‘পদ্মাবত’ বিতর্ক সম্পর্কিত পর্যালোচনা

দিল্লী, রাজস্থান, গুজরাট সহ ৬টি রাজ্যে জ্বলন্ত শপিং মল ও সিনেমা হল, ভাঙচুর হওয়া গাড়ির সারি, পথ অবরোধ, জনজীবনহানির বিনিময়ে তৈরী সাম্প্রতিক ‘পদ্মাবৎ’ ছবিটি যে পরিচালক সঞ্জয় লীলা বনশালীর মাহাত্ম্যের গাথা সহ প্রথম সপ্তাহেই ১০০ কোটির ক্লাবে ঢুকে পড়বে, তা বোধ হয় কেবল সময়ের অপেক্ষা ছিল। …. কারণ কর্নি সেনারা যেভাবে সংগঠিত উপায়ে বিভিন্ন জায়গায় দাঙ্গা পরিস্থিতি তৈরী করেছিল তারপর সিনেমা দেখে বেরিয়ে আসা দর্শকদের প্রতিক্রিয়া একটাই: “এরই জন্য এতো ঝামেলা ! এখানে তো রাজপুতদের স্তুতিবন্দনাই করা হয়েছে।” অনেকে বলছেন, আসলে ভুলভাল গুজব ছড়িয়ে পড়েছিল, তার জন্যই যতো সমস্যা। যদি ধরেই নেওয়া যায় যে একটি বিশেষ দৃশ্যকে কেন্দ্র করে গুজব রটেছিল, তবু বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলোর মুখ্যমন্ত্রীরা, যাঁরা রাজনৈতিক ছলাকলায় পেশাদারিত্বের শিখরে, তাঁরা সেটুকুও না দেখেশুনেই প্রকাশ্য বিরোধিতা, একাধিকবার উস্কানিমূলক মন্তব্য এবং কোন প্রশাসনিক ব্যবস্থা না নিয়ে দাঙ্গায় মদত দিয়ে চলেছিলেন, এটা কি আদৌ বিশ্বাসযোগ্য? বিশেষত যখন কেন্দ্রে তাঁরাই একাধিপতি এবং ফিল্ম সার্টিফিকেশন বোর্ডের সভাপতি প্রসূন যোশি, যাঁর বিরুদ্ধে শাসক দলের প্রতিই পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ উঠেছে বারবার? সিনেমাকে ব্যবসায়িক সাফল্য এনে দিতে কন্ট্রোভার্সি তৈরির মার্কেটিং পলিসি আজ কোনও নতুন বিষয় নয়। কিন্তু সেক্ষেত্রেও প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে, যে, শুধুমাত্র সিনেমাটিকে ব্যবসায়িক ভাবে সফল করানোর জন্যই এভাবে আগুন নিয়ে খেললেন সঞ্জয়রা? কারণ অনেক কমার্শিয়াল সিনেমা-বিশেষজ্ঞের মতে সিনেমাটার যা গড়ন তাতে এমনিতেই তা খুব একটা খারাপ ব্যবসা করতো না। তাহলে কি বিপরীতে, একটা গুজবকে বাজারে ছেড়ে বিজেপি সরকার-প্রশাসন এবং সংঘ-পরিবার কোন রাজনৈতিক ফায়দা তুলতেই এতো মানুষের প্রাণ নিয়ে ছিনিমিনি খেললো? নাকি এ এক দ্বিমুখী লাভের লক্ষ্যে যৌথ প্রয়াস? সাধারণের মনের উৎকণ্ঠা থেকে সৃষ্টি হওয়া এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতেই এই প্রবন্ধের অবতারণা। সেক্ষেত্রে সিনেমাটির বিষয়ে প্রবেশ করার আগে দেখে নেওয়া প্রয়োজন সাহিত্য ও ইতিহাসে এই ‘পদ্মাবতী’-র স্থান ঠিক কী।

‘পদ্মাবতী’ বা ‘পদ্মিনী’! ভারতীয় সাহিত্যের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র। মধ্যযুগীয় সাহিত্য থেকে আধুনিক সাহিত্য পর্যন্ত যাকে নিয়ে বহুবার সাহিত্যিক নির্মাণ ঘটেছে, অথচ ইতিহাসের পাতায় তাকে খুঁজতে গেলে ধাঁধাঁ লেগে যায়। সাহিত্যের আলোকে প্রথম আমরা পাই মালিক মুহম্মদ জায়েসীর লেখা ‘পদ্মাবৎ’ কাব্য। ১৫৪০ সালে ‘আওধী’ ভাষায় লেখা এই কাব্য (বা ‘নজম’) সম্ভবতঃ নাস্তালিক লিপিতে লেখা হয়েছিল। কাহিনী অনুযায়ী ‘পদ্মাবতী’ বা ‘পদ্মিনী’ সিংহলরাজ গন্ধর্বসেনের কন্যা, যাঁর সৌন্দর্যের কথা চিতোরের গিহ্লট বংশের রতন সেন শুনতে পান ‘হীরামন’ তোতার মুখ থেকে, এবং সিংহলে পৌঁছে তিনি স্বয়ম্বর সভায় ‘পদ্মিনী’-কে লাভ করে দেশে ফেরেন। তিনি এক বিশ্বাসঘাতক গায়কের প্রতি রুষ্ঠ হয়ে তাকে রাজ্য থেকে বিতাড়িত করলে সে প্রতিশোধের লক্ষ্যে আলাউদ্দিন খিলজীকে পদ্মিনীর রূপসৌন্দর্যের কথা জানায় এবং আলাউদ্দিন তখন রতন সেনকে বন্দি করে মুক্তিপণ হিসেবে পদ্মাবতীকে দাবি করেন। পদ্মিনী বা পদ্মাবতী তখন বাকিদের সাথে পরামর্শ করে গোরা ও বাদলকে  নিযুক্ত করেন রতন সেনকে মুক্ত করে আনতে। তারা রতন সেনকে মুক্ত করতে সক্ষম হয়, কিন্তু ইতিমধ্যে কুম্ভালনের রাজপুতরাজ কুট্টনী নিযুক্ত করেন পদ্মিনীকে লাভ করার জন্য। রতন সেন চিতোর ফিরে সেই খবর পেয়ে কুম্ভালনের সঙ্গে যুদ্ধ করতে যান এবং প্রাণ হারান। ইতিমধ্যে আলাউদ্দিন খবর পেয়ে চিতোর আক্রমণ করে প্রাসাদে প্রবেশ করে দেখেন পদ্মিনী ও অন্যান্য রাজপুত রানীরা জহর ব্রত পালন করে মারা গেছেন।

এই কাহিনীর মধ্যে ঐতিহাসিক তথ্য খুঁজতে যাওয়া এক ভয়ানক ক্ষতিকর প্রয়াস। কারণ জায়েসী নিজেই বলে দিয়েছেন যে, ‘জহরব্রত’-এর রীতি ছাড়া সবই রূপকার্থে লেখা। এখানে চিতোর (চিৎ+ওর) হল ‘শরীর’, রাজা হল ‘মন’, সিংহল হল ‘হৃদয়’, পদ্মাবৎ হল ‘বুদ্ধি’, তোতা হীরামন হল ‘গুরু’, আর আলাউদ্দিন হল ‘মায়া’ (রিরিৎসা) [১]

রাজপুত  লোককবিরা, চারণকবিরা আসলে কাহিনীর ঐ আখ্যানটি গেয়ে বেড়াত রাজপুতানার বিভিন্ন স্থানে। ফলে জায়েসীর রচনা কৈথি ও নাগরি  লিপিতেও পাওয়া যায়। কেবল ১৫৮৯ সাল নাগাদ রাজপুত কবি হেমরতন এটিকে ‘সত্য ঘটনা’ বলে দাবি করে ‘গোরা বাদল পদ্মিনী চৌপাই’ নামে একটি ব্যালাড রচনা করেন। তাতে অবশ্য গল্প সামান্য আলাদা থাকলেও বিষয়ের কোনও বিশেষ হেরফের ছিল না। এর কিছুদিনের মধ্যেই বিজাপুরের সুলতানের সভাকবি হংস দাক্ষানি – ‘প্রেমনামাহ’  নামে একই বিষয়ে কাব্য রচনা করেন। এছাড়াও পারসিক ও উর্দু ভাষাতে অন্ততঃ ১২ বার লেখা হয়েছে এই আখ্যান যার মধ্যে মোল্লা আব্দুল শাকুর বা শুকুরুল্লা বাজমির লেখা ‘রাত পদম’ (১৬১৮) এবং ঔরঙ্গজেবের আমলের দিল্লীর গভর্নর আকাইখানের লেখা ‘শমা ওয়া পরওয়ানা’ (১৬৫৮) গুরুত্বপূর্ণ। মধ্যযুগের আরাকান (মিয়ালার অথবা চট্টগ্রাম) রাজ্যের সভাকবি  সৈয়দ আলাওল-ও একই বিষয় নিয়ে কাব্য রচনা করেন (সতী ময়না ও লোরচন্দ্রানী)। এই সকল রচনার মধ্যে কেবল শুকুরুল্লার ‘রাতপদম’ বাদে বাকি জায়সী, আকাইখান, হংস দাক্ষানি এমনকি আলাওল-এর রচনাও ছিল আসলে সুফী মোটিফের ব্যবহার দ্বারা রচিত কাব্য।

অন্যদিকে, ইতিহাসের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, আমির খসরু, যিনি আলাউদ্দিন খিলজির সাথে চিতোরের দুর্গে প্রবেশ করেছিলেন, নিজে উর্দু/হিন্দি ভাষার জনক ও তবলার আবিষ্কর্তা হিসাবে পরিচিত, সুপ্রসিদ্ধ ‘ছাপ তিলক’ গানের রচয়িতা, তাঁর রচনায় ‘পদ্মাবতী’ বা ‘পদ্মিনী’-চরিত্রের অস্তিত্বের কোনো উল্লেখটুকুও করেননি। কিন্তু তাও এবিষয়ে ‘ইতিহাসজীবী’-দের চর্বিত-চর্বণ কম হয়নি। খসরু নাকি তাঁর গ্রন্থ ‘খাজাইন-উল-ফুতুহ’-তে আবছা উল্লেখ করছেন এক রাজপুত  রানীর এমনটা দাবি করেছেন মহম্মদ হাবিব, দশরথ শর্মা এবং আশীর্বাদ লাল শ্রীবাস্তব। ইন্ডিয়ান হিস্টোরিক্যাল কোয়ার্টালি (নরেন্দ্রলাল সম্পাদিত, ১৯৩১)-তে সুবিমলচন্দ্র দত্ত তাঁর প্রবন্ধতে (First Saka of Chitod) লিখেছেন যে ‘খাজাইন’-এ ‘হুদহুদ’ পাখিই নাকি আসলে ‘পদ্মাবৎ’-এর তোতা [২]। যদিও ‘হুদহুদ’ আসলে মধ্য-এশিয়ার কিংবদন্তী  পাখি-চরিত্র (যেমন ভারতীয় পুরাণের ‘গরুড়’, ‘জটায়ু’, ‘সম্পাতি’ প্রভৃতি), কিন্তু ‘খাজাইন’-এ ‘হুদহুদ’ বলতে সম্ভবত খসরু নিজেকেই বুঝিয়েছেন বলেই তাঁর মনে হয়েছে। বিপরীতে কে.এস. লাল ও কালিকারঞ্জন কানুনগো খসরুর রচনায় ‘পদ্মিনী’-র অস্তিত্ব সম্পূর্ণ নাকচ করে দিয়েছেন [৩]। তবে একথা সত্যি যে ‘খাজাইন’-এ আলাউদ্দিন-পুত্র খিজির খাঁ ও রাজপুত রানী দেবলা দেবী-র কাহিনীর উল্লেখ আছে। কিন্তু ‘পদ্মিনী’-র নাম কোথাও নেই।

‘পদ্মিনী’ নামটিও খুব গুরুত্বপূর্ণ। ‘গোরা বাদল পদ্মিনী চৌপাই’ অনুযায়ী রতন সিং তাঁর প্রধান মহিষীর হাতের রান্নার সমালোচনা করলে মহিষী তাঁকে বলেন যে পারলে এর থেকে ভালো রান্না করতে পারে এমন নারীর সন্ধান করতে। চিতোর-রাজ সন্ধান করে জানতে পারেন যে ‘সিংহল’ দেশে অনেক ‘পদ্মিনী’ আছেন। কিন্তু সিংহল গিয়ে তিনি দেখেন সেখানে একজন মাত্র ‘পদ্মিনী’ আছেন, তিনি সিংহলরাজ গন্ধর্বসেনের কন্যা। অর্থাৎ এখানে সম্ভবতঃ ‘পদ্মিনী’ শব্দটি আসলে কোনও নামই নয়, সেই সময় স্ত্রী-জাতির প্রচলিত চরিত্রগত শ্রেণীবিভাগ অনুযায়ী যে বিভিন্ন প্রকার নারীর বৈশিষ্ট্য, সেই ‘হস্তিনী-শঙ্খিনী-পদ্মিনী-চিত্রিণী’ অর্থেই ‘পদ্মিনী’ শব্দের ব্যবহার করা হয়েছে।

জিয়াউদ্দিন বরণীর লেখা থেকে জানা যায় যে তিনি এক কোতোয়াল পদবীধারীর মুখ থেকে ১২৯৭ সাল নাগাদ জানতে পারেন যে আলাউদ্দিন রণথম্বোর, চিতোর, চান্দের, ধার ও উজ্জয়নী দখল করার পরিকল্পনা করছেন। কিন্তু সেখানেও ‘পদ্মিনী’-র কোনও উল্লেখ নেই। ইসলামিতেও নেই। জায়েসী যদিও বলেছেন ‘জহরব্রত’ সত্যি, কিন্তু খসরু চিতোরে জহরব্রত-র কথা লেখেননি, তবে রণথম্ভোরে তা হয়েছিল বলে দাবি করেছেন। এই ঘটনাকে রাজপুতদের বাইরের ঐতিহাসিকদের মধ্যে সত্যি বলে প্রথম দাবি করেন ফিরিস্তা [৪], এবং তারপরে হাজি-উদ-দবির, যদিও দুজনের সাথেই জায়েসীর বক্তব্যের পার্থক্য আছে; বিশেষত ফিরিস্তা দাবি করেছেন যে পদ্মিনী আসলে রতন সেনের মেয়ে। পরবর্তীকালে বিদেশি পর্যটক মানুচ্চি তাঁর ‘স্তোরিয়া দে মোগোর’ গ্রন্থে এই ঘটনাকে সত্যি বলে দাবি করেন কিন্তু তাকে আকবরের আমলের ঘটনা বলে উল্লেখ করেন।

এরপর ব্রিটিশ আমলে ঊনবিংশ শতকের প্রথমার্ধে জেমস টড রচনা করেন ‘Annals and Antiquities of Rajasthan’ যা মূলতঃ রাজপুতদের লোকগাথার উপর ভিত্তি করে লেখা। তাঁকে এই গ্রন্থ লেখায় সাহায্য করেন জৈন সাধু জ্ঞানচন্দ্র। এই প্রসঙ্গে তিনি ‘খুম্মন রাসো’-এর উল্লেখ করেছেন যদিও ওই গ্রন্থে ‘পদ্মাবতী’-র উপাখ্যান আদৌ নেই। টড দাবি করেছেন যে পদ্মাবতী বা পদ্মিনীর পিতা ছিলেন সিংহলের চৌহান রাজ হামির সংক। মজার ব্যাপার হল কোনও দিন সিংহলে ‘চৌহান’ কেন কোনও রাজপুতই রাজত্ব করেননি এবং চৌহানদের বর্তমান উত্তরসূরিরা যেসব দেশীয় রাজ্য ও জমিদারকে তাঁদের অধীনে ছিল বলে দেখান তাতেও সিংহলের নাম কোথাও নেই। হামির সংক বলে কোন চৌহান রাজার নামও কোন চৌহান বংশের শাখায় নেই। অর্থাৎ সাকুল্যে এই গ্রন্থের কোনও ঐতিহাসিক মূল্যই নেই। 

এখানে আরও উল্লেখযোগ্য, সিংহলে আলাউদ্দিন-রতন সেনের-এর সমসাময়িক কোনও রাজার নামই গন্ধর্বসেন ছিলই না। সিংহলে রাজত্ব করতেন প্রথম ভুবনায়ক বহু (১২৭১-৮৩)। আদতে সিংহলে কোনও দিনই ‘গন্ধর্বসেন’ বলে কেউ রাজত্ব করেননি।

কিন্তু ঘটনাচক্রে টডের গ্রন্থটি বাংলায় প্রভূত জনপ্রিয় হয়। আসলে ১৮৭৫ সালে কলকাতা থেকে জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর রচনা করেন ‘সরোজিনী’ বা ‘চিতোর আক্রমণ’ নাটক, যার বিখ্যাত গান ছিল “জ্বল জ্বল চিতা দ্বিগুণ দ্বিগুণ / পড়ান সঁপিবে বিধবা বালা” [৫]। যদিও এই গ্রন্থে ‘পদ্মিনী’-র নাম নেই, আছে সরোজিনীর, যিনি চিতোরের রাণা লক্ষণ সিংহের মেয়ে এবং তাঁর স্বামী বিজয় সিংহ। টড ও ফিরিস্তা উভয়ের প্রভাবই এখানে লক্ষণীয়।

এরপর ১৮৮৪ সালে যজ্ঞেশ্বর বন্দ্যোপাধ্যায় লেখেন ‘মেওয়ার’; ১৯০৬-এ ক্ষিরোদ প্রসাদ বিদ্যাবিনোদ তাঁর নাটক ‘পদ্মিনী’-তে লেখেন যে রাজপুত যোদ্ধা ভীমসিংহের স্ত্রী পদ্মিনী, যেখানে চিতোরের রাণা রতন সিংহ; ১৯০৯ সালে অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরও ‘রাজকাহিনী’-তে পদ্মিনীর গল্পে তাঁকে ভীমসিংহের স্ত্রী হিসেবে দেখান। এঁরা সকলেই টডের রাস্তায় হাঁটেন। আর রঙ্গলাল বন্দ্যোপাধ্যায় লেখেন ‘পদ্মিনী উপখ্যান’ (১৯০৫) যেখানে ছিল সেই বিখ্যাত পঙক্তি : “স্বাধীনতা হীনতায় কে বাঁচিতে চায় হে কে বাঁচিতে চায় / দাসত্ব শৃঙ্খল কে পরিবে পায়ে হে কে পরিবে পায়ে”। অন্যদিকে সিন্থিয়া ট্যালবট ও ক্যাথরিন আশের তাঁদের ‘India Before Europe’ (CUP; P-106)-এ পদ্মাবতীকে সম্পূর্ণ কাল্পনিক চরিত্র বলে উল্লেখ করেছেন। রম্যা শ্রীনিবাসন মনে করেন এমনকি খসরুর মূল রচনায় পদ্মিনীর ছায়াও ছিল না, বরং এটা আধুনিক অনুবাদকেরা ঢুকিয়েছেন। ‘পদ্মিনী’-কে তিনি বীরত্ববাচক ‘স্মৃতিস্বত্ত্বা’ নির্মাণের উপায় হিসেবে ‘power of gender’-কে ব্যবহার করার উদাহরণ বলে মনে করেন [১]। উল্লেখ্য যে এতে নারীত্বের সংজ্ঞাও গুরুত্বপূর্ণ ভাবে বদলে গেছে।

প্রশ্ন জাগে তাহলে এই ‘পদ্মিনী’-র কিংবদন্তি ও রাজপুতদের বীরগাথা নির্মাণ করলো কারা? কেন? মনে রাখা প্রয়োজন, যে রাজপুতেরা মাত্র ২০০ বছর আগেও নিজেদের মধ্যে যুদ্ধ করতো; তুর্কিদের সাথে যুদ্ধের চেয়ে নিজেদের যুদ্ধকে অনেক বেশি গুরুত্ব দিত; নারী বা রাজকন্যা অপহরণ তাদের কাছে এক অতি সাধারণ ব্যাপার ছিল। এবং রাজপুতানার যতো বীরগাথাই গাওয়া হোক না কেন, আসলে আলাউদ্দিন খিলজি ১২৯৬-তে দিল্লির সুলতান হয়ে ১৩০৩-এ চিতোর আক্রমণ করেন, এবং মাত্র ৮ মাসের অবরোধে চিতোর দখল করে নেন [৬]। ফলে ঐতিহাসিক তথ্য থেকেই স্পষ্ট দেখা যায় যে ‘সর্বভারতীয় বীর রাজপুত চেতনা’ আসলে এক উপনিবেশোত্তর ধারণা, যা স্বাধীনতার আগে এদেশে ছিলই না।

প্রকৃত অর্থে ব্রিটিশ শক্তি ভারতে উপনিবেশ বিস্তার করার লক্ষ্যে ভারতীয় ইতিহাস কার্সার শুরু করে, যা ‘প্রাচ্যবাদ’-এর জন্ম দেয়। রাজপুতদের সাথে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদী শক্তির আঁতাতই রাজপুতানা প্রাচ্যবাদের আসল ভিত্তি। টড ও তাঁর রাজপুত সম্পর্কিত আখ্যান সাম্রাজ্যবাদী স্বার্থে ভারত ও ভারতীয়দের চরিত্র নির্মাণ করে বিশ্বের কাছে। বিপরীতে এই বিকৃত নির্মাণটি ভারতের জাতীয়তাবাদী এলিট গোষ্ঠী ব্যবহার করে তাদের কর্তৃত্ববাদী জাতিসত্ত্বা গঠনে। আখেরে এই আপামর ‘ইউরোপীয় প্রাচ্যবাদ’ ব্রিটিশ সাম্রাজ্যকে প্রাচ্যের সমাজ ও সংস্কৃতিতে জটিলভাবে গ্রন্থিত করে যা আজও ভারতের সমাজে গভীর প্রভাব বিস্তার করে চলেছে।

ইতিহাসের আলোকে আর বর্তমান রাজনৈতিক পরিবেশের প্রেক্ষিতে আজ শ্রী বনসালির ছবিটি তাহলে কোন অর্থ বহন করে ? সিনেমার প্রথম দৃশ্য থেকেই আলাউদ্দিন খিলজি চরিত্রটিকে কেবলমাত্র একজন ক্রুর, ক্ষমতালোভী, নির্দয়ী, দুঃশ্চরিত্র উন্মাদ হিসেবে দেখালেন পরিচালক। উল্টো দিকে রাজপুত রাজাকে শুধুমাত্র দেখালেন অত্যন্ত বিনয়ী, নম্র, নিষ্পাপ বীর  হিসেবে, যদিও ইতিহাস সাক্ষী রাজপুতেরা কত নিষ্পাপ ছিল ! তারপরও বিষয়টি যদি শুধু রাজায়-রাজায় যুদ্ধে সীমাবদ্ধ থাকত তাহলে বিশেষ কিছু না বলেও থাকা যেত, কারণ ঐতিহাসিকভাবেই সাম্রাজ্যের বিস্তারের জন্য তাদের নিজেদের মধ্যে যুদ্ধ চলত, এবং যে-ই জিতুক, সমাজের খেটে-খাওয়া মানুষের ওপর অত্যাচার আর নিপীড়ন শুধু বজায়ই থাকতো না, বেড়ে চলত। কিন্তু ‘পদ্মাবত’ ছবিতে বিষয়টি শুধু এইটুকুতেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। উদাহরণস্বরূপ, সিনেমার দুটি গুরুত্বপূর্ণ দৃশ্য: ১) রানী পদ্মাবতী যখন রতন সিং-কে খিলজির দুর্গ থেকে উদ্ধার করে নিয়ে আসছেন, তখন রাজপুত সেনাদের সঙ্গে খিলজি সৈন্যদের যুদ্ধ; এবং ২) ছবির শেষের দিকে রতন সিংয়ের সঙ্গে আলাউদ্দিন খিলজির যুদ্ধ; ¾ উভয় দৃশ্যেই দেখানো হলো যথাক্রমে রাজপুত সেনাপ্রধানকে এবং রাজা রতন সিংকে পিছন থেকে আঘাত করে হত্যা করা হয়। এই দুই হত্যার এহেন রূপায়ণ কোন্‌ ইতিহাস গবেষণা করে পেয়েছেন শ্রী বনশালি? ‘জায়েসী’-র কাল্পনিক কাব্যেও এমনকি এই মৃত্যুর শুধুমাত্র উল্লেখটুকুই আছে, হত্যা পদ্ধতির কোন উল্লেখ নেই। তাহলে পরিচালক হিসেবে এই রূপায়ণ নিশ্চয়ই বনসালির একান্ত মস্তিস্ক প্রসূত ! “মুসলমান পিছন থেকে ছুরি মারে” ¾ এই “রং নাম্বার” দেশের মানুষের মাথায় ঢুকিয়ে দিতেই কি এই দৃশ্যগুলির অবতারণা? তার ওপর খিলজির সেনার ঝাণ্ডা অকস্মাৎ কেন এবং কিভাবে যে ‘পাকিস্তান’-এর জাতীয় পতাকার সদৃশ হয়ে উঠল, তাও এক বিস্ময় ! এ প্রসঙ্গে মনে পড়ে যায় শ্রী লীলার আগের ছবি ‘বাজিরাও মস্তানি’-র প্রথম দৃশ্য যেখানে মারাঠা সেনার গেরুয়া রঙের সজ্জা যেন ‘হিন্দু রাষ্ট্র’ প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে দিল্লীর দিকে ধাবিত হচ্ছে। এ কি একযোগে ক্রমান্বয়ে মুসলমান-বিদ্বেষের প্রচার ও রাজপুত-মারাঠা শাসকদের বীরগাথার নামে হিন্দু রাষ্ট্রের ‘ঐতিহাসিক’ ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন অপচেষ্টা নয়? 

অন্যদিকে, খিলজির বেগম তার স্বামীর বিপক্ষে গিয়ে শত্রুপক্ষকে সাহায্য করলে তাকে অন্যতম প্রতিবাদী মুখ হিসেবে দেখানো হয়, কিন্তু রাজপুত রাজা রতন সিংয়ের একজন স্ত্রী থাকা সত্ত্বেও তিনি পদ্মাবতীকে বিয়ে করলে প্রথম স্ত্রীকে দেখানো হয় হিংসুটে ও কুটিল হিসেবে। উভয় ক্ষেত্রেই এই দুই নারী চরিত্র তাদের স্বামীদের দ্বারা অবহেলিত, অপমানিত এবং উভয় ক্ষেত্রেই দুই রাজা তাদের পুরুষতান্ত্রিক স্বজাতিমত্ততায় একাধিক নারীসঙ্গে লিপ্ত, তাহলে একজনকে বিদ্রোহী বীর আর অন্যজন কুচক্রী হিসেবে দেখানো কেন? যেহেতু একজন মুসলমান এবং অন্যজন অভিজাত হিন্দু? শুধু তাই নয়, রাজপুতদের ক্ষেত্রে গোটাটাই তথাকথিত “মেয়েটারই দোষ” হিসেবে তুলে ধরার এক বিষময় প্রক্রিয়া। 

যে  বিষয়টির জন্য সিনেমাটি রক্ষণশীল ও পশ্চাদমুখী মহলে সবচেয়ে বেশি সমাদৃত হয়েছে তা হলো পদ্মাবতীর জহরব্রত। যেভাবে শ্রী লীলা শেষদৃশ্যের অধিকাংশ সময় জুড়ে শুধুমাত্র বিভিন্ন ‘অ্যাঙ্গেল’-এ কিশোরী থেকে বৃদ্ধা, নববিবাহিত থেকে অন্তঃসত্ত্বা নারীর আগুনের দিকে অগ্রসর হওয়ার চিত্র দেখিয়েছেন, তাতে গোটা সিনেমাটা যেন জহরব্রতের আড়াই ঘন্টার বিজ্ঞাপন হিসেবেই সবচেয়ে ভালো মানায়। আজকের প্রগতিশীল নারী আন্দোলনের যুগে লড়তে লড়তে মরার চেয়ে পরাজয়বাদী আত্মহননের এ এক কুৎসিত গা-ঘিনঘিনে প্রচার ! আর তার সাহচর্য দিতে রাজপুতি তলোয়ারের সঙ্গে রাজপুতি কঙ্গনের তুলনা হাইপ দিয়েছে গেরুয়া প্রমীলা বাহিনীর “মেয়েরা নারীসুলভ হও” মতাদর্শে।   

তাহলে ‘বিজেপি-কর্নি সেনা-সংঘ পরিবার’-এর এই হাঙ্গামাময় বাড়তি ভূমিকার কারণ কী? আসলে সিনেমাকে কেন্দ্র করে বিতর্কের ঝড় তৈরী করে কৌতূহল আর উন্মাদনার পারদ চড়িয়ে সাধারণ মানুষকে হলমুখো করার প্রধান ভূমিকা এদেরই, বিশেষত হিন্দু মধ্যবিত্তের যে প্রগতিশীল অংশ এখনও হিন্দুত্ববাদের ঝাণ্ডা ধরেনি, টার্গেট ছিল তারাই। দর্শকেরা যখন সিনেমাটার মধ্যে রাজপুতদের কতটা হেয়  করা হয়েছে তা খুঁজতে ব্যস্ত, ঠিক এই সুযোগটাকে কাজে লাগিয়েই সঞ্জয়বাবু মুসলমান-বিদ্বেষের জীবাণু অতি সযত্নে ঝাঁ-চকচকে প্রোডাকশনের হাইপোডার্মিক সিরিঞ্জ দিয়ে প্রবেশ করিয়ে দিয়েছেন মানুষের মনে। কর্নি তাণ্ডবের সময় প্রগতিশীল মহল গলা পেড়েছিল প্রযোজকের সৃজনশীলতার স্বাধীনতার পক্ষে। আজ কর্নিকূল শান্ত (যদিও তাদের একাংশ এখনও জঙ্গি প্রমাণে ব্যস্ত) হলেও সিনেমা কোটি কোটি টাকার ব্যবসা করার পর আজ আবার প্রযোজকের সৃজনশীলতার স্বাধীনতাই হাতিয়ার ¾ কিন্তু তা এখন গেরুয়া মহলের। তাই ‘নয়া’ যুগের ‘উদারবাদ’ কিভাবে, গোপনে হাতে হাত মিলিয়ে আর প্রকাশ্যে হাতাহাতির মধ্য দিয়ে, ‘ফ্যাসিবাদ’-এর চারাগাছে জল দিতে পারে, এদেশের সংস্কৃতির পরিসরে ধর্মীয় মেরুকরণের প্রেক্ষিতে তার অনন্য নজির সৃষ্টি করলেন কর্নি-লীলা জুটি। 

References:

১) Srinivason, Ramya, ‘The many lives of a Rjput Queen:Heroic Pasts of india C.1500-1900 

২) P-248, footnote:-, Dutta, Subimal, ‘First Saka of Chitod’, Indian Historical Quartarly, Ed, nrandra Lal,1931

৩) সোমানি , রামবল্লভ, history of Mewar, from the Early time to 1751, কিশোর শরণ লালের গ্রন্থ ছিল-‘History of KHilji,(1290-1320) 1950।

৪) বসু, শ্যামাপ্রসাদ, Rise and fall of Khilji, pp-139-141,1963

৫) ঠাকুর, জোতিরিন্দ্র নাথ, ‘সরোজিনী বা চিতোর আক্রমণ’, পৃষ্ঠা-২৩৫,১৮৭৫ সাল, কলিকাতাস্থ বাল্মিকীমন্ত্র দ্বারা শ্রী কালিকিঙ্কর চক্রবর্তী কর্তৃক প্রকাশিত, লেখকের নাম দেওয়া আছে ‘পুরুষ বিক্রম নাটক রচয়িতা কর্তৃক প্রণীত’

৬) সাকসেনা, বি.পি, ‘The KHilji:Alauddin KHilji,’– “A Comprehensive History of India, THe Delhi Sultanate (AD 1206-1526)2nd Ed, Ed, M. Habib & K.a. Nizami.

 

 

 

Similar Posts

1 Comment

  1. খুব তথ্যধর্মী লেখা। ভালো লাগলো।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *