ফ্রান্সে জ্বালানির দামবৃদ্ধির প্রতিবাদে বিগত দুই সপ্তাহের বেশি সময় ধরে চলছে আন্দোলন ও সমালোচনা কর্মসূচি। ১৭ই নভেম্বর, ২০১৮ থেকে শুরু হওয়া এই আন্দোলনে দিনে গড়ে দুই লাখ বিক্ষোভকারী পথে নামছেন এবং তাঁদের অধিকাংশই শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারী। সূচনা শান্তিপূর্ণ হলেও যত দিন যাচ্ছে আন্দোলনের তীব্রতা বাড়ছে, দেশের বিভিন্ন অংশে আন্দোলনের আগুন তীব্রতর হচ্ছে। গত শনিবার, প্যারিসের ‘আর্ক দি ট্রাইওম্ফ’ চত্বরের বেশকিছু বিলাশবহুল রেস্তোরাঁ ও বুটিকে বিক্ষোভকারীরা আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। ইতিমধ্যেই জনতা পুলিশের বিক্ষিপ্ত সংঘর্ষে আড়াইশো জনেরও বেশি মানুষ আহত হয়েছেন।

চলতি বছরের শুরু থেকেই জ্বালানির দামবৃদ্ধি চলছে। এক বছরে লিটার পিছু ডিজেলের দাম বেড়েছে ৭.৬ সেন্ট (বর্তমান লিটার পিছু দাম ১.৫১ ইউরো অর্থাৎ ভারতীয় মুদ্রায় ১৩২.৭৯ টাকা; গত দেড় দশকে সর্বোচ্চ) এবং পেট্রোলের ৩.৯%। ফ্রান্সের মানুষ ডিজেল বেশী ব্যবহার করায় ব্যাপক হারে বাড়িয়ে চলা হাইড্রোকার্বন কর তাঁদের আরও কঠিন পরিস্থিতির দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

জনমানসে এই প্রতিবাদ কর্মসূচী ‘ইয়েলো ভেস্ট’ আন্দোলন হিসেবে খ্যাতিলাভ করেছে কারণ আন্দোলনকারীরা, যাদের অধিকাংশই মেহনতি জনগণের প্রতিনিধি, তারা ফ্রান্সের প্রত্যেক গাড়িতে থাকা হলুদ চকচকে সেফটি জ্যাকেট পড়ে থাকছেন। তাঁদের মতে, ‘মাকরঁ ধনীদের প্রেসিডেন্ট’ অর্থাৎ তাঁর উদারবাদী অর্থনৈতিক সংস্কার এই বিশ্বজোড়া মন্দার বাজারে দেশের ধনীদের মুনাফাকেই কেবল নিশ্চিত করছে; সাধারণ মানুষের অবস্থা তথৈবচ। অন্যদিকে, পরিস্থিতির সামাল দিতে মাকরঁ আষাঢ়ে গল্প ফেঁদেছেন যে জ্বালানীর উপর এই বর্ধিত কর গাড়ির মালিকদের দূষণপ্রবাহমুক্ত গাড়ি চালাতে বাধ্য করবে যার ফলে বায়ুদূষণ রোধ করা সম্ভব হবে! ফলে, হিংসাত্মক প্রকৃতি সত্ত্বেও ফ্রান্সের একটা বড় অংশের মানুষ এই ‘ইয়েলো ভেস্ট’ আন্দোলনকে সমর্থন জানাচ্ছেন। ফলে, জরুরী অবস্থার ঘোষণা করে রাষ্ট্রীয় দমন নামিয়ে আনার কথা ভাবছে মাকরঁ সরকার।

বিরোধী নেতৃবৃন্দ এবং দলগুলি হিংসাত্মক বিক্ষোভকে পছন্দ না করলেও সরকারের তীব্র সমালোচনা করতে শুরু করেছেন। বামপন্থী রাজনীতিবিদ জ্যাঁ লুক মেলেনকন এই রবিবার নতুন করে পার্লামেন্টে ভোটের দাবী জানান।

প্যারিসের রাজপথে পোস্টার পড়ছে, ‘বুর্জোয়াদের ক্ষমতাচ্যুত কর’, ‘ইয়েলো ভেস্টরা জয়ী হবেই’, ‘মে ১৯৬৮, ডিসেম্বর ২০১৮’ ইত্যাদি যার মধ্যে শেষ স্লোগানটি ১৯৬৮ সালের শ্রমিক ধর্মঘটের সঙ্গে বর্তমান আন্দোলনকে তুলনা করছে। ১৯৬৮ সালের সেই আন্দোলন শ্রমিক স্বার্থের পক্ষে একাধিক আর্থ-সামাজিক পরিবর্তন আনতে সফল হয়েছিল।

ফ্রান্সের আন্দোলনরত খেটে খাওয়া মানুষ যদি বিক্ষিপ্ততা ও স্বতঃস্ফূর্ততা নির্ভরশীল কর্মসূচী থেকে সরে এসে সমস্ত প্রকার শোষিত নিপীড়িতদের সংযুক্ত মোর্চায় ঐক্যবদ্ধ করে সংগঠিতভাবে মাকরঁ সরকার ও দেশের অন্যান্য দক্ষিণপন্থী শক্তিদের বিরোধিতা করতে পারে, বর্তমানে ফ্রান্স সহ সমগ্র ইউরো অঞ্চলে যে অর্থনৈতিক সংকট দেখা দিয়েছে, তাতে মেহনতি জনগণের রাষ্ট্র ক্ষমতা দখলের পথ প্রশস্ত হওয়ার যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে।    

 

 

 

 

 

 

 

 

Similar Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *