গত ৯ই নভেম্বর রাতে পশ্চিমবঙ্গের কাকদ্বীপ ও বকখালি উপকূলে আছড়ে পড়ে ঘূর্ণিঝড় ‘বুলবুল’। বঙ্গোপসাগর থেকে স্থলভূমিতে আছড়ে পড়ার আগে এর গতিবেগ ছিল ঘণ্টায় ১২০ কিলোমিটার। স্থলভূমিতে ঢোকার পরে বুলবুলের শক্তি দ্রুত ক্ষয় পায় এবং উত্তর ও দক্ষিণ ২৪ পরগণার সুন্দরবন এলাকার উপর দিয়ে গিয়ে তা অবশেষে বাংলাদেশে প্রবেশ করে। কিন্তু ঘন্টায় ১০০-এর কম গতিবেগের ঝড়েও কার্যত ধ্বংসস্তুপে পরিণত হয়েছে এই দুই জেলার বিস্তীর্ণ অংশ। ফসল কাটার মরসুমে বুলবুলের অতর্কিতে আক্রমণে ব্যপক ক্ষতির মুখে দক্ষিণবঙ্গের কৃষিকাজ, কেবলমাত্র উত্তর ২৪ পরগণাতেই ২ লক্ষ হেক্টর জমির ফসল নষ্ট হয়েছে। ভয়াবহ অবস্থা সুন্দরবনের নদী বাঁধ গুলিরও।
বুলবুলের গতিপথ কী হতে পারে এ নিয়ে ধন্দে ছিলেন আবহাওয়াবিদেরাও। মাত্র চার ঘণ্টা আগেও সঠিক ভাবে তারা বলতে পারছিলেন না, পশ্চিমবঙ্গ না বাংলাদেশ, কোথা দিয়ে যাবে এই ঘূর্ণিঝড়। ঘন ঘন গতিপথ বদলানোর কারণে হিমশিম খাচ্ছিলেন তাঁরা। অবশেষে বোঝা যায় সুন্দরবনেই আছড়ে পড়তে চলেছে ভয়ঙ্কর ঘূর্ণিঝড়টি।
সতর্কতা সত্ত্বেও দুই জেলায় ব্যপক ক্ষয়ক্ষতির কারণ কী? এর উত্তরে উঠে আসছে একটাই কারণ; প্রশাসনের গাফিলতি। ঘূর্ণিঝড় অন্যত্র আছড়ে পড়তে পারে, এই আশায় শণিবারেও ঢিলেঢালা মনোভাবে ছিল বিপর্যয় মোকাবিলা দফতর। এমনকি বুলবুলের জন্য হাই-এলার্ট জারি হওয়া সত্ত্বেও বিপজ্জনক এলাকার বহু মানুষকে সরানো হয়নি নিরাপদ আশ্রয়ে। যার জেরে মিডিয়ার কাছেও ক্ষোভ উগড়ে দিয়েছেন সেই এলাকাগুলির মানুষেরা।
বুলবুলের ক্ষয়ক্ষতির সমস্ত রকম পূর্বাভাস সরকার কাছে থাকা সত্ত্বেও ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ এত মাত্রাতিরিক্ত কেন? যেখানে মাত্র ১০ বছর আগে ঘূর্ণিঝড় আয়লার ক্ষয়ক্ষতি যার উল্লেখযোগ্য নমুনা। সরকারি রিপোর্টই বলছে কমপক্ষে ১০ জন প্রান হারিয়েছেন এবং ২.৭৩ লক্ষ পরিবার ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে বুলবুলের কারণে। রাজ্য দুর্যোগ মোকাবিলা বিভাগের মন্ত্রী জাভেদ খান যে তথ্য দিয়েছেন তাতে মাত্র ২৪৭৩ টি বাড়ি বিধ্বস্ত হয়েছে এবং ২৬০০০ টি বাড়ি আংশিক ভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী একধাপ এগিয়ে গিয়ে বাড়িগুলিকে ‘বাংলা আবাস যোজনা’-তে বাড়ি তৈরি করে দেবার কথা বলেন। কিন্তু বাস্তব তথ্য হলো এবছরের জুন-জুলাই মাস থেকেই পঞ্চায়েত ও গ্রামোন্নয়ন দফতর ‘কাটমানি’ বিক্ষোভের জেরে সমস্ত গ্রামীন আবাসন প্রকল্প স্থগিত করে দিয়েছে। উত্তর ২৪ পরগনা জেলায় মোট ৫ জন এর প্রান হানির খবর পাওয়া গেছে, পূর্ব মেদিনীপুরে সংখ্যাটা একজন এবং দক্ষিণ ২৪ পরগনায় জন। দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার ফ্রেজারগঞ্জের ফিশিং বন্দরের এক জেলের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। আটজন জেলে এবং ফ্রেজারগঞ্জের চারটি ট্রলার এখনও নিখোঁজ রয়েছে বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

ঝড়ের দাপটে দুই ২৪ পরগনা ও পূর্ব মেদিনীপুর জেলায় শতাধিক গাছ ও বৈদ্যুতিক পোস্ট উপড়ে গেছে। সুন্দরবনের বিস্তীর্ন অঞ্চল বিদ্যুৎ হীন। বিপর্যয়ের পরে ৯৬ ঘন্টা কেটে গেলেও এখনো বিভিন্ন এলাকায় যোগাযোগ-ব্যবস্থা স্বাভাবিক হয়নি এবং বিস্তীর্ণ এলাকা বিদ্যুৎহীন।
বনভূমি বিশারদগণ বলছেন সুন্দরবন সটান হয়ে বুলবুলের ধ্বংসলীলা কমিয়েছে প্রায় ৭০%। আর সেই বনভূমির বে-আইনিভাবে কেটে সাফ করার প্রচেষ্টা চলছে দীর্ঘদিন ধরে। বারংবার সুন্দরবনের কাঠ ও বনজ সম্পদ চোরাচালানের অভিযোগ উঠেছে শাসকদলের নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে। রাজ্যে বিজেপির উত্থানের পর থেকে তাদের একাংশ আবার পরিবর্তীত পরিস্থিতির ফায়দা তুলতে পা-বাড়িয়েছেন পদ্ম শিবিরে। সাথে রয়েছে নদীবাধ নির্মানে ‘পুকুর-চুরির’ মাপের কেলেঙ্কারি। তাই সামান্য বন্যাতেই ভেসে যায় কোটি কোটি টাকা ব্যায়ে তৈরি নদী-বাঁধগুলি।
ঘূর্ণিঝড় বুলবুল-এর আঘাত হানার দিনে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নবান্নের ‘কেবল গ্যালারি’-তে ছিলেন কিন্তু তারপরের রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে উঠে এসেছে প্রশাসনিক গাফিলতির অভিযোগ। ত্রাণ শিবিরগুলিতে পরিকাঠামোহীনতার অভিযোগ। পরে তিনি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করেন হেলিকপ্টার থেকে সাথে দুই জেলায় প্রশাসনিক বৈঠকও কিন্তু এত কিছুর পরেও বিপর্যস্ত এলাকার মানুষের মুখে মুখে ফিরছে ত্রাণ বন্টন নিয়ে দলাদলি ও দুর্নীতির, যার নেপথ্যে আছেন শাসক দল তৃণমূলের নেতা-কর্মীরা।

Similar Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *