ ১৯৯২ অবধি আফগানিস্তানকে একটি ইসলামিক প্রজাতন্ত্র হিসেবে শাসন করতে থাকেন। ১৯৯২ সালে নাজিমুল্লাহ সরকারের পতন হলেও মুজাহিদিন ও অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলির কলহের ফলে গৃহ যুদ্ধে লিপ্ত হয় দেশ। এমতাবস্থায় উত্থান হয় ‘তালিবান’ (ছাত্র) জঙ্গি গোষ্ঠীর। তালিবানী ছাত্রদের কট্টর ইসলামী প্রশিক্ষণ পাকিস্তানের আফগানী উদ্বাস্তু শিবিরগুলির মাদ্রাসায় হতে থাকে। মার্কিন মদতপ্রাপ্ত পাকিস্তানের ‘জমিয়তে উলেমায় ইসলাম’ এই প্রশিক্ষণ চালাতে থাকে। তালিবানীরা ‘শরিয়ৎ’ আইন প্রণয়নের প্রহরীতে পরিণত হয়। ১৯৯৬ সালের মধ্যে সমস্ত আফগানিস্তানের উপর তালিবানরা তাদের অধিকার বিস্তার করে। এহমাদ শাহ মাসুদ ও আব্দুল রাশিদ দোস্তামের নেতৃত্বে ‘ইউনাইটেড ইসলামিক ফ্রন্ট’ গঠিত হয়। এরা প্রগতিশীল চিন্তাধারার পক্ষে নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করে এবং তালিবানদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রামে লিপ্ত হয়। ২০০১ সালে তালিবানরা ক্ষমতাচ্যুত হলে রাষ্ট্রপুঞ্জের তদারকিতে হামিদ কারজাই আফগানিস্তানের রাষ্ট্রপতি ঘোষিত হন। এরপর থেকে বিক্ষিপ্ত ভাবে বেশ কয়েকবার তালিবানরা ক্ষমতা দখলের চেষ্টা করলেও মার্কিন মদতে তা দমন করা হয়। ফলে আফগানিস্তানের রাজনীতিতে মার্কিন প্রভাব প্রতিষ্ঠিত হয়। বর্তমান আশরাফ ঘনির সরকারও মার্কিন সরকারের বিশ্বস্ত প্রতিনিধি। অন্যদিকে তালিবানরা পাকিস্তান ও মার্কিনীদের হাতের বাইরে বেরিয়ে গিয়ে পাকিস্তানে সন্ত্রাসবাদী হামলা চালাতে শুরু করে। বর্তমানে পাকিস্তানের ‘ওয়াজিরিস্তান’ অঞ্চল তালিবানদের দখলে। বিক্ষিপ্তভাবে মুজাহিদিন ও আল-কায়েদার কিছু জঙ্গি গোষ্ঠী এখনও সন্ত্রাসবাদী হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। ভারত, বাংলাদেশ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যান্য দেশগুলিতেও তারা অশান্তির বাতাবরণ তৈরি করে চলেছে। নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির জন্য উগ্র ধর্মীয় মতবাদকে মদত দিয়ে সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলি নিজেরাই বারংবার তার সন্ত্রাসের স্বীকার হয়েছে এবং পরবর্তীকালে সন্ত্রাস দমনের অজুহাতে যুদ্ধ বিধ্বস্ত দেশগুলিতে সৈন্য পাঠিয়ে সেখানকার খনিজ সম্পদ দখলের চেষ্টা চালিয়েছে ও এখনও চালিয়ে যাচ্ছে।

দীর্ঘদিন ধরেই আফগানিস্তানের অভ্যন্তরে সরকারের মধ্যেকার বিভিন্ন দ্বন্দ্ব এবং বিক্ষিপ্ত সন্ত্রাসের খবর কানে আসে প্রত্যেকের। গত বছর সেপ্টেম্বর মাসে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাথে আফগান রাষ্ট্রদূত খলিলজাদের শান্তি বৈঠক আদতে দেশের অভ্যন্তরে অশান্তির বার্তাকেই প্রকাশ্যে এনেছে। সাম্প্রতিককালের এই অশান্তির সূত্রপাত ব্রিটিশ শাসিত ভারতীয় উপমহাদেশের সময় কাল থেকেই, ডুরান্ড লাইন-কে কেন্দ্র করে, যা হল আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের সীমানা নির্ধারক। এই লাইনের রাজনৈতিক অস্তিত্বের কারণে তা মধ্য এশিয়া থেকে আরব সাগর পর্যন্ত সবচেয়ে স্বল্প দৈর্ঘের পথকে নিয়ন্ত্রণ করে। এই পথ এক সময় ব্রিটিশরা কুক্ষিগত করে এবং ডুরান্ড লাইনের ফলশ্রুতিতে পাকিস্তানের পাস্তুন উপজাতি আফগানিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হয়ে পড়ে। এই উপজাতিদের একটি সংগঠন তালিবানদের অন্তর্গত। আফগানিস্তানে প্রধানত চারটি উপজাতি বসবাস করে, তারা হলো-তাজিক, উজবেক, হাজারা এবং পাস্তুন। তাজিকরা মোট জনসংখ্যার ২৭% হলেও দেশের সামরিক বিভাগে প্রায় ৭০% পদ তাদেরই। এরা প্রায় ৪০% পাস্তুনদের উপর শাসন করে। ফলে ডুরান্ড লাইনের ইস্যুকে কেন্দ্র করেই পাস্তুনদের বিদ্রোহের প্রাথমিক সূত্রপাত। কিন্তু বর্তমান শান্তির বার্তাকে সামনে রেখে উপজাতিদের সায়ত্ত্বশাসনের অধিকার স্বীকৃতি দানের বদলে আফগানিস্তান আসলে চীন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতবর্ষের জন্য বাজারের দরজা খুলে দেওয়ার দিকেই যে অগ্রসর হচ্ছে তা বলার অপেখ্যা রাখে না। ভারতবর্ষ ইতিপূর্বে শান্তির আহ্বান রেখে ১৯৮০ সালে সেখানকার কমিউনিস্ট পার্টির সাথে সন্ধি করেছিল যদিও তা বেশীদিন টেকেনি। সম্প্রতি সেখানে ভারতীয় দূতাবাস স্থানীয় বাণিজ্যিক কন্সাল্টেন্সির জন্য প্রায় দেড় বিলিয়ন মার্কিন ডলার বরাদ্দ করেছে! এছাড়াও দুই দেশের ভিতর দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য বাবদ আরও ৯০০ মিলিয়ন ডলার বরাদ্দ হয়েছে। আফগান রাষ্ট্রদূত বলেছেন যে ২০২০ সালের মধ্যে এই দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ২ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছানোর লক্ষমাত্রা রাখা হয়েছে। তিনি আরও বলেছেন যে আফগানিস্তান ভারতকে নিজেদের কৃষি পণ্য এবং হস্তশিল্পের সবচেয়ে বড় বাজার হিসেবে দেখে। এই প্রেক্ষিতে ২০১৭ সালে ২৭ থেকে ৩০শে সেপ্টেম্বর একটি পারস্পরিক ‘ইনভেস্টমেন্ট শো’ অনুষ্ঠিত হয়েছে। শুধু ভারতবর্ষ নয়, আফগানিস্তান ইতিমধ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং চীনের সঙ্গে ফার্মাসি এবং অপটিক্যাল ফাইবার শিল্পে ১০০% প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগের চুক্তিতে আবদ্ধ হয়েছে। ২০০১ সাল থেকেই আফগানিস্তানের স্বাস্থ্য, নারী ক্ষমতায়ন (?), খাদ্য সুরক্ষা এবং পুষ্টির উপর চীনের বিনোয়োগ ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলে উন্নয়নের নামে এশিয় বাণিজ্য সড়ককে দখলে রাখতে সাম্রাজ্যবাদীদের এই বিনিয়োগ যে আদতে সাধারণ আফগানদের জীবন জীবিকার কোনও সুরাহা করবে না, এটাই স্বাভাবিক। দীর্ঘদিন ধরেই এই দেশের নির্বাচন নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ উঠেছে সাম্রাজ্যবাদী শক্তিদের বিরুদ্ধে। ২০১৯-এর রাষ্ট্রপতি নির্বাচন ২৮শে সেপ্টেম্বর হয়ে গেলেও তার ফলাফল ১৪ই নভেম্বরে বের করার আজগুবি সিদ্ধান্ত সাম্রাজ্যবাদীদের চক্রান্ত সুস্পষ্ট করে তুলেছে বলে আফগান জনগণের একাংশের অভিমত।

Similar Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *