৯ই মে, ২০১৯ঃ এস্প্লানেডের ৫ নম্বর গেটটা দিয়ে বেরিয়ে সবে নিউমার্কেটে পা দেব দেব, হঠাৎ সাক্ষাৎ ভগবানের দেখা। এই রোদে একে ছাতা নিয়ে বেরোতে ভুলে গেছি, তার উপর অফিস টাইমের মেট্রোর গুঁতোগুঁতি, সরকার আর পরিবহণ সংস্থার নয়, জনসংখ্যার দোষ, কবিগুরুর জন্মদিনেও কতজন দানি-বানিদের মুনাফার পাহাড় বাড়াতে ইদুর-গাধা-গরু সবের মতো দৌড়তে বাধ্য বুঝলেন কিনা দাদা, হেঁহেঁ; জীবন ওষ্ঠাগত, এরই মধ্যে হঠাৎ প্রকট হলেন উনি, না সূর্যদেব আগেই প্রখর ছিলেন, ইনি অনেক কাল ঝিমিয়ে, আজকাল বিশেষ চোখে পরেনা রাস্তা ঘাটে; দেখি মাইক আর ক্যামেরাম্যান নিয়ে দাঁড়িয়ে এক ঘাম ছুটে যাওয়া নধর ডাক্তার বাবুকে শুধোচ্ছেন, “আচ্ছা এই যে রাস্তার ধারে এরকম খোলা জায়গায় জলের গ্লাসে বরফ ভরে, লেবু চিপে, জল ভরে এরা বিক্রি করছে, শরীরে কি এফেক্ট পড়ে? আপনার কি মতামত?” ডাক্তার দেখি ঘাম মুছতে মুছতে বলছেন, “মারাত্মক ক্ষতিকর! এগুলো কোনটাই প্রসেসড না, সবটাই রাস্তার ধুলোয় ভরা, নানান জীবাণু থেকে শরীর খারাপ হতে পারে”, ঘাম মোছা শেষ। দেবতা তাও ছাড়বার পাত্র নয়, ভাড়া করে এনেছে বলে… ইয়ে, ভুল ভাবে নেবেননা কত্তা, খানিক দুরেই ওনার আই১০ না ২০ কি যেন ছাই দাঁড়িয়ে ছিল তো তাই। এদিকে আবার দেবতা খোঁচান, “আচ্ছা এই যে ডাবের জল, এগুলোও কি ক্ষতিকারক?”, আর ঘাম নেই মোছার মত, ডাক্তার বাবু বললেন, “আরে এই ডাবের গায়ে দাগ দেখতে পাচ্ছেন, এগুলো এই মোবাইল ব্যবহারের ফলাফল, সব থেকে ভালো, বাড়ি থেকে জল নিয়ে বের হন, নাহলে প্রসেসড পানীয় খান”।
এই অবধি সব ঠিক ছিল, হঠাৎ মোহভঙ্গ হতেই দেখি দেবতার প্রশ্ন পর্ব শেষ হওয়ায়, ঠাণ্ডা গাড়িতে উঠে দে দৌড়, কি করবেন, যা গরম, একমাত্র ঠাণ্ডা হাওয়াই রক্ষে। কি মনে হল, ভাবলাম, প্রসেসড ড্রিঙ্ক খাবো, দোকানে গিয়ে দেখি পেপসি, লিমকা, মিরিন্ডা, কোকাকোলার পাশে সেভেন আপ, নিম্বুজ রয়েছে, ভাবলাম মনের আর গলার সাধ মেটাই। নিম্বুজ’টা খেতে খেতেই মনে পড়ল, এই প্রসেসড ড্রিঙ্কেই সেই পায়খানার প্যান সাফ করা দেখিয়েছিল, বোতল ঘুরিয়ে চিনির পরিমাণ দেখলাম, তাও মারাত্মক উচ্চ পর্যায়ের, এগুলোই আবার জিমের দাদারা-দিদিরা খেতে বারন করে মোটা হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থেকে। এদিকে আছে আবার ছোটবেলার সেই স্মৃতি, স্কুল থেকে ফিরেই লেবুর জল, মায়ের বানানো, ওই যে যেটা ওই প্রসেসড ড্রিঙ্কের অ্যাডে দেখায়, দেখিয়ে ওই এক রাশ চিনিওয়ালা, ওষুধের প্রসেসড গন্ধে ভরা ড্রিঙ্কটা স্বাস্থ্যকর বলে বেচে দেয়, তার সাথে আমার-আপনার সবার ছোটবেলার স্মৃতিটাও কমোডিটি হয়ে যায়। আমার মায়ের বানানো জলের গ্লাসটাও রান্না ঘরের ব্যস্ততার মাঝে একই ভাবে পরে থাকতো, একই ভাবে ধোওয়া হতো, লেবুটা মা হাত দিয়ে চিপে দিতো, নুনটাও, ভীষণ অস্বাস্থ্যকর জীবাণু ছিল, তবে স্বাস্থ্য ভালো থাকতো, প্রসেসড কমোডিটি ছিলনা যে মায়ের স্নেহটা। আজ সেভেন আপের চিল্ড মোড়কে ঢাকা, ফ্রিজে বন্ধ স্নেহটায় বড়ো অস্বাস্থ্যকর এক পোকার বাস, এ পোকা সহজে দেখা যায়না, কখনও সিসিডি’র বদ্ধ ঘরে, কখনও স্টার-বাকসের লাইনে, কখনও আবার ফুড-কোর্টে, সমানে স্বাস্থ্যের কথা বলে আপনাকে কখন শ্রেণী ভুলিয়ে প্রসেসড করে দিয়েছে বুঝতেই পারবেননা। হকার বসা নিয়ে ভীষণ আপত্তি, তার থেকে শপিং মলের ওই খাবারের-আদালত না কি যেন, ওই হচ্ছে এই পোকাদের বিচরণ ক্ষেত্র।
হঠাৎ আবার ফোনটা বাজলো, বাজখাই গলায় ওপাশ থেকে স্নেহময়ি বলছেন, ছাতা নিয়েছি কিনা, আনিনি জেনে, মানুষ করতে না পারার অভিযোগে ফোন রেখে দিলেন, এই সব করতে গিয়ে, এতক্ষণে সেভেন আপ গরম, ফেলে দিলাম, পিছন ফিরেই দেখি বিশাল লাল কাপড়ে মোড়া হাঁড়িতে ঠাণ্ডা জল আর কাঁচের গ্লাসে লেবু সাজিয়ে একজন রাসায়নিক ছাড়া যত্ন সহকারে লেবু জল বিক্রি করছেন। ৪১ ডিগ্রির গরমে, কুড়ি টাকায় এক গ্লাস স্নেহভরা আন-প্রসেসড ছোটবেলা ফেরত পেলাম।

Similar Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *